শিরোনাম
বৃহঃ. জানু ২২, ২০২৬

শেখ পরিবারের সদস্যরা অধরা

  • হুন্ডিতে বিপুল ডলার নিয়ে যাচ্ছে পলাতক লীগ নেতারা।

লণ্ডন, ১৭ অক্টোবর- ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ও আগস্ট বিপ্লবে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দলের কেন্দ্রীয় থেকে তৃণমূলের নেতারা জেল রিমান্ডে থাকলেও শেখ পরিবারের কারও কিছু হয়নি। ঢাকা ছেড়ে ভারত পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার বিষয়টি পরিষ্কার। তবে হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত শেখ পরিবারের বাকিরা আজও রয়েছেন ধরাছোয়ার বাইরে।

বিষয়টি নিয়ে বুধবার দেশের একটি জাতীয় দৈনিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মাঠে প্রভাবশালী শেখ পরিবারের কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শেখ হাসিনার পতনের পর আত্মগোপনে চলে যান আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা। গাঢাকা দিয়েছেন মাঝারি ও তৃণমূল পর্যায়ের অনেক প্রভাবশালী নেতাও। মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয়ে প্রকাশ্যে আসছেন না দলটির কোনো নেতাকর্মী। এর মধ্যে দলীয় বিভিন্ন পদে থাকা অনেককে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দলীয় পদের বাইরে সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের গ্রেপ্তারের ঘটনা চলমান। এত কিছুর মধ্যেও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ‘শেখ পরিবারের’ বেশির ভাগ সদস্যের হদিস মিলছে না।

বর্তমানে শেখ হাসিনা ভারতের দিল্লিতে অবস্থান করছেন, কিন্তু তাঁর সঙ্গে ছোট বোন শেখ রেহানা ঢাকা ছাড়লেও তাঁর অবস্থানের বিষয়টি পরিষ্কার নয়। শেখ রেহানার ব্রিটিশ পাসপোর্টও রয়েছে। তাই তিনি বড় বোনের সঙ্গে ভারতে আছেন, নাকি অন্য কোথাও চলে গেছেন—এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের অবস্থানও অনেকের জানা। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার আগে থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। তাঁর মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত। চাকরির কারণে তিনি আগে থেকে ভারতে অবস্থান করছেন। শেখ রেহানার ছেলে রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববির নেতৃত্বে পরিচালিত হতো আওয়ামী লীগের গবেষণা সেল সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)। শেখ রেহানার দুই মেয়ে। বড় মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ সংসদের সদস্য। ছোট মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তী। রেদওয়ান কোথায় অবস্থান করছেন, সেটি অজানা। তবে টিউলিপ সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তী যুক্তরাজ্যে রয়েছেন।

বিগত চার সরকারের নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সরকারের আটজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনার স্বজনরা। সিটি করপোরেশনের মেয়র তিনজন, সহযোগী সংগঠনের চেয়ারম্যান ও সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করেন আরো তিনজন। এ ছাড়া অনেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ও সহযোগী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তাই দেশের রাজনীতিতে ঘুরেফিরে এখনো বড় প্রশ্ন—শেখ পরিবারের প্রভাবশালী অন্যরা কোথায়?

শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিম আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য। তাঁর দুই ছেলে শেখ ফজলে ফাহিম ও শেখ ফজলে নাইম। ফাহিম ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি ছিলেন। ৫ আগস্টের পর থেকে শেখ সেলিমের পরিবার আত্মগোপনে আছে। শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্র দাবি করছে, শেখ সেলিম এখনো দেশেই আছেন। তবে এই তথ্যের সত্যতার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। শেখ সেলিমের ভাই শেখ ফজলুল হক মনির দুই সন্তান শেখ ফজলে শামস পরশ ও শেখ ফজলে নূর তাপস। ৫ আগস্টের পর থেকে তাঁদের খোঁজ নেই। শেখ তাপস ঢাকার সাবেক এমপি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র। সরকার পতনের দুই দিন আগে সিঙ্গাপুর যান তিনি। শেখ পরশও দেশ ছেড়েছেন বলে জানা যায়। শেখ সেলিমের ছোট ভাই শেখ ফজলুর রহমান মারুফ ক্যাসিনো বিতর্কের সময় আলোচনায় এসেছিলেন। তিনি বর্তমানে সিঙ্গাপুরে আছেন বলে জানা গেছে। তাঁর ভগ্নিপতি যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীও আত্মগোপনে আছেন।

শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ বরিশাল-১ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। তাঁর ছেলে সাদিক আব্দুল্লাহ ছিলেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র। ৫ আগস্টের পর হাসনাত আব্দুল্লাহ ও ছোট ছেলে সুকান্ত আব্দুল্লাহ দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান বলে জানা গেছে। তবে সাদিক আব্দুল্লাহ কোথায় আছেন—এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাঁর ছোট ভাই আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র। তিনি কোথায় আছেন, তা জানা যাচ্ছে না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট ভাই শেখ আবু নাসেরের পাঁচ ছেলে। তাঁদের মধ্যে দুজন শেখ হেলাল উদ্দিন ও শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল গত সংসদেও সদস্য ছিলেন। আবার শেখ হেলালের ছেলে শেখ তন্ময়ও গত দুই সংসদের সদস্য ছিলেন। জানা গেছে, হেলাল ও তন্ময় বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। হেলালের আরেক ভাই শেখ জুয়েল। ৫ আগস্টের পর জুয়েল দেশে ছিলেন। তবে তাঁদের আরো তিন ভাই শেখ সোহেল, শেখ রুবেল ও শেখ বেলাল এখন কোথায় আছেন, তা কেউ জানে না।

