শিরোনাম
বুধ. ফেব্রু ৪, ২০২৬

সামার ট্রিপে লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব পরিবারের সমুদ্রভোজন!

।। হাসনাত আরিয়ান খান ।।

বাঙালি ভ্রমণপ্রিয় জাতি। শীত, গ্রীস্ম, বর্ষা সব ঋতুতেই তারা ভ্রমণ করেন। ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন। ব্যক্তিগতভাবে ভ্রমণ করেন, পারিবারিকভাবে ভ্রমণ করেন এবং বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ভ্রমণ করেন। ছুটির মৌসুম গ্রীস্মকালে ভ্রমণ একটু বেশিই করেন। দেশেও করেন , বিদেশেও করেন। সামার ট্রিপ, ঘুরতে যাওয়া, ভ্রমণ বা ট্র্যাভেলিং, যে নামই দিই না কেন, বাঙালির কাছে কতটা জনপ্রিয় তা বাঙালির ফেইসবুকের নিউজফিডের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। ভ্রমণকারীদের মধ্যে দু’একজন বাঙালির দেখা মিলবে না এ সম্ভাবনা খুবই কম। কাজেই বাঙালিকে বেড়ানোর শখ কার আছে প্রশ্নটা না করে ‘কার নেই’ সে প্রশ্নটা করাই ভালো! অজানাকে জানার এবং দেখার নেশা বাঙালির সেই আদিকাল থেকেই ছিল। জানা যায়, ইবনে বতুতা, হিউয়েন সাং, কলম্বাস, ভাস্কো দা গামা, মার্কোপোলো কিংবা গল্পের ফিলিয়াস ফগ, এদের সবার পূর্ব পুরুষ বাঙালি ছিলো। এরই ধারাবাহিকতায় লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব পরিবার প্রতি বছর সামার ভেকেশনে ‘সামার ট্রিপ’ নামক গ্রীষ্মকালীন আনন্দ ভ্রমণের আয়োজন করে আসছিলো। গত দু‘বছর করোনা মহামারীর কারণে বার্ষিক এই ‘সামার ট্রিপ’ বন্ধ ছিলো। সঙ্গত কারণেই প্রেস ক্লাব পরিবারের সদস্যদের সবার মন খুব খারাপ ছিলো। ‘সাপ্তাহিক দেশ’ পত্রিকার তাইসির ভাই ও ‘সাপ্তাহিক বাংলা পোস্ট’ পত্রিকার তারেক ভাইয়ের মত যাদের দাড়ি গোঁফ ছিলোনা, ইত্যবসরে  তাদের দাড়ি গোঁফ গজিয়ে গিয়েছিলো। সর্বশেষ ২০১৯ সালে উৎসবমুখর পরিবেশে সামার ট্রিপ অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। এবারের সামার ট্রিপকে ঘিরে তাই সবার মধ্যে একটা বাড়তি আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও উত্তেজনা বিরাজ করছিলো। সমুদ্রভোজনের পরিকল্পনা জেনে সেই আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও উত্তেজনা আরও বেড়ে গিয়েছিলো। সমুদ্র দেখতে আমরা কে না ভালোবাসি! প্রকৃতির রহস্যময় সৃষ্টিগুলোর মধ্যে সমুদ্র অন্যতম। বিশাল সমুদ্রের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অপার রহস্য, সৌন্দর্য ও বিস্ময়! এই সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে বিস্তৃত বালুকারাশি, নুড়ির প্রবাল আর ঢেউয়ের দোলায়। সমুদ্রের বিশালতা মানুষকে সব সময় তার কাছে টানে, স্রষ্টার সৃষ্টি রহস্য জানায়, আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং মানুষের মনের পরিধিকে বিস্তৃত করে। এজন্য পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ এই সমুদ্রের পাশে সময় কাটাতে বেশ পছন্দ করেন। নিকোস বলেছেন, ‘সমুদ্রের অপূর্ব সৌন্দর্যকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা কারো নেই’। আলাইন গার্বল্ট বলেছেন, ‘স্বাধীনতা, মুক্ত বাতাস এবং দু: সাহসিক কাজ, এই তিনটি একমাত্র সমুদ্রেই পাওয়া সম্ভব’। কেট চোপিন বলেছেন, ‘সমুদ্রের শব্দ আত্মার সাথে কথা বলে’। রিক রিডোরান বলেছেন, ‘নিজেকে সমুদ্রে মুক্তভাবে ছেড়ে দিয়ে দেখে নাও তুমি কেমন’। ভ্যান মরিসন বলেছেন, ‘সমুদ্রের গন্ধ নাও এবং আকাশকে অনুভব করো। সমুদ্রের গন্ধ নেওয়ার মাধ্যমেই তুমি আকাশকে অনুভব করতে পারবে’। রালফ ওয়াল্ডো বলেছেন, ‘সমুদ্রে সাঁতার কাটুন, রোদে থাকুন, বনের বাতাস গ্রহণ করুন আর প্রকৃতিকে উপভোগ করুন’। মাইকেল জনসন বলেছেন, ‘যে ব্যাক্তি সমুদ্র না দেখেই মরে যায়, সে জীবনে দারুণ কিছু মুহূর্ত উপভোগ করতে পারেনি’। রুমি বলেছেন,  ‘বসে বসে অপেক্ষা করবেন না। সেখান থেকে বেরিয়ে আসুন, জীবন অনুভব করুন। সূর্য স্পর্শ করুন, এবং সমুদ্রের মাঝে নিমজ্জিত হউন’।

