দশকের পর দশক ধরে চলে আসা রেলের অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে হাতে শেকল আর প্ল্যাকার্ড নিয়ে ৬ দফা দাবিতে একাই লড়ে যাচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মহিউদ্দিন রনি। এদিকে, রনির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন ছাত্র সংগঠন, রাজনৈতিক দলসহ দেশের বিভিন্ন জেলার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ।
গত ১১ দিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মহিউদ্দিন রনি কমলাপুর রেল স্টেশনে অবস্থান করছেন। রেলের অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় স্টেশন ভেতর থেকে বের করে দেয়া হয়। স্টেশনের বাইরে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ করলে সেখানেও নানাভাবে বাধা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া প্রতিনিয়ত হুমকি দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন রনি। তবে এতে বিচলিত নয় রনি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
সোমবার রাজধানীর কমলাপুর রেল স্টেশনে কথা হয় রনির সঙ্গে। তিনি জানান গত ১৩ জুন অনলাইনে ঢাকা-রাজশাহীগামী রুটের টিকিট কাটার চেষ্টা করেন। এ সময় তার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়া হলেও তাকে টিকিট কনফার্ম করা হয়নি। বিকাশ থেকে ভেরিফিকেশন কোড (যাচাইকরণ কোড) দিয়ে তার পিন কোড (গোপন কোড) ছাড়াই অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি রেল কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলে তারা সহজ ডট কমের সাথে কথা বলতে বলেন। কিন্তু সেদিন কমলাপুর রেলস্টেশনে সার্ভার কক্ষে অভিযোগ জানালে সেখান থেকে তাকে ‘সিস্টেম ফল’ করার কথা বলা হয় এবং ১৫ দিনের মধ্যে টাকা না পেলে আবার যেতে বলা হয়৷ কিন্তু ওই মুহূর্তে সার্ভার কক্ষে থাকা কম্পিউটার অপারেটর ৬৮০ টাকার আসন ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করেন বলে অভিযোগ করেন রনি।
রনি বলেন, ৭ জুলাই থেকে তিনি কমলাপুর রেলস্টেশনের সামনে অবস্থান শুরু করি। প্রথমে একা আন্দোলনে নামলেও পরবর্তীতে আমার বন্ধুরা এসে আমার সঙ্গে যোগ দেয়। ঈদের দিনেও আমরা স্টেশনেই ছিলাম। কিন্তু আন্দোলনের তৃতীয় দিন ৯ জুলাই পুলিশ সদস্যরা তাকে বাধা দেন। আমাদের ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে। তখন থেকে তিনি গণস্বাক্ষর বন্ধ রেখে শুধু অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, আমাদের নানাভাবে হুমকি দেয়া হয়েছে। বহিরাগত লোকজন এসে আমাকে গালাগাল করেছে। পাগল বলে তারা অশ্রাব্য ভাষায় নানা কথা বলছে। তবে আমি মনে করি আমার সাথে দেশের সব মানুষ একমত। দীর্ঘদিন ধরে রেলের অব্যবস্থাপনা চলছে। এটা শুধু আমার একার লড়াই না। জয়ী না হওয়া পর্যন্ত এ লড়াই চলবে।
রেল কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের যোগাযোগ করেনি জানিয়ে রনি বলেন, এত দিন ধরে আমরা এখানে অবস্থান করছি। অহিংস প্রতিবাদ করছি । প্রতিবাদের অংশ হিসেবে গান, কবিতা, পথ নাটক হয়েছে। তবুও রেলের কেউ আমাদের সাথে যোগাযোগ করেনি। তাই এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি কালকে (মঙ্গলবার) আমরা রেল মন্ত্রণালয় অভিমুখে লংমার্চ করব। লংমার্চ থেকে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
এসব বিষয়ে জানতে কমলাপুর রেল স্টেশনের ম্যানেজার মোহাম্মদ মাসুদ সারওয়ার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকেও পাওয়া যায়নি।
বুধবার শুনানির জন্য ডেকেছে ভোক্তা অধিকার
এদিকে টিকিট না দিয়ে টাকা কেটে নেওয়ায় গত ১৪ ও ১৫ জুন দুবার তিনি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে নিজের অভিযোগ জানান রনি। আগামী বুধবার অভিযোগের শুনানির জন্য রনিকে ডেকেছে ভোক্তা অধিকার।
রনি জানান, প্রায় ১ মাস পার হওয়ার পর ভোক্তা অধিকার থেকে শুনানির তারিখ দেয়া হয়েছে। আমি সচেতন বলে ভোক্তা অধিকারে অভিযোগ করেছি। তাও ধীর প্রক্রিয়া।
কমলাপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংহতি জানিয়ে রেল স্টেশনে অবস্থান
রেলের অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে একাই কর্মসূচি শুরু করা পর থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ছাত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের নেতারা কমলাপুর রেল স্টেশনে গিয়ে রনির দাবির সাথে সংহতি প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া, ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, জামালপুর ও নোয়াখালীতে রনির দাবির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে রেল স্টেশনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন সংগঠন।
যুব ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক খান আসাদুজ্জামান মাসুম বলেন, রনি রেলওয়ের সিন্ডিকেট কর্তৃপক্ষ বিরুদ্ধে অনেক সাহস নিয়ে কথা বলে ও গান গেয়ে মানুষকে জাগতে বলছেন। ইতিমধ্যে তাকে হুমকি দিয়ে ও তার বন্ধুদের শারীরিকভাবে আঘাত করে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে । বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব রনির পাসে থাকা, কারণ রনি কেবল নিজের জন্য দাঁড়ায়নি, সে আমাদের সকলের জন্য দাঁড়িয়েছে।
জামালপুর
রনির দাবির সাথে সংহতি প্রকাশ করে জামালপুর রেলস্টেশনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪শিক্ষার্থী। সোমবার সকাল ৮টা থেকে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে তারা প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
জামালপুর রেলস্টেশনে অবস্থান কর্মসূচি পালনকারী শিক্ষার্থীরা হলেন- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের রুকনোজ্জামান সীমান্ত, অপরাধ বিজ্ঞান ও পুলিশ তত্ত্ব বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মেহেদি হাসান রুবেল, খিলগাঁও মডেল কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ ভূঁইয়া হৃদয় ও ইসলামপুর সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগ অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হৃদয় বোস। তারা জামালপুর ও শেরপুরের বাসিন্দা।
নোয়াখালী
সোমবার সকাল ১০টার দিকে নোয়াখালীর চৌমুহনী রেলওয়ে স্টেশনে রনির ৬ দফা দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়।
সচেতন নোয়াখালীবাসীর ব্যানারে আয়োজিত কর্মসূচিতে নাগরিক অধিকার আন্দোলন-নোয়াখালী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, রয়্যাল ডিস্ট্রিক্ট নোয়াখালী, নোয়াখালী সাইবার ওয়ারিয়র্সসহ পনেরোটি সামাজিক সংগঠন সংহতি প্রকাশ করে অংশ নেয়।
চট্টগ্রাম
রবিবার সকাল ১০টা থেকে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে একই দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) চার শিক্ষার্থী।
চবির যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এই চার শিক্ষার্থী হলেন- তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মাহবুব হাসান, মোহাম্মদ মাসুদ, মোহাম্মদ মাহিন রুবেল এবং চতুর্থ বর্ষের ছাত্র কাজী আশিকুর রহমান।
রনির ৬ দফা দাবিগুলো হলো
অনলাইনে টিকিট কেনায় হয়রানি বন্ধ করে তদন্ত করতে হবে, হয়রানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, টিকিট কালোবাজারি বন্ধ করতে হবে, অনলাইন-অফলাইনে টিকিট কেনার ক্ষেত্রে সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, ট্রেনের সংখ্যা বাড়িয়ে রেলের অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে, ট্রেনের টিকিট পরীক্ষক ও তত্ত্বাবধায়কসহ অন্য দায়িত্বশীলদের কর্মকাণ্ড সার্বক্ষণিক মনিটর করতে হবে, শক্তিশালী তথ্য সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে রেল সেবার মান বাড়াতে হবে এবং ট্রেনে ন্যায্য দামে খাবার, বিনা মূল্যে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

