বিশ্বের অন্যতম সেরা চৌকস সুনিপুণ কিংবদন্তি বাঙালি বিমানযোদ্ধা ও লিভিং ঈগল হিসেবে খ্যাত গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব:) সাইফুল আজম আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ৭৯ বছর বয়সে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে দুপুর ১টায় আইসিইউ-তে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি বাংলাদেশ বিমান বাহিনী থেকে গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি সিভি এভিয়েশন অথরিটির চেয়ারম্যান এফডিসির এমডি হিসাবে ও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে পাবনা-৩ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। শেষ জীবনে তিনি ঢাকার মহাখালী ডিওএইচএসে অবসর জীবনযাপন করেন।
অসীম সাহসী এই বৈমানিক ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ এবং ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং একাধিক যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে ইতিহাসে স্থান করে নেন। আরব ইসরাইল যুদ্ধে তিনি ইরাক জর্ডান সীমান্তে ইসরাইলের তিনটি যুদ্ধ বিমান একাই ভূপাতিত করেন। এমন বীরত্বের জন্য পুরস্কারস্বরূপ জর্ডান সরকার সাইফুল আজমকে ‘হুসাম-ই-ইস্তিকলাল’ সম্মাননায় ভূষিত করেন।
অন্যদিকে পাক-ভারত যুদ্ধেও পশ্চিম সীমান্তে তিনি শত্রুপক্ষের দু’টি বিমান ভূপাতিত করেন। বীরত্বের পুরস্কারস্বরূপতাকে পাকিস্তানের তৃতীয় সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘সিরাত-ই- জুরাতে’ ভূষিত করা হয়। তৎকালীন সেসনা টি৩৭ এবং সাবোর জেট এফ-৮৬ দিয়েই বিমানযুদ্ধে শত্রুর মেরুদণ্ড ভেঙে দেন তিনি। সাইফুল আজমের অসম সাহসিকতার এই বিমানযুদ্ধের কাহিনী বিশ্বের বহুদেশের বৈমানিকদের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের ২২ জন সেরা বৈমানিকের অন্যতম হিসেবে তাকে ‘লিভিং ঈগলস’ খেতাব প্রদান করেন।
পাবনা-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সাইফুল আজম সুজার যে সব কর্মকাণ্ড বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশকে গর্বিত করে সে সব ঘটনার কথা বর্তমান প্রজন্মের অনেকেরই অজানা।
সাইফুল আজম সুজা নিজ জীবদ্দশায় তিনি চারটি দেশের (জর্ডান, ইরাক, পাকিস্তান, বাংলাদেশ) পাইলট হয়ে আকাশে রাজত্ব করেন এবং সর্বোচ্চ সংখ্যক ফাইটার বিমান ভূপতিত করেন! ভারত এবং ইসরাইল এর পাইলটদের চোখে তিনি ছিলেন এক মূর্তিমান আতঙ্ক! তিনি পৃথিবীর ইতিহাসের একমাত্র যোদ্ধা যিনি আকাশপথে তিনটি ভিন্ন দেশের বিমানবাহিনীর হয়ে লড়াই করেন। এ ছাড়া আটটি ভিন্ন দেশের আট বাহিনীর বিমান তিনি পরিচালনা করেন আর একক ব্যক্তি হিসেবে আকাশপথের যুদ্ধের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক ইসরাইলি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার অনন্য রেকর্ড করেন। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে একের পর এক ইতিহাস রচনা করেন এই বীর বাঙালি।
১৯৭১ সালের আগে পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন সাইফুল আজম। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে যোগ দেন। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে তিনি ডিরেক্টর অব ফ্লাইট সেফটি ও ডিরেক্টর অব অপারেশনস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিমান ঘাঁটির কমান্ড লাভ করেন এবং ১৯৭৭ সালে গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৭৯ সালে তিনি বাংলাদেশ বিমান বাহিনী থেকে গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় ১৯৬৭ সালের জুন মাসে তৃতীয় আরব-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে অংশ নিতে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ইরাকি বিমানবাহিনীতে বদলি হন সাইফুল আজম। পশ্চিম ইরাকে অবস্থান নিয়ে ইসরাইলিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলেন তিনি।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র ৫ দিনের মাথায় গাজা এবং সিনাইয়ের কর্তৃত্ব নিয়েছিল ইসরাইল। জুনের ৫ তারিখে সিরীয় বিমানবাহিনীর দুই-তৃতীয়াংশ শক্তি ধ্বংস করে দেয় ইসরাইলি বিমান সেনারা।
তেমন কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই ইসরাইল পশ্চিম তীর এবং জেরুজালেম তারা দখল করেছিল। দখল করেছিল সিরিয়ার গোলান মালভূমিও। তাদের সামনে বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ তৈরি করতে পারেনি মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ। এ সময় ইসরাইলিদের যমদূত হয়ে জর্ডানে যান সাইফুল আজম।
৬ জুন আকাশ থেকে প্রচণ্ড আক্রমণে মিসরীয় বিমানবাহিনীর যুদ্ধ-সরঞ্জাম গুঁড়িয়ে দেয় ইসরাইলি বাহিনী। একই দিন বেলা ১২টা ৪৮ মিনিটে চারটি ইসরাইলি সুপারসনিক ‘ডাসল্ট সুপার মিস্টেরে’ জঙ্গি বিমান ধেয়ে আসে জর্ডানের মাফরাক বিমান ঘাঁটির দিকে। এবার তাদের লক্ষ্য জর্ডানের ছোট্ট বিমানবাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া।
সে সময় ইসরাইলি সুপারসনিকের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো সমকক্ষ বিমান আরবীয়দের ছিল না। তবু ইসরাইলিদের ঠেকাতে মাফরাক বিমান ঘাঁটি থেকে ‘হকার হান্টার’ জঙ্গি বিমান নিয়ে বুক চিতিয়ে উড়াল দেন সাইফুল আজম।
আর সেই হকার হান্টার দিয়েই ক্ষিপ্রগতির দুটি ইসরাইলি সুপারসনিক ঘায়েল করে ফেললেন সাইফুল আজম। তার অব্যর্থ আঘাতে ভূপাতিত হয় একটি ইসরাইলি ‘সুপার মিস্টেরে’। আরেক আঘাতে প্রায় অকেজো হয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে কোনো মতে পালিয়ে ইসরাইলি সীমানায় গিয়ে আছড়ে পড়ে আরেকটি বিমান।
সে দিন অকুতোভয় বৈমানিক সাইফুল আজমের অকল্পনীয় বীরত্বের কারণে ইসরাইলের পুরো পরিকল্পনাই ভেস্তে যায়। উল্টো নিজেদেরই দুটো বিমান হারায় তারা।
সাইফুল আজমের কাছে ইসরাইলি বৈমানিকদের ধরাশায়ী হওয়া এটাই প্রথম। পরদিনই তার কৃতিত্বে ইরাকি বৈমানিক দলের কাছে চরমভাবে পরাজিত হয় ইসরাইলিরা।
৭ জুনে ইরাকের ‘এইচ-থ্রি’ ও ‘আল-ওয়ালিদ’ ঘাঁটি রক্ষা করার দায়িত্ব পড়ে এক ইরাকি বৈমানিক দলের কাঁধে। আর সাইফুল আজম সেই দলের অধিনায়ক।
সে দিন চারটি ‘ভেটোর বোম্বার’ ও দু’টি ‘মিরেজ থ্রিসি’ জঙ্গি বিমান নিয়ে আক্রমণ চালায় ইসরাইল।
একটি ‘মিরেজ থ্রিসি’ বিমানে ছিলেন ইসরায়েলি ক্যাপ্টেন গিডিওন দ্রোর। দ্রোরের গুলিতে নিহত হন আজমের উইংম্যান। তার হামলায় ভূপাতিত হয় দুটি ইরাকি বিমান। পরক্ষণেই এর জবাব দেন আজম। তার অব্যর্থ টার্গেটে পরিণত হয় দ্রোরের ‘মিরেজ থ্রিসি’। সে আঘাতের পর বাঁচার উপায় না পেয়ে যুদ্ধবন্দি হিসেবে ধরা দেন ক্যাপ্টেন দ্রোর। ওই যুদ্ধবন্দির বিনিময়ে জর্ডান ও ইরাকের সহস্রাধিক সৈন্যকে মুক্ত করে ইসরাইল।
আরব-ইসরাইল যুদ্ধের প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই সাইফুল আজম একটি অনন্য রেকর্ড তৈরি করেন। ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ভূপাতিত করেছেন সর্বোচ্চ তিনটি ইসরাইলি বিমান। যে জন্য তাকে ‘নাত আল-সুজাহ’ সামরিক সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।
শুধু আরব যুদ্ধেই কৃতিত্ব দেখাননি সাইফুল আজম। এর আগে ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে তার বীরত্বে আক্রান্ত হয় ভারতীয় ‘ফোল্যান্ড নেট’ জঙ্গি বিমান। সে বিমান থেকে ভারতের ফ্লাইট অফিসার বিজয় মায়াদেবকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটক করা হয়।
সে সময় প্রশিক্ষকের দায়িত্বে থাকাকালীনই সেপ্টেম্বর পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ১৭ নম্বর স্কোয়াড্রনের হয়ে ‘এফ-৮৬ স্যাবরজেট’ জঙ্গি বিমান নিয়ে তিনি এ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন।
বিরল এই পারদর্শিতার স্বীকৃতিস্বরূপ সাইফুল আজমকে পাকিস্তানের তৃতীয় সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা ‘সিতারা-ই-জুরাত’-এ ভূষিত করা হয়।
সাইফুল আজমই পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র বৈমানিক যিনি চারটি দেশের বিমানবাহিনীর সৈন্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই চারটি দেশ হল পাকিস্তান, জর্ডান, ইরাক ও মাতৃভূমি বাংলাদেশ।
এ ছাড়া আটটি ভিন্ন দেশের আট বাহিনীর বিমান পরিচালনা করেছেন আজম। যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, ইংল্যান্ড, জর্ডান, ইরাক, রাশিয়া, চীন ও নিজ মাতৃভূমি বাংলাদেশের হয়ে বিমান চালিয়েছেন তিনি।
যুদ্ধক্ষেত্রে অনন্য সব অর্জন আর ইতিহাস গড়া সাইফুল আজমকে ২০০১ সালে ইউনাইটেড স্টেটস এয়ার ফোর্স বিশ্বের ২২ জন ‘লিভিং ইগলস’-এর একজন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
কিংবদন্তি এই বীর বাঙালি আর নেই। দীর্ঘদিন তিনি নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন। উল্লেখ্য বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ারভাইস মার্শাল ফখরুল আজম তার ছোট ভাই। তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া