ভ্রমণের স্থান

লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব পরিবারের এবারের সামার ট্রিপের গন্তব্য ছিলো, বিনোদনের স্বর্গরাজ্য বলে খ্যাত ইংল্যান্ডের ‘ক্ল্যাকটন-অন-সি’। ক্ল্যাকটন-অন-সি হলো ইংল্যান্ডের এসেক্স কাউন্টির টেন্ডারিং জেলার একটি সমুদ্রতীরবর্তী শহর। এসেক্স সানশাইন উপকূলের বৃহত্তম শহর। ১৮৭১ সালকে এই শহরটির প্রতিষ্ঠার বছর হিসাবে দেখা হয়। শহরের জনসংখ্যা মাত্র ৫৬, ৮৭৪ জন। শহরটি রাজধানী লন্ডনের প্রায় ৮৫ মাইল উত্তর-পূর্বে, চেমসফোর্ড থেকে ৪২ মাইল, সাউথেন্ড-অন-সি থেকে ৫৮ মাইল, কোলচেস্টারের দক্ষিণ-পূর্বে ১৬ মাইল এবং হার্উইচ থেকে ১৮ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে এটি একটি বিখ্যাত পর্যটন শহর। উত্তর মহাসাগরের পাড়ে অবস্থিত শহরটিকে বলা হয় ব্রিটিশ সমুদ্রতীরবর্তী রিসর্টের প্রতীক। ইউরোপের প্রাচীন ইতিহাসে উত্তর মেরু অভিযানের নজির বিশেষ নেই। এই অঞ্চলের ভূগোল সম্পর্কে সঠিক ধারণাও সে যুগে কারো ছিল না। বছরের অধিকাংশ সময় এই উত্তর মহাসাগরের অংশবিশেষ সামুদ্রিক বরফে ঢাকা থাকত। শীতকালে সম্পূর্ণ মহাসাগরটিই বরফে ঢাকা পড়ে যেতো। গ্রীষ্মকালে প্রায় অর্ধেক বরফ গলে যেতো। উত্তর মহাসাগরের তাপমাত্রা ও লবণাক্ততা ঋতু অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। বলা হয়, সমুদ্রের বরফের আবরণীর গলন ও জমাট বাঁধার কারণেই এমনটি হয়ে থাকে। পাঁচটি প্রধান মহাসাগরের তুলনায় এই মহাসাগরের পানির লবণাক্ততা কম। এর কারণ, বাষ্পীভবনের নিম্ন হার, বিভিন্ন বড় ও ছোটো নদী থেকে এসে মেশা মিষ্টি পানির প্রবাহ এবং পার্শ্ববর্তী উচ্চ লবণাক্ততাযুক্ত মহাসাগরগুলির সঙ্গে সীমাবদ্ধ সংযোগ ও বহির্গমন স্রোত। এ কারণে উত্তর মহাসাগরে দুটি ভিন্ন রংয়ের পানির প্রবাহ পরিলক্ষিত হয়। পূর্ব লন্ডনের লিভারপুল স্ট্রিট স্টেশন থেকে মাত্র দুই ঘন্টার ট্রেনে যাত্রায় উত্তর মহাসাগরের উপকূলীয় শহর ‘ক্ল্যাকটন-অন-সি’ তে পৌছানো যায়। এখানে একটি আনন্দ পিয়ার, আর্কেড, একটি গল্ফ কোর্স, ক্যারাভান পার্ক, ওয়েস্ট ক্লিফ থিয়েটার ও প্রিন্সেস থিয়েটার নামে দুটি থিয়েটার এবং একটি এয়ারফিল্ড আছে। এমনকি যারা ভিজে না গিয়ে সামুদ্রিক জীবন দেখতে চান তাদের জন্য একটি সিওকুরিয়াম রয়েছে। এছাড়া এখানে ক্ল্যাকটন কার্নিভাল সহ একটি বার্ষিক বিনোদন অনুষ্ঠান রয়েছে, যা আগস্টের দ্বিতীয় শনিবার থেকে শুরু হয় এবং এক সপ্তাহ ধরে চলে। আগস্ট ব্যাঙ্ক হলিডের আগের বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারে এখানে এয়ারশো চলে। যেখানে ল্যাঙ্কাস্টার, স্পিটফায়ার, হারিকেন, হ্যারিয়ার, জাগুয়ার, টর্নেডো এবং হেলিকপ্টারের মতো ঐতিহাসিক এবং আধুনিক বিমানগুলো প্রদর্শিত হয়। তবে গ্রীষ্মকালে পর্যটকদের কাছে এর প্রধান ও সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান হলো বিস্তীর্ণ সমুদ্র সৈকত।  ক্ল্যাকটন-অন-সি,  এবছর তার সার্ধশত উদযাপন করছে এবং এই উপলক্ষে সেখানে একটি ধারাবাহিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ভ্রমণের প্রস্তুতি

আজ থেকে মাস খানেক আগের কথা। লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের ইভেন্ট সেক্রেটারি ‘চ্যানেল এস’ এর রিপোর্টার রেজাউল করিম মৃধা ভাইয়ের সাথে রাস্তায় দেখা হতেই তিনি আমাকে সামার ট্রিপের প্রস্তুতি নিতে বলেছিলেন। প্রথমে ‘কভেন্ট্রির ট্রান্সপোর্ট মিউজিয়াম‘ এ ও পরে তীব্র গরমের কথা চিন্তা করে তারিখ ও ভেন্যু পরিবর্তন করে ‘ক্ল্যাকটন-অন-সি’ তে যাওয়ার নিমন্ত্রণ জানিয়ে প্রেস ক্লাবের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে মেসেজ দিয়েছিলেন। তার দু‘দিন পরে ক্লাবের ট্রেজারার সালেহ ভাইয়ের সাথে দেখা হলে তিনিও একই কথা বলেছিলেন এবং আমার সাথে পরিবারের কে কে যাবেন জানিয়ে খুব দ্রুত কনফার্ম করতে বলেছিলেন। সমুদ্রের ডাকে সবাই যেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেছিলাম। সমুদ্রের প্রতি টান আমার শৈশব থেকেই! সমুদ্রের বিশালতা, ঢেউ আছড়ে পড়ার শব্দ আর নোনা হাওয়া আমাকে সব সময় হাতছানি দেয়। সমুদ্র আমাকে কেবল হাতছানি দিয়ে ডাকে, আয় আয় আয়! আমি আমার ভাতিজা হাসান শোয়াইব খান অনন্ত’র সাথে কথা বললাম। তিন গোয়েন্দা পড়ে সমুদ্রের প্রতি তারও একটা সুপ্ত ভালোবাসা জন্ম নিয়েছে। মনে মনে লস এঞ্জেলসের সেই রকি বিচ ঘুরে এসেছে। সমুদ্রে যাওয়ার কথা শুনে সেও এক পায়ে খাঁড়া। এদিকে সামার ট্রিপের কথা কানে যাওয়া মাত্রই ‘যমুনা টিভি’র লন্ডন প্রতিনিধি কাওছার ভাই ফোন দিয়েছেন। কেঁপে কেঁপে বলছেন, ‘সত্যি তাহলে এবছর সামার ট্রিপে যাওয়া হচ্ছে’! কে কে যাচ্ছেন, কাওছার ভাইয়ের মত আরও অনেকেই ফোন করে জানতে চাচ্ছেন। ‘ঢাকা পোস্ট’ এর খানশূর ভাইয়ের মত নেতাগোছের কেউ কেউ অতি আনন্দে অন্যের ভ্রমণ ফি দিয়ে দিচ্ছেন। মৃধা ভাই এর মাঝে মেসেজ দিয়ে সবাইকে বাসে গান, কবিতা, কৌতুক ও সমুদ্র সৈকতে নানান খেলা আয়োজনের কথা বলছেন। সেই সাথে নানান আকর্ষণীয় পুরস্কারের লোভ দেখাচ্ছেন। কাওছার ভাই গানে প্রথম হওয়ার আশা করছেন এবং অন্যদেরকে কবিতা, কৌতুক বা কোন খেলাধুলার প্রস্তুতি নিতে বলছেন। আকর্ষণীয় পুরস্কারের লোভে সবাই প্রস্তুত হচ্ছেন। প্রস্তুতি নিতে নিতে কেউ কেউ সমুদ্র ভ্রমণের বিচিত্র অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন। একজন বলছেন, ‘কক্সবাজার সমুদ্রে ডুব দিয়ে ওঠার পর তিনি সামনে কোন বাচ্চাকে প্রস্রাবরত অবস্থায় দেখেছেন‘। আরেকজন বলছেন, ‘কেরালা সমুদ্রে গোসল করে পাঁড়ে ওঠার পর তিনি পানিতে মল ভাসতে দেখেছেন‘। অন্যজন বলছেন, ‘‘ভ্রমণে এমন কিছু সঙ্গী পাবেন যারা শুধু অভিযোগ করবেন। এদের কাজ হচ্ছে পুরা পথে শুধু অভিযোগ করা। খাবারে লবণ বেশি কেন, বাস এত আস্তে চলে কেন, রাস্তায় এত জ্যাম কেন, আবহাওয়া এত গরম/ঠান্ডা কেন, হাতে পায়ে ব্যথা করে কেন- ইত্যাদি ইত্যাদি বলে সবার মাথা ধরিয়ে দিবে এরা। এরা গ্র্যাণন্ড ক্যানিয়ন দেখে বলবে, ‘গর্ত এত ছোট কেনো, ডিজনিল্যান্ড দেখতে গিয়ে বলবে, ‘চারদিকে এত পুলাপান কেনো’, রকি মাউন্টেন দেখতে গিয়ে বলবে ‘পাহাড়ে গাছ নাই কেনো’, নায়াগ্রা দেখতে গিয়ে বলবে, ‘পানি পড়া দেখতে এত দূরে আসলাম কেনো!’ আবার এমন কিছু সঙ্গী পাবেন যারা ভ্রমণ পথে শুধু ঘুমাবেন। শিশুদের কোলে নিয়ে একটু দোলা দিলে যেমন ঘুমিয়ে পড়ে; বাস, ট্রেন বা প্লেনের দোলাতেও তারা দিব্যি ঘুমিয়ে পড়ে। এরা বিশাল এনার্জি নিয়ে ‘ইয়াহু ঘুরতে যাচ্ছি’ বলে চিৎকার চেঁচামেচি করে ভ্রমণ শুরু করে। তারপর গাড়িতে উঠেই ঘুম। ঢুলতে ঢুলতে আধো ঘুম আধো জাগরণে এরা ভ্রমণ শেষ করে। আরেকজন বলছেন, ‘বিবাহিত লোক মাত্রই জানেন আপনি আহ্লাদ করতে গেলে আপনার স্ত্রী যদি মুখ কুঁচকে আপনাকে বলে মাথা ধরেছে, তার মানে ‘ডাল ম্যায় কুচ কালা হ্যায়’। নিশ্চিত জানবেন সেই মাথাধরার কারণ আপনি। ভ্রমণেও এইরকম কিছু মুখ কুঁচকানো মাথাধরা বয় বা গার্ল দেখা যায়। আমরা সব বন্ধু মিলে একবার সমুদ্রে বেড়াতে গেলাম। সৈকতের পাশে বাড়ি, সেখানে রান্নাবান্নার ব্যবস্থা। দিনের বেলা ঘুরেটুরে রাতে সবাই মিলে রান্না করতাম। তখন একজনের রাতকানা রোগ হল। সারাদিন ভাল, রাত হলেই তাঁর গা ম্যাজম্যাজ করে, মাথাব্যথা করে, মরণাপন্ন অবস্থা হয়। পরে বুঝলাম যেনো কোনো কাম-কাজ না করতে হয় সেজন্য শালা ভাব ধরেছে। সবাই মিলে রান্নাবান্না করত আর সেই ব্যাটা দুই তিন থালা খেয়ে ঘুম দিত। সকালে উঠে দিব্যি চাঙ্গা। এরকম মাথাধরা রোগী কোনো কারণে বিরক্ত হয়ে বা ভাব ধরে পুরো ভ্রমণ জুড়ে বাংলার পাঁচের মত চেহারা করে বসে থাকবে’। অন্য একজন পরামর্শ দিচ্ছেন, ‘ভ্রমণে মল গার্ল সাথে নিবেন না। মল মানে শপিংমল। যুক্তরাজ্যের লন্ডন ও পোর্টসমাউথের দোকানে যা পাওয়া যায়, এসেক্স ও ক্ল্যাকটন-অন-সির দোকানেও প্রায় একই জিনিস পাওয়া যায়। তারপরেও দ্য মল গার্ল সাথে থাকলে সামনে পাওয়া গিফট শপ, শপিংমল সবখানে একবার ঢুঁ মারতে মারতে আপনার ঘোরার আনন্দটাই মাটি করবে। এইটা দেখবে, সেইটা হাতাবে তারপর দুই ঘন্টা খরচ করে দুই টাকা দামের একটা ফ্রিজ ম্যাগনেট কিনে পরের দোকানে গিয়ে ঢুকবে’। আরেকজন পরামর্শ দিচ্ছেন, ‘মোবাইল আসক্ত কোন লোক সাথে নিবেন না। এরা পুরা পথ তাঁর স্মার্টফোনের দিকে তাকিয়ে খুটমুট করে যাবে। ‘গোয়িং সামার ট্রিপ, ইয়াহু’ বলে স্ট্যাটাস মেরে তারপর প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় আপডেট দিবে ‘আমি এখন এইখানে’। টয়লেটে গিয়ে তার কমোড থেকে শুরু করে সব কিছুর ছবি তুলে আপলোড করে দিবে। খাওয়ার ছবি, খাওয়ার পরে ঝুটা খাবারের ছবি, ঝোলের দাগ লেগে থাকা নোংরা প্লেটের ছবি সব আপলোড করবে। গন্তব্যে পৌঁছে, ‘সমুদ্র, হেয়ার আই কাম’ বলে ছবি তুলে ফেইসবুকে আপলোড দিয়ে কমেন্ট পড়ার জন্য বসে থাকবে। স্মার্টফোনের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে পুরা ভ্রমণ তাঁর শেষ হয়ে যাবে, চর্মচক্ষু দিয়ে আর কিছু দেখা হবে না’। সদস্যদের কেউ কেউ নানা দেশের নানা বিষয়ে ভ্রমণপিপাসুদের সতর্ক করছেন। কেউ বলছেন, ‘লন্ডনে চলাফেরার সময় একটু খেয়াল রাখবেন, যেনো আপনার প্যান্টের পেছনের পকেটে ক্রেডিট কার্ড না থাকে। কেননা, কন্টাক্টলেস কার্ড রিডার ব্যবহার করে পকেটমারের দল প্রায়ই ক্রেডিট কার্ড থেকে পয়সা হাতিয়ে নেয়’! কেউ বলছেন, ‘মেক্সিকোতে গেলে এটিএম বুথ থেকে সাবধান থাকবেন। মেক্সিকোর চোরেরা পর্যটকদের পকেট খালি করার জন্য রাস্তার মোড়ে মোড়ে বসিয়ে রেখেছে নকল এটিএম বুথ। এসব বুথে ক্রেডিট কার্ড ঢোকানো মাত্রই কার্ড আটকে যাবে। টাকা ওঠানো তো দূরে থাক, কার্ড উদ্ধার করাই অসম্ভব হয়ে পড়বে এসব নকল বুথ থেকে’। কেউ বলছেন, ‘স্পেনের মাদ্রিদ শহরে গেলে নকল পুলিশ থেকে সাবধান থাকবেন। স্পেনের মাদ্রিদ শহরে একদল নকল পুলিশ ঘুরে বেড়ায়, যাদের কাজ হচ্ছে পর্যটকদের মানিব্যাগে নকল ইউরো আছে কিনা তা চেক করার নামে টাকাপয়সা পকেটে পুরে ফেলা’। কেউ বলছেন, ‘ব্রাজিল গেলে অচেনা নারীর সঙ্গে কোথাও যাবেন না। ব্রাজিলের রাস্তাঘাটে প্রায়ই কিছু সুন্দরী নারীর দেখা পাবেন, যারা আপনাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ফ্রি টিকেট দিয়ে শো দেখার আমন্ত্রণ জানাবে। এদের আমন্ত্রণে সাড়া দিলেই মুশকিল, কেননা ‘ফ্রি’ শো দেখা শেষ করে ক্লাব থেকে বের হওয়ার সময় আপনার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হবে মোটা অংকের এক বিল’। কেউ বলছেন, ‘গ্রিসে গেলে কফি কাপের ফাঁদে পড়বেন না। গ্রিসের রাস্তায় হাঁটার সময় হঠাৎ করেই এক লোক এসে আপনার গায়ে ধাক্কা লেগে কফির কাপ উলটে দিতে পারে। ভয় নেই, দেখবেন, আশেপাশের কেউ না কেউ এগিয়ে এসেছে আপনাকে সাহায্য করতে। পথচারীদের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে হোটেলে ফিরে দেখবেন, প্যান্টের পকেট থেকে আপনার ওয়ালেটটাই গায়েব! আসলে কফি ফেলে দেয়া ব্যক্তি আর সাহায্য করা ব্যক্তি দলবেঁধে বোকাসোকা বিদেশিদের পকেট মারার এই কাজটা করে থাকে’। কেউ বলছেন, ‘নেদারল্যান্ডসে গেলে অনলাইনে ঘর ভাড়া নিবেন না। ডাচ হোটেলগুলো বা এয়ার বিএনবির ঘরগুলোর ভাড়া আকাশচুম্বী হওয়ায় প্রতারকেরা অনলাইনে সস্তায় ঘর ভাড়ার বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। পর্যটকেরা অনলাইনে এডভান্স পেমেন্ট করে ঘর বুক করে নেদারল্যান্ডে এসে আবিষ্কার করেন, তাদের ভাড়া করা বাড়ির ঠিকানায় খা খা করছে শূণ্য বাতাস, বড়জোর একটা পানিভরা লেক’! সবশেষে একজন কক্সবাজারে ঢেউয়ের তোপে ১২০ টাকায় কেনা বেল্টবিহীন থ্রি কোয়াটারের হুক ছিড়ে যাওয়ার কথা বলেছেন আর সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবার সমুদ্র যাত্রায় সার্ফার স্টাইলের সাঁতারের স্যুট কেনার পরামর্শ দিয়েছেন। মৃধা ভাই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দূরপাল্লার দু‘টি বাস ঠিক করে আসন বন্টনের সুবিধার্থে বাস দু‘টিকে বাস নং: ১ ও বাস নং: ২ নাম দিয়ে সবাইকে মেসেজ দিয়ে যার যার বাস নাম্বার জানিয়ে দিয়েছেন এবং সকাল ঠিক ৯:৩০ টায় ইস্ট লন্ডন মসজিদের সামনে থেকে বাস ছেড়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ক্লাব নেতৃবৃন্দ নির্ধারিত দিনে সকাল ঠিক ৯:০০ টায় সবাইকে ইস্ট লন্ডনের মসজিদের সামনে উপস্থিত থাকার অনুরোধ করেছেন। বলেছেন, এবার কিন্তু ইংলিশ টাইমেই কোচ ছাড়বে। দেরীতে পৌছলে নির্ঘাত কোচ মিস হবে। ভ্রমণকারীরা স্পিডো অবসর, কুইসিলভার শর্টস, হাভিটন ও কিচো কিনে সমুদ্র ভ্রমণের জন্য আগেভাগেই সবাই প্রস্তুত হয়ে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় থাকলেন।

যাত্রা হলো শুরু

অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। এলো সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। ১৪ আগস্ট রবিবার সকাল ৮:৩০ থেকেই ভ্রমণকারীরা দলে দলে ইস্ট লন্ডন মসজিদের সামনে জড়ো হতে লাগলেন। ইতোমধ্যে বাস লাইনে এসে দাঁড়ালে অনেকেই বাসের লাগেজ কম্পার্টমেন্টে ব্যাগ রেখে নিজেদের মাঝে গল্পগল্প গুজবে মেতে উঠলেন। এক ভাবী বাসায় ফোন করে ভাইকে নির্দেশ দিলেন, ‘আমি নেই বলে বেশি খুশি হয়ে অত্যধিক সাজগোজ করার দরকার নেই, কারণ মিসেস এক্স , মিসেস ওয়াই, মিসেস জেড, সবাই আমাদের সাথে যাচ্ছেন। চিনি, চা পাতা চাইবার উছিলায় পাশের বাসার ওই মহিলার কাছে যাবার দরকার নাই, আমি সব এনে রেখেছি। বেশি ওভার স্মার্ট হবার চেষ্টা করবে না, আমি যেকোনো সময় বাসায় ফিরতে পারি!’ এক ভাই নতুন গাড়ি কিনেছেন কিন্তু কীভাবে সবাইকে জানাবেন ঠিক বুঝতে পারছেন না। বার বার শুধু বলছেন, ‘সব সময় এক পা এক্সিলেটরে আর এক পা ব্রেকের ওপর ফেলে রাখতে রাখতে পা দু‘টো ব্যথা হয়ে গেছে, কী যে করি!’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘মেয়েরা ভালো গাড়ি চালায়, না ছেলেরা?’ তিনি বললেন, ‘অবশ্যই মেয়েরা। কারণ ওরা স্বামীর মতো একটা বাজে জিনিস যখন চালাতে পারে, তাহলে গাড়ির মতো অত্যাধুনিক একটা জিনিস কেন ভালো চালাতে পারবে না!’ বিবিসি’র মোয়াজ্জেম ভাই, ‘আমাদের প্রতিদিন’ এর শাহজাহান ভাই,  ‘সত্যবাণী‘ পত্রিকার আনাস ভাই, ‘এমএএইচ’ টিভি’র টিপু ভাই ও প্রথম আলো’র যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি তবারক ভাই সুইমস্যুট পড়ে রেডি হয়েই এসেছেন। পোশাক খোলার কোন ঝামেলা নাই। একজন সেদিকে ইঙ্গিত করতেই তবারক ভাই মারুজুক রাসেলের কবিতা শোনালেন। বললেন, ‘গরমে এমনিতেই শরম কমে যায়। গরমে শরম করে লাভ নেই।’ গল্পে গল্পে সাড়ে নয়টা বেজে গেলো। ভ্রমণকারীদের অনেকেরই তখনো দেখা নেই। ‘সাপ্তাহিক পত্রিকা’র বিশেষ প্রতিনিধি মতিউর রহমান চৌধুরী ওরফে মতি ভাইকে ফোন দিয়ে মজা করে বললাম, ‘পদ্মা সেতু দেখতে যাবেন না?’ মতি ভাই ততোধিক মজা করে বললেন, ‘ইউনূস সাহেব, মাহফুজ আনাম কি যাবেন? ওনারা না গেলে আমিও যাবো না।’ অর্থাৎ ড. ইউনুস আর মাহফুজ আনাম দেখতে গেলে তিনি যাবেন। ‘সাপ্তাহিক সুরমা’র বার্তা সম্পাদক কবি কাইয়ুম আব্দুল্লাহ ভাইকেও মজা করে একই কথা বললাম। তিনিও ততোধিক মজা করে বললেন, ‘আমার লাইফ জ্যাকেট নেই, সাঁতারও জানিনা, ওনি যদি আবার সেতু থেকে টুস করে ফেলে দেন!’ এর মাঝে স্পেকট্রাম বাংলা রেডিও’র ম্যানেজিং ডিরেক্টর মিছবাহ জামাল ভাই এসে বাসে ওঠে ভ্রমণযাত্রীদের সাথে ছবি তুলে চলে গেলেন। কোথায় গেলেন, কেউ জানেন না। একজন বললেন, ‘মিছবাহ ভাই যদি এখন অন্য কোথাও যান, ভাবী ভাববেন ভাই আমাদের সাথেই আছেন। খুব ভালো টেকনিক।’ আরেকজন বললেন, ‘মিছবাহ ভাই ডুবে ডুবে জলের বদলে সরবত খেতে ভালোবাসেন।’ তিনি এমনভাবে বললেন, শুনে সবাই হাসলেন। দুই বাসের যাত্রীরা প্রায় সবাই চলে এসেছেন। দায়িত্বপালনের সুবিধার্থে ক্লাব সভাপতি এমদাদুল হক চৌধুরী ও সেক্রেটারি তাইসির মাহমুদের নেতৃত্বে নির্বাহী কমিটির সদস্যরা দুই ভাগ হয়ে দুই বাসে ওঠে পড়েছেন। আমাকে ২ নং বাসে দেখে ২ নং বাসের যাত্রীরা যেমন অনেকেই খুশি হলেন তেমনি ১ নং বাসের যাত্রীদের অনেকেই হতাশ হলেন। শুধু ২ নং বাসের যাত্রীদের নিয়ে লিইখেন না, ১ নং বাসের যাত্রীদের নিয়েও লিইখেন, বাসে ওঠার আগে কয়েকজন বলে গেলেন। আমার সিটের আশেপাশে যারা ছিলেন, তাদের সাথে ভাতিজাকে পরিচয় করিয়ে দিলাম। চিকন এক ভাই প্রশ্ন করলেন, ‘আপনারা চাচা-ভাতিজা  কীভাবে এত মোটা হলেন?’ আমি বললাম, ‘প্রথমে কামরূপ কামাক্ষ্যায় গিয়ে আমরা যজ্ঞ করে তন্ত্রমন্ত্র করে মোটা হইছি। তারপরে এটা ধরে রাখতে বাসায় ফ্রিজ না কিনে সব খাবার পেটে রাখতে শুরু করছি। আমরা আসলে সাধারণ মানুষ না, সুপারহিরো- ফ্যাটম্যান!’ তিনি হাসতে লাগলেন। ঘড়ির কাটা সকাল সাড়ে দশটা পেরিয়ে গেলো। তখনও দু‘একজনের দেখা নেই। কিছু মানুষের জন্মই হয় শেষ মুহূর্তে দৌড়ানোর জন্য। এদের রেডি হতে দুই ঘন্টা লাগবে। সকালে উঠে শ্যাম্পু করবে, তার উপর কন্ডিশনার দিয়ে আবার জেল লাগাবে। তারপর আবার আধাঘণ্টা চিরুনি নিয়ে যুদ্ধ করবে। কী পরবে সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে চার-পাঁচবার জামা বদল করবে। সবশেষে যখন ‘অলমোস্ট রেডি’ বলে হাঁক দিবে তখন বুঝা যাবে আরও এক ঘন্টা মিনিমাম। যাই হোক, গ্রীষ্মের সূর্য ধীরে ধীরে তার উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে। তীব্র দাবদাহের চিন্তা করে শেষমেশ ড্রাইভার বাসে ওঠে বসলেন। যাত্রীরা বাস ছাড়ার তাগাদা দিলেন। ক্লাবের এসিস্ট্যান্ট ট্রেজারার ‘ইউকে বিডি নিউজ’ এর আবদুল কাইয়ুম ভাই মাইকে ভ্রমণের দোয়া পড়লেন। সকাল ১০:৪৩ মিনিটে ইস্ট লন্ডন মসজিদের সামনে থেকে প্রায় শতাধিক যাত্রী নিয়ে দু’টি বাস ছুটে চললো গন্তব্যের দিকে। লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের ‘সামার ট্রিপ-২০২২’ এর যাত্রা শুরু হলো।

বাস চলতে শুরু করার আগে মিছবাহ ভাই বাসে ওঠে ভ্রমণযাত্রীদের সাথে ছবি তুলছেন।

যাত্রাপথে

যাত্রাপথের ক্লান্তি দুর করতে গান, কবিতা, কৌতুক, হালকা খাবার, পানি ও ফলের জুসের ব্যবস্থা ছিলো। দুই বাসে দু‘জন করে হিউমারাস বিচারকও নির্ধারণ করা ছিলো। এর সাথে নতুন করে রাস্তার দু‘পাশের নয়ন জুড়ানো সব প্রাকৃতিক দৃশ্য যুক্ত হলো। যাত্রাপথের বিনোদনে একটা বাড়তি মাত্রা যোগ করলো। দু‘পাশের সবুজ মাঠ ঘাট বন পেরিয়ে আমরা চলছি তো চলছি। চলতে চলতে দুই বাসেই সমান তালে গান, কবিতা ও কৌতুকের আসর জমে ওঠলো। কেউ গান করছেন, কেউ কবিতা আবৃত্তি করছেন, আবার কেউ কৌতুক শোনাচ্ছেন। কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান। দর্শক শ্রোতারা ভিডিও করে এক বাস থেকে আরেক বাসে হোয়াটসঅ্যাপ এ ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ১ নং বাসে মৃধা ভাই ও ২ নং বাসে সালেহ ভাই অন্যদের সহায়তায় প্রায় একই সময়ে ভ্রমণযাত্রীদের ‘Pain au chocolat’ নামে এক ধরনের পেস্ট্রি ও সেইসাথে আপেল জুস পরিবেশন করলেন। ‘আইঅন’ টিভি’র চিফ রিপোর্টার মুরাদ ভাই ও প্রেস ক্লাবের আইটি সেক্রেটারি ‘2AA’ নিউজের পরিচালক হান্নান ভাই বিন ব্যাগ সরবরাহ করলেন। ক্লাবের নির্বাহী সদস্য আনোয়ার শাহজাহান ভাই খাবেন না, খাবেন না করেও খেলেন। বললেন, ‘খাবার জিনিস খেতে না পারলে এমনিতেই খারাপ লাগে। তার ওপর খাবার যদি ফ্রি হয় তাহলে আরও বেশি খারাপ লাগে’। এই বলে তিনি নিজে আচ্ছামতো খেলেন এবং আমার ব্লাড সুগার লেভেল হাই জেনেও এসব নিষিদ্ধ জিনিস খেতে তিনি আমাকে অনুপ্রাণিত করলেন। চিনিযুক্ত খাবার খাওয়ার পরে ডায়াবেটিস রোগীর যা হয়, আমারও তাই হলো। পররাষ্ট্র মন্ত্রী আবদুল মোমেনের যখন তখন ‘জিহবার পদস্খলন’,  ডায়রিয়া রোগীর যখন তখন মলত্যাগ আর ডায়াবেটিস রোগীর যখন তখন মূত্রত্যাগ, এগুলো খুবই ন্যাচারাল ব্যাপার! কিছু করার নাই। বাংলাদেশ হলে কোন চিন্তা ছিলো না। ‘বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলি’র শহরে মিনিট দশেক হাঁটলেই শ’খানেক স্থানে প্রকাশ্য মুত্রত্যাগের নমুনা দেখা যেতো। এবং ‘এসব হতেই পারে’ অজুহাতে এ বিষয়ে কেউ তেমন গা করতো না। কিন্তু এদেশে প্রকাশ্যে চুম্বনে পরিবেশ কিংবা জনসাধারণের মনে কতটুকু ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য না থাকলেও প্রকাশ্যে মূত্রত্যাগ যে অশ্লীল এবং অস্বাস্থ্যকর একটি বিষয়, এ নিয়ে কেউ দ্বিমত প্রকাশ করবে না। যাই হোক, প্রশ্রাবের চাপে এ মুহুর্তে আমার আর কিছুই ভালো লাগছে না। ক্লাব সদস্যদের জলবিয়োগের সুবিধার্থে ‘হিসু এন্ড টিস্যু সেক্রেটারি’ নামে একটা পদ থাকলে মন্দ হতো না। ‘টিভি১৯’ এর পরিচালক শেখ মুহিতুর রহমান বাবলু ভাই সিট ছেড়ে ওঠে পায়চারি করছেন। আমার কাছে মনে হচ্ছে তিনি প্রশ্রাব করার জায়গা খুঁজছেন। ‘সাপ্তাহিক লন্ডন বাংলা’র আকবর হোসেন ভাই বাবলু ভাইকে পায়চারি করতে দেখে মিটিমিটি হাসছেন। প্রশ্রাবের চাপে আমি চোখে সর্ষে ফুল দেখছি। জুবের আহমেদ ভাই বাসের জানালা খোলার চেষ্টা করছেন, আমার কাছে মনে হচ্ছে তিনি জানালা দিয়ে প্রশ্রাব করার চেষ্টা করছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেছেন, অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষ বেহেশতে আছেন। এই মুহুর্তে মনে হচ্ছে, প্রশ্রাব করার কথা চিন্তা করে বলে থাকলে তিনি ঠিকই বলেছেন। বাংলাদেশের মানুষ যেখানে সেখানে নিরাপদে প্রশ্রাব করতে পারছেন। এমনকি এই মুহুর্তে যারা বাসায় আছেন, অফিসে আছেন তারাও মনে হচ্ছে বেহেশতে আছেন। ইচ্ছেমত প্রশ্রাব করতে পারছেন। উপায়ান্তর না দেখে শেষে ক্লাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তারেক ভাইকে বললাম। তারেক ভাই ড্রাইভারের সাথে কথা বললেন। কিন্তু ড্রাইভার ভদ্রলোকের এককথা। তিনি রাস্তায় বাস থামাবেন না। বলছেন, আর মাত্র ৪০ মিনিট লাগবে তিনি গন্তব্যে পৌছে যাবেন। এই ৪০ মিনিটকে আমার কাছে মনে হচ্ছে ৪০ বছর। আমার অবস্থা বুঝে তারেক ভাই মাইক্রোফোন হাতে তুলে নিলেন। তারেক ভাই এমনিতেই হাসি খুশি মানুষ, তার ওপর তিনি এমন কিছু কান্ড করলেন আর বাস্তব জীবনের এমন কিছু জোকস বললেন তা দেখে ও শোনে আমি প্রশ্রাবের কথা ভুলে গেলাম। যাদু করে বাসকে ট্রেন বানিয়ে তিনি আমাকে সব ভুলিয়ে দিলেন। এভাবে ভ্রমণযাত্রীদের গান, কবিতা ও কৌতুক শুনতে শুনতে আমরা গন্তব্যের প্রায় কাছাকাছি পৌছে গেলাম। দুর থেকে গাঙ চিলের আওয়াজ পাচ্ছিলাম। সমুদ্রের লোনা বাতাসের স্পর্শ পাচ্ছিলাম। আস্তে আস্তে ক্ল্যাকটন বিচের আকর্ষণীয় প্রধান ঘাট দেখতে পাচ্ছিলাম। এটিকে ঘিরে মনোমুগ্ধকর বিনোদন কেন্দ্রগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম। দেওয়ালে লাগানো জাহাজের ফিগারহেড দেখতে পাচ্ছিলাম। আরও এগিয়ে যেতে যেতে পিয়ারের প্রবেশপথ দেখতে পাচ্ছিলাম, ভিতরে স্লট বাজার আওয়াজ পাচ্ছিলাম। প্যাভিলিয়নে রাইডিং দেখতে পাচ্ছিলাম। বাসে বসেই সামনের বাগানজুড়ে ফুটে থাকা বাহারি ফুলের সুবাস পাচ্ছিলাম। রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন থাকায় সমুদ্র সৈকতে অতিরিক্ত পর্যটক দেখতে পাচ্ছিলাম। করোনার হিংস্র থাবায় দীর্ঘদিন ধরে জনসমাগম বন্ধ থাকার পর আবারও প্রাণ ফিরেছে সমুদ্র সৈকতে। হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পদচারণায় এখন মুখরিত সমুদ্র সৈকত। সমুদ্রের স্বচ্ছ নীল পানির সাথে মেতে উঠেছেন তাঁরা। সমুদ্রের ঢেউয়ের আচড়ে নিজেদেরকে বিলিয়ে দিচ্ছেন সমুদ্রের বুকে। এ যেন সমুদ্রের সঙ্গে মিতালী। আমাদের বহনবারী বাস পার্কিংয়ের খোজে আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ক্ল্যাকটন সৈকতের পশ্চিম প্রান্তে ‘মার্টেলো টাওয়ার’ এর পাশের বাসস্টপে গিয়ে থামলো। লন্ডন থেকে এ পর্যন্ত পৌছতে আমাদের প্রায় দুই ঘন্টা সময় লাগলো। বাস থামতেই সালেহ ভাই আমাকে দ্রুত দরজা খুলে দিয়ে বললেন, ‘যান হালকা হয়ে নেন’। সালেহ ভাইয়ের কথায় আমার আবার প্রশ্রাবের কথা মনে পড়ে গেলো। আমাদের আনন্দময় যাত্রা পথের আপাতত সমাপ্তি হলো।

যাত্রাপথে গান, কবিতা ও কৌতুক পরিবেশন করছেন (বাম থেকে) আকবর হোসেন, আহাদ চৌধুরী বাবু, আনোয়ার শাহজাহান, তাইসির মাহমুদ, সৈয়দ আনাস পাশা, মাহবুব খানশূর, রুমি হক, খিজির হায়াত কাওছার, রেবেকা সুলতানা, আবদুল হামিদ টিপু, আলাউর শাহিন, জুবের আহমেদ, আহমেদ শামীম, তবারুকুল ইসলাম ও আবদুর রহিম  রন্জু।

উত্তাল ঢেউয়ের তালে তালে মধ্যাহ্ন ভোজন

সাগরের বিশালতা আর স্নিগ্ধ বাতাসে সবার ভ্রমণজনিত ক্লান্তি আগেই দূর হয়ে গেছে। দুপুরে খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। বাস থেকে নামার সাথে সাথে সামার ট্রিপের স্মৃতি ধরে রাখতে প্রথমে দুই বাসের যাত্রীদের একত্র করে গ্রুপ ছবি তোলা হলো। এরপর যে যার মত করে আরও কিছু ছবি তুললেন। ভাতিজাকে কাছে পেয়ে ক্লাবের ১ নং নির্বাহী সদস্য ‘দ্যা এডিটর২৪’ এর সম্পাদক বাবু ভাই বললেন, ‘তোমার চাচার সাথে প্রথমে আমার মিত্রতা ছিলো না। তারপর যখন দেখলাম উনি যা বলেন, মুখের ওপরে বলেন, সরাসরি বলেন। কারও পেছনে কোন কথা বলেন না। পেছন থেকে কাউকে আঘাত করেন না। আড়ালে কারও বদনাম করেন না, তখন বুঝলাম, ইনিই আসল মানুষ। এরপর থেকে আমরা ভালো বন্ধু।’ একথা বলে বাবু ভাই মধ্যাহ্ন ভোজের আয়োজন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ‘সাপ্তাহিক নতুন দিন’ এর পলি আপা বাস মিস করে ট্রেনে এসে সবার সাথে যোগ দিলেন। ডট প্রিন্টের এমদাদ ভাই বউ বাচ্চা নিয়ে গাড়িতে এসে জয়েন করলেন। দুপুর ১২:৪০ মিনিটে সমুদ্রের পাড়ে মুক্ত বাতাসে সবাইকে সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করা হলো। নির্বাহী কমিটির সদস্যগণ অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সবাইকে খাবার পরিবেশন করলেন। সবার শেষে নিজেরা নিলেন। উত্তাল ঢেউয়ের তালে তালে কেউ দাঁড়িয়ে, কেউবা বসে মধ্যাহ্ন ভোজন করলেন। খেতে খেতে সবার পলকহীন চোখে ছিল সমুদ্রের বিশালতা, বিস্ময় আর মুগ্ধতা। যত দূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। এ যেনো এক আরেক পৃথিবী। দেশি-বিদেশি নানা পর্যটকে এর পরিবেশও যেনো নানা রঙে রঙিন। প্রকৃতি আর মানুষের এমন মেলবন্ধন! সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য!

সামার ট্রিপের স্মৃতি ধরে রাখতে বাস থেকে নেমে ভ্রমণযাত্রীদের গ্রুপ ছবি।

ভোজন শেষে সমুদ্রস্নান

ভাটির দেশের মানুষ, পানি দেখলেই মন উতলা হয়ে ওঠে। এর ওপর আবার সাগরের শান্ত ঢেউয়ের গর্জনে বিমোহিত হৃদয়। সাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে মিতালী করতে যেনো আর কারও তর সয়না। সমুদ্রের সফেন ঊর্মিমালার নান্দনিক ছন্দে নেচে ওঠেছে প্রতিটি হৃদয়। সমুদ্রের পানিতে নিজেদেরকে ভেজাতে পারলেই যেন পরম শান্তি। ভোজন শেষে তাই দলবেধে সবাই সমুদ্রস্নানে নেমে গেলেন। রৌদ্রতপ্ত দুপুরে সবাই আনন্দস্নানে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। দৌড়-ঝাঁপে গা ভিজিয়ে পানির ঢেউয়ে ভেসে যেতে লাগলেন। বাবা-মার চোখ ফাঁকি দিয়ে ছোটরাও সমুদ্র নেমে গেলেন। একটু পর ছোটদের সাথে সবাই সরল খুঁনসুটিতে মেতে ওঠলেন। পানিতে ফুটবল খেললেন। তবারক ভাই আমাকে সাঁতরে সাগর পাড়ি দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। আমি বললাম, ‘আপনি যেখানে দাড়িয়ে আছেন, সেখান থেকে সোজা সাতরে পার হলে নেদারল্যান্ড। আপনার বাদিকে আমি যেখানে দাড়িয়ে আছি এখান থেকে সাতরে পার হলে জার্মানী, ডেনমার্ক, সুইডেন ও নরওয়ে। আর ডানদিকে সাতরে পার হলে প্রথমে বেলজিয়াম ও পরে ফ্রান্স। আমি জার্মানী যেতে চাইনা। জার্মানকে আমি কখনই আপন ভাবতে পারিনি। ৯০ এর বিশ্বকাপ বেদনায় আমি আর ম্যারাডোনা সমানভাবে কেঁদেছি। ২০১৪ বিশ্বকাপে তারা ডুবিয়েছে মেসিকে, আমাকে।’ তবারক ভাই শুনতে পেলেন কিনা সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জনে বোঝা গেলোনা। আমি ‘স্বদেশ বিদেশ’ পত্রিকার সম্পাদক বাতিরুল হক সরদার ভাইকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘সমুদ্রের লবনাক্ত পানি খেয়েছেন?’ বাতি ভাই জানালেন, ‘খেয়েছেন, খুবই লবনাক্ত। এজন্য আজ রাতে বাসায় ফিরে তিনি লবণ ছাড়া ভাত খাবেন।’ সারওয়ার-ই আলম ভাইকে কয়েকবার চেষ্টা করেও পানিতে না নামাতে পেরে একজন আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘সারওয়ার ভাইয়ের মত আপনিও কি আগে সমুদ্রের পানিতে নামতে ভয় পেতেন?’ আমি বললাম, ‘সারওয়ার ভাই ভয় পান কিনা জানিনা। তবে আমি ভয় পাইনা। আগেও ভয় পেতাম না। সমুদ্রের প্রতি অগাধ প্রেম আর টান আমার ছোট বেলা থেকেই। সূর্য আমাদের বাবা হলে, সমুদ্র আমাদের মা। আমি হলাম লিও টলস্টয়ের ‘দ্যা ওল্ড ম্যান এন্ড দ্যা সি’র সান্তিয়াগো। আমি এখনও চোখ বুজলে দেখতে দেখতে পাই সান্তিয়াগো তাঁর ছোট্ট ডিঙি নিয়ে কিউবার সমুদ্রে মাছ ধরছে। আকাশের মেঘের রং বদলে যাচ্ছে সান্তিয়াগো তবু নিশ্চিত আগামী তিনদিন বৃষ্টি হবে না। পানির রং সূর্যাস্তের সাথে সাথে পার্পল হয়ে যাচ্ছে। সকালে যখন আকাশের দিকে তাকানো যায় না, পানির দিকে তাকানো যায় না তখন ডলফিনের ঝাঁক, উড়ুক্কু মাছের ঝাঁক দলবেঁধে স্রোতের দিকে চলতে থাকবে। ডিঙি চলতে থাকলে দূরে পারের ঝাপসা পাহাড়ের রেখাও একসময় মিলিয়ে যাবে। তবু সান্তিয়াগোর কোনো ভয় নেই। যারা সমুদ্রে আসে তারা কখনও ভয় পায় না। সান্তিয়াগো চেনে আকাশ, মেঘ, সমুদ্র, মাছ তাই তাঁর ভয় নেই। কম্পাস নেই তো কী হয়েছে, দৃষ্টি কমে এসেছে তো কী হয়েছে- এ সমুদ্র তাঁর হাতের তালুর মত চেনা। এতে কেউ পথ হারায় না।’ ক্লাব সভাপতি এমাদ ভাইকে দেখলাম তন্ময় হয়ে বসে আছেন। বোঝাই যাচ্ছে, ‘ক্ল্যাকটন-অন-সি’র অনেক খুঁটিনাটি এমাদ ভাইকে আকৃষ্ট করছে। কোনো একটি বিশেষ দৃশ্যে যখন তাঁর চোখ আটকাচ্ছে তিনি হয়তো মনে মনে রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা আবৃত্তি করছেন— Heaven gives Her glimses only to those / Not in a position to look too close. সমুদ্রের পানিতে আরও কিছুক্ষণ থাকার খুবই ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু মৃধা ভাই এসে বললেন, ‘বেলা সাড়ে তিনটা বেজে গেছে। বেলা সাড়ে তিনটায় সব বয়সীদের জন্য নানা রকম প্রতিযোগিতা পূর্ব নির্ধারিত ছিল। অতএব মন না চাইলেও সমুদ্রস্নান শেষ করে সবাইকে ওঠতে হলো।

ভোজন শেষে সমুদ্রস্নান। সমুদ্রের সফেন ঊর্মিমালার নান্দনিক ছন্দে নেচে ওঠেছে প্রতিটি হৃদয়।

সৈকতে খেলাধুলা

সমুদ্রস্নান শেষে ইভেন্ট সেক্রেটারি মৃধা ভাইয়ের বাঁশির হুইসেলে সবাই ‘মার্টেলো টাওয়ার’ এর উল্টো দিকের সৈকতে জড়ো হলেন। মৃধা ভাই নির্বাহী কমিটির সদস্যদের সহায়তায় পরিবারের ছোটদের জন্য চকলেট দৌড়, টেনিস বল বাস্কেটে ফেলার প্রতিযোগিতা, মার্বেল খেলা ও মেয়েদের হাঁড়ি ভাঙা খেলা, মুখে চামচ নিয়ে তার উপর মার্বেল দিয়ে মার্বেল দৌড় প্রতিযোগিতা এবং ছেলেদের মিউজিক্যাল বল খেলা,  সভাপতি দল ও সেক্রেটারি দলের মধ্যে রশি টানাটানি খেলাসহ নানা খেলাধুলার আয়োজন করলেন। বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সবাই অংশগ্রহণ করলেন। মেয়েরা প্রথমে হাড়ি ভাঙ্গার পরিবর্তে লাঠিই ভেঙ্গে ফেললেন। পরে নতুন লাঠি দিয়ে মাত্র দু‘জন হাড়ি ভাঙ্গতে পারলেন। সভাপতি দল ও সেক্রেটারি দলের মধ্যে রশি টানাটানি প্রতিযোগিতার এক পর্যায়ে রশিই ছিঁড়ে ফেললেন। সৈকতে খেলাধুলার এ আয়োজন ছোট বড় সবাই মন ভরে উপভোগ করলেন। বিজয়ীদের সবাইকে ক্লাবের পক্ষ থেকে পুরস্কৃত করা হলো। ‘ব্রিটবাংলা২৪’ এর রেবেকা আপা, বিলেত টিভি’র শাহিন ভাই, দেশ পত্রিকা’র রিজভী ভাই এবং ক্লাব সভাপতি ও সেক্রেটারিসহ আরও অনেকেই বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিলেন। পুরস্কার প্রাপ্তরা পুরস্কার পেয়ে যেমন খুব খুশি হলেন, তেমনি পুরস্কার না পেয়ে তারেক ভাই ও মুরাদ ভাইয়ের মত কেউ কেউ খুব হতাশ হলেন। তারেক ভাই ফাঁস নিতে চাইলেন। মুরাদ ভাই বিচারকদেরই জ্যান্ত পুতে ফেলার হুমকি দিলেন। আনাস পাশা ভাই সেধে সেধে সবাইকে এটা সেটা খাওয়ালেন। খেলা শেষে ক্লাব নেতৃবৃন্দ সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখলেন। স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণের জন্য সবাইকে তাঁরা ধন্যবাদ জানালেন।

মেয়েদের হাঁড়ি ভাঙা খেলায় হাড়ি ভাঙার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছেন পলি রহমান।
পুরস্কার না পেয়ে তারেক ভাই ফাঁসিতে ঝোলার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন, আনোয়ার শাহজাহান ভাই ও মৃধা ভাই তারেক ভাইয়ের ফাঁসির দড়ি পরীক্ষা করছেন।
পুরস্কার না পেয়ে মুরাদ ভাই বিচারকদের একজনকে মাটিতে জ্যান্ত পুতে ফেলার চেষ্টা করছেন।

পুরস্কার বিজয়ীগণ

বাস নং: ১ এ গানে প্রথম পুরস্কার পেয়েছেন রুমি হক, কবিতায় মোস্তফা জামান নিপুণ ও কৌতুকে তাইসির মাহমুদ। বাস নং: ২ এ গানে প্রথম পুরস্কার পেয়েছেন হাসান শোয়াইব খান অনন্ত, কবিতায় শাহনাজ সুলতানা ও কৌতুকে শামসুল তালুকদার।

বিচারকদের কাছ থেকে পুরস্কার নিচ্ছেন (বাম থেকে) হাসান শোয়াইব খান অনন্ত, শাহনাজ সুলতানা ও শামসুল তালুকদার।

মেয়েদের হাঁড়ি ভাঙা খেলায় প্রথম হয়েছেন মিসেস হান্নান, দ্বিতীয় হয়েছেন পলি রহমান। মেয়েদের মার্বেল দৌড়ে প্রথম হয়েছেন রুমি হক, দ্বিতীয় হয়েছেন মিসেস কাওছার ও তৃতীয় হয়েছেন মিসেস হামিদা, সান্তনা পুরস্কার পেয়েছেন শেলি হক।

পুরস্কার বিজয়িনীর হাতে পুরস্কার তুলে দিচ্ছেন লেখক।

সভাপতি দল ও সেক্রেটারি দলের মধ্যে টান টান উত্তেজনাপূর্ণ রশি টানাটানি খেলা ড্র হয়েছে। তীব্র টানাটানির এক পর্যায়ে রশি ছিড়ে গেলে খেলা অমিমাংসিতভাবে শেষ হয়েছে। রেফারি দুই দলকেই বিজয়ী ঘোষণা করেছেন।

পুরস্কার ভাগ করে নিচ্ছেন সভাপতি জনাব এমদাদুল হক চৌধুরী ও সেক্রেটারি জনাব তাইসির মাহমুদ।

ছেলেদের মিউজিক্যাল বল খেলায় প্রথম হয়েছেন আবদুল হামিদ টিপু, দ্বিতীয় হয়েছেন হেফাজুল করিম রাকিব ও তৃতীয় হয়েছেন হাসান শোয়াইব খান অনন্ত। ছোটদের চকলেট দৌড়ে প্রথম হয়েছেন সাহের আলম, দ্বিতীয় হয়েছেন মাহদীয়া খানশূর ও তৃতীয় হয়েছেন জায়াদ। ছোটদের টেনিস বল বাস্কেটে ফেলার প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছেন খাদিজা, দ্বিতীয় হয়েছেন জিবরাইল মাহমুদ ও তৃতীয় হয়েছেন লিবান। ছোটদের মার্বেল খেলায় প্রথম হয়েছেন মোকাদ্দিম, দ্বিতীয় হয়েছেন খাদিজা ও তৃতীয় হয়েছেন সিয়াম।

পুরস্কার বিতরণী শেষে বিজয়ীরা সবাই একসাথে ছবি তুলছেন।

অবশেষে ফেরার পালা

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। এক সময় ঘরে ফেরার সময় এলো। এবার ফেরার পালা। ফেরার কথা বলতেই সবার মন খারাপ। কিন্তু যান্ত্রিক জীবনে কোন উপায় নেই। একটা বড় ঢেউ ভেঙে পড়ার শব্দ সবাই শুনতে পেলাম। সেই শব্দে বিচ্ছেদের কান্না ছিল, আর ছিল আবার ফিরে আসার আমন্ত্রণ। অতএব আবারও আসার প্রত্যায় ব্যক্ত করে ‘ক্ল্যাকটন-অন-সি’ থেকে একরাশ ভালোলাগা ও ভালোবাসা নিয়ে পড়ন্ত বিকেলে বাস স্টপে এসে বাসে ওঠে সবাই যার যার সিটে বসে পড়লেন। যে পথ দিয়ে এসেছিলাম সেই পথ দিয়েই আবার ফিরে যাওয়া। বাস চলতে শুরু করলে আবার শুরু হলো গান, কবিতা, কৌতুক। অনেক আ্যাডভেঞ্চার, আনন্দ ও হৈ হুল্লোড়ের মধ্য দিয়ে বাস চলে এলো আবারও ইস্ট লন্ডন মসজিদের সামনে। বাস থেকে এক এক করে সবাই নামলেন। ক্লাব নেতৃবৃন্দ সবাইকে এবারের মত বিদায় জানালেন। প্রায় তিন বছর পরে হলেও লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব পরিবারের সামার ট্রিপ-২০২২ অবশেষে অত্যন্ত সফল ও অত্যন্ত সুন্দরভাবে সম্পন্ন হলো।

পরিবেশ বান্ধব পরিবার

সমুদ্রে গিয়ে অনেকেই পরিবেশ নষ্ট করেন। খাবারের প্যাকেটগুলো একটু হেঁটে ডাস্টবিনে না ফেলে অপচনশীল আবর্জনা সব সমুদ্রে ফেলেন। ধুমপান করে যেখানে সেখানে সিগারেটের ফিল্টার ফেলেন। কেউ কেউ গাঙচিলকে পাউরুটি, চিপস খাওয়াতে চেষ্টা করেন। এভাবে নিজেদের অজান্তেই তারা গাঙচিলদের বংশবিস্তার বাঁধাগ্রস্থ করেন। আবার আশেপাশে কোনো প্রাণী দেখলে অনেকেই তাদের ভয় দেখান। আগুন জ্বালিয়ে ক্যাম্পিং করে কচ্ছপের ডিম পাড়ার পরিবেশ নষ্ট করেন। লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব পরিবারের সদস্যগণ এসব দোষ মুক্ত ছিলেন। এ ব্যাপারে সবাই খুব সজাগ ছিলেন, সতর্ক ছিলেন। বলা যায়, লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব পরিবার, পরিবেশ বান্ধব পরিবার।

ধন্যবাদ যাদের প্রাপ্য

এ ধরনের সফল, সুন্দর ও পরিপাটি আয়োজন একদিনে হয় না। ক্লাবের নির্বাচিত কমিটি মাসাধিক কাল ধরে এর নেপথ্যে কাজ করেছেন, অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। এজন্য ক্লাব সভাপতি এমাদ ভাই, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তারেক ভাই, সেক্রেটারি তাইসির ভাই, ট্রেজারার সালেহ ভাই, এসিস্ট্যান্ট ট্রেজারার কাইয়ুম ভাই, ইভেন্ট সেক্রেটারি মৃধা ভাই, আইটি সেক্রেটারি হান্নান ভাই, ১ নং নির্বাহী সদস্য বাবু ভাই, নির্বাহী সদস্য আনোয়ার শাহজাহান ভাই ও নির্বাহী সদস্য শাহনাজ সুলতানা আপাসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ভ্রমণযাত্রীরা অনেক অনেক ধন্যবাদ জানালেন। বাস যাত্রা থেকে শুরু করে বাসে খাবার, পানি ও জুস বিতরণ, গান, কবিতা, কৌতুক, মধ্যাহ্ন ভোজন, খেলাধুলা পরিচালনা ও লন্ডনে ফিরে আসা পর্যন্ত কোথাও কোন বিশৃঙ্খলা ছিলনা। সাকিব আল হাসান ও এবাদত হোসেন ট্রিপে থাকলে আয়োজকদের কায়দা করে স্যালুট দিতেন। স্যালুট! ভ্রমণযাত্রীদের পক্ষ থেকে আয়োজকদের স্যালুট।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *