আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম আকাঙ্ক্ষা ছিল সমতা রক্ষা করা। যেখানে থাকবে না কোনো বৈষম্য। ধনী-গরিবের ভেদাভেদ যাবে মুছে । মুক্তিযুদ্ধটা ছিল মূলত বৈষম্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। পশ্চিম পাকিস্তান সব সময় পূর্ব বাংলাকে শোষণ করে এসেছিলো।
বাংলার কৃষকরা যখন আক্লান্ত পরিশ্রম করে পাট, গম ও নানা রকমের ফসল উৎপাদন করত তার সিংহ ভাগই নিয়ে যাওয়া হত পাকিস্তানে। এমনকি খাবার ছাড়াও অন্য যা কিছু এ দেশে তৈরি করা হত যেমন ধরুন নানারকম ব্যবহারযোগ্য জিনিস, সেগুলোর বেশিরভাগই চলে যেত পাকিস্তানে। এমনকি যা কিছু উন্নয়ন করা হতো তার সবটুকুই পাকিস্তানের উন্নয়নে কাজে লাগানো হতো। উন্নয়ন থেকে শুরু করে শিক্ষা দীক্ষা সবকিছু কেন্দ্রবিন্দু করা হয়েছিল পাকিস্তানকে ঘিরে। পূর্ব বাংলার মানুষের পরিশ্রমের ফলটুকু ভোগ করতো তারা। বিনিময়ে আমাদের দেশে কোন উন্নয়ন করা হতো না । আমাদের কর্মের ফলাফল নিয়ে যাওয়া নিয়ে গিয়ে আমাদের কিছুই রাখতো না। পশ্চিম পাকিস্তান আমাদের সবকিছু শোষণ করে পূর্ববাংলা একটি শ্মশানে রূপান্তরিত করেছিলো।
এখানেই শেষ নয়, বাংলাদেশের আর্মি, প্রশাসন ও সরকারির উচ্চপদস্থ কোনো পদে বাঙালিদের নিয়োগ দেওয়া হতো না। বরং বাংলাদেশের এ সব উচ্চপদস্থ পদে বাঙালির পরিবর্তে নিয়োগ দেওয়া হতো পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষদের। যা ছিল একটা বড় বৈষম্যের যায়গায়।
স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর আমরা যদি আবার ফিরে তাকাই, তাহলে ওই সময়কার বৈষম্য দেখতে না পেলেও সেই রকমের বৈষম্যই নতুন আঙ্গিকে খুঁজে পাওয়া যায়। স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেও বৈষম্য থেকে থেকে এখনও স্বাধীন হতে পারিনি আমারা। আর্থিক ক্ষেত্রে থেকে শুরু শিক্ষা ক্ষেত্র পর্যন্ত এ বৈষম্য সর্বক্ষেত্রে। নতুন আঙ্গিকে তৈরি হওয়া এ বৈষম্য দেশে ধনী-গরিবের মধ্যে বিশাল ব্যবধানে তৈরি করছে।
যদি শিক্ষার ক্ষেত্রের বৈষম্যের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই এক দেশের বিভিন্ন পদ্ধতির শিক্ষা ব্যবস্থা। একদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় আরবি শিক্ষা। অন্যদিকে ব্রিটিশ ও আমেরিকান কারিকুলামে ইংরেজি শিক্ষার স্কুল। এছাড়াও আছে ইন্টারন্যাশনাল স্কুলগুলো। সেই সঙ্গে আমাদের শিক্ষা বোর্ডের অধীনেও আছে দুই মাধ্যমের স্কুল, একটি বাংলা মাধ্যম অন্যটি ইংরেজি ভার্সন। শুধু যে আমাদের স্কুলগুলোতেই এত বিভেদ তা নয়, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও আছে বিভেদের স্তুপ। একদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অন্যদিকে প্রাভেট বিশ্ববিদ্যালয়। স্কুলের মতো বিশ্ববিদ্যালয়েগুলোতেও থাকছে ধনী-গরিবের বৈষম্য। দেখা যায় এক দল লাখ লাখ টাকা খরচ করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। আরেক দল অল্প খরচে পাস করছে।
এ দেশের মানুষ সবসময় তাদের মনে সম্প্রীতি লালন করে। বাংলার হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-মুসলমান এক জাতি এক প্রাণ। যা বহু আগ থেকেই বাঙলি মনে প্রাণে ধারনে করে আসছে। যে কারণে কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন,
‘ মোরা এক বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।
মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।’
কিন্তু এই অসাম্প্রদায়িক দেশেও এখন একধরনের টানাপোড়েন কাজ করছে। ৭১ এর যুদ্ধের সময় পাকিস্তানিরা যেমন ধর্মের নাম করে নির্বিশেষে দেশের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর ওপর বীভৎস নির্যাতন চালিয়েছে। এমনকি বাংলার মুসলিমদেরকেও ‘নিম্নমানের মুসলমান’ আখ্যা দিয়ে বাঙালির ওপর চালানো তাদের অমানসিক নির্যাতনকেও জায়েজ বলে উপস্থাপন করেছিলো পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও সেই মনোভাব এখনো রয়েছে এ দেশে।
`জয় বাংলা` শ্লোগান বাঙালিকে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে একত্রিত করেছিল। দেশ স্বাধীনের আগে ইয়াহিয়া যেভাবে এ দেশে দখল করেছে। তারা বাংলাদেশে যাচ্ছেতাইভাবে দুর্নীতি করেছে, একচেটিয়া শোষণ করেছে। সেই দুর্নীতির ধারাবাহিকতা আজও আমরা বন্ধ করতে পারিনি।