শেখ হাসিনার ফুফাতো বোন শেখ ফাতেমা বেগমের এক ছেলে নূর-ই আলম চৌধুরী (লিটন চৌধুরী) একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ছিলেন। আরেক ছেলে মুজিবুর রহমান চৌধুরী (নিক্সন চৌধুরী) ফরিদপুর-৪ আসন থেকে টানা তিনবারের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ৫ আগস্টের পর থেকে এই দুই ভাইও আত্মগোপনে আছেন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চাচাতো বোন ফিরোজা বেগমের স্বামী। ৫ আগস্টের পর তিনি ভারত গেছেন বলে শোনা যাচ্ছে।

হুন্ডিতে বিপুল ডলার নিয়ে যাচ্ছে পলাতক লীগ নেতারা

বর্তমানে দেশে প্রতি মাসে দুই বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স আসছে। এর পরও ১২০ টাকার নিচে ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়লে দাম কমে। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়লেও সেই হারে দাম কমেনি। অন্যদিকে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ কমায় ব্যাপক হারে শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে। অথচ এখানেই ডলারের প্রয়োনীয়তা সবচেয়ে বেশি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই অতিরিক্ত ডলার হুন্ডির মাধ্যমে আবারও বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। সরকার পতনের পর থেকে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা যতটা সম্ভব ডলার সঙ্গে নিয়ে বর্ডার পার হয়ে অন্য দেশে চলে গেছেন, অনেকে যাওয়ার চেষ্টায় আছেন। আবার যাঁরা পালিয়ে বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন, তাঁরা হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে ডলার নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বর্তমানে প্রতি মাসে আমদানির জন্য ব্যয় হচ্ছে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার। সেখানে রপ্তানি আয় তিন বিলিয়ন ডলার। বাকি দুই বিলিয়ন ডলারের চাহিদা পূরণ করছে রেমিট্যান্স। কোনো কোনো মাসে আড়াই বিলিয়ন ডলারও আসছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ডলারের দাম কেন ১২০ টাকার নিচে নামছে না? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ব্যাংকে বর্তমানে এলসির চাহিদা কম, কমেছে বিদেশে ভ্রমণ, চিকিত্সা নিতে যাওয়া মানুষের সংখ্যাও কমেছে। আবার আগামী জানুয়ারি মাসের আগে পড়ালেখাকেন্দ্রিক বিদেশে ডলার পেমেন্টের চাপও তৈরি হবে না। এ আবস্থায় রেমিট্যান্সের মাধ্যমে যে ডলার দেশে আসছে তা আবার হুন্ডি হয়ে বিদেশে পাচার হচ্ছে। দেশের সম্পদ রক্ষা করতে এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

আওয়ামী লীগের অর্ধশত মন্ত্রী-এমপি বিপুল অর্থ-সম্পদ বিদেশে পাচার করেছেন। গত ১৫ বছরে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে যে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তাঁরা, এর বেশির ভাগই বিদেশে পাচার করেছেন। এই তথ্য বের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান, আমলে নেওয়া অভিযোগ এবং কমিশনের গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্যানুসারে, গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেশ থেকে অন্তত ১৪ হাজার ৯২০ কোটি বা ১৪৯.২০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় পাচার করা টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলারে ১১৮ টাকা ধরে)। এ হিসাবে গড়ে প্রতিবছর পাচার হয়েছে অন্তত এক লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা।

সম্প্রতি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ভারতের কলকাতার একটি পার্কে দেখা গেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশ বলছে, তিনি হয়তো অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গেছেন। তিনিও হুন্ডি পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ৬ আগস্ট ঝালকাঠি-২ আসনের সংসদ সদস্য আমির হোসেন আমুর ঝালকাঠির বাসভবন থেকে ডলার, ইউরোসহ প্রায় পাঁচ কোটি টাকা উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী ও পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, বিদেশে পালানোর জন্য তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাই টাকা ও ডলার নিয়ে বাসায় জড়ো করেছিলেন তিনি। ২৪ আগস্ট ভারত সীমান্ত থেকে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে তিনি সীমান্তে প্রতারিত হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। দালালরা মারধর করে তাঁর কাছে থাকা ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা নিয়ে গেছে বলেও জানান। তখনো তাঁর সঙ্গে ছিল বাংলাদেশি ও ব্রিটিশ পাসপোর্ট, ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ও কিছু টাকা। সূত্র বলছে, এই বয়সে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকার ব্যাগ বহন করা সম্ভব নয়। এসব টাকা ছিল ডলার ফরম্যাটে।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *