বাংলাদেশ ডেস্ক: সরকারি বিভিন্ন সংস্থা গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের বাড়িতে গিয়ে কিংবা তাদের থানায় নিয়ে সাদা কাগজে জোর করে স্বাক্ষর করানোসহ বিভিন্নভাবে হয়রানিমূলক তৎপরতা চালাচ্ছে; যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
সোমবার মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুলতানা কামাল স্বাক্ষরিত ‘মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রতিবেদন জানুয়ারি ২০২২’–এ মন্তব্য করা হয়।
এতে বলা হয়, দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে।
গত ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে তৈরি করা হয় এ প্রতিবেদন। প্রতিটি ঘটনা স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীদের মাধ্যমে যাচাই করে দেখা হয়েছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সারা দেশে উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন যেকোনো সময়ের তুলনায় এবারের সহিংসতা সব মাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৯২। আহত হয়েছেন ৪ হাজারের বেশি। এ বছরের জানুয়ারিতে পঞ্চম ও ষষ্ঠ ধাপে ইউপি নির্বাচনে ১০৯টি সহিংসতার ঘটনায় আরও ২৯ জন নিহত হয়েছেন এবং ৫ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১ জন প্রতিপক্ষের গুলিতে এবং ৪ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে মারা গেছেন।
এমএসএফ বলেছে, প্রাণনাশের ঘটনা সামাল দিতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা খুব একটা দেখা যায়নি। পাঁচ দফা নির্বাচনে প্রার্থীসহ যেসব মানুষ মারা গেলেন, এর দায় কোনোভাবে নির্বাচন কমিশন এড়াতে পারে না
বিভিন্ন গণমাধ্যমের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি বিভিন্ন সংস্থা গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের বাড়িতে গিয়ে কিংবা তাদের থানায় নিয়ে সাদা কাগজে জোর করে স্বাক্ষর করানোসহ বিভিন্নভাবে হয়রানিমূলক তৎপরতা চালাচ্ছে; যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কর্মসূচিতে পুলিশের মারমুখি আচরণ ও বলপ্রয়োগ কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। এ ঘটনার দায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও এড়াতে পারে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ধর্ষণসহ নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা কিছুটা কমলেও তা ছিল উদ্বেগজনক। পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু, কারা হেফাজতে মৃত্যু, সংখ্যালঘুদের প্রতি সহিংসতা, সীমান্তে হতাহতের মতো ঘটনা বেড়েছে। এ ছাড়া সাংবাদিকেরা পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হুমকি ও হামলার শিকার হয়েছেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব ঘটনা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এমএসএফ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কারা হেফাজতে মৃত্যু
গত এক মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁরা হলেন হিমাংশু রায় ও আসাদ শেখ। হিমাংশুর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, স্ত্রীর মৃত্যুর কারণে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা থানা–পুলিশ স্বামী হিমাংশু রায়কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় বিকেলে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ছাড়া র্যাবের নির্যাতনে গাজীপুরের টঙ্গীর আসাদ শেখ (৪০) মারা গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সময়ে কারা হেফাজতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
মতপ্রকাশের অধিকার সংকুচিত
গত মাসে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় অন্তত ২৭ জন সাংবাদিক অপমান, নিপীড়ন, হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। তাঁদের মধ্যে ১৪ জন সাংবাদিক নির্বাচনকালীন তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সংবাদ প্রকাশ করায় আহত ও প্রাণনাশের হুমকির শিকার হয়েছেন তিনজন, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে বাধাপ্রাপ্ত ও আহত হয়েছেন আটজন। আর হয়রানি ও অপমানের শিকার হয়েছেন দুজন সাংবাদিক।
এ ছাড়া গত ১৯ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর হাতিরঝিলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় সাংবাদিক হাবীবুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনায় সবার মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এমএসএফ বলছে, এই সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় দুজন সাধারণ নাগরিক গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে চারটি মামলা করা হয়েছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যান্য ঘটনা
এমএসএফের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে ৩২৫টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ৬৫টি, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ১২টি, ধর্ষণ ও হত্যা ৩টি, প্রতিবন্ধী শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের ঘটনা ৬টি। ধর্ষণ, হত্যা ও পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা গত মাসগুলোর মতোই অব্যাহত রয়েছে; যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছে সংগঠনটি।
এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে অন্তত সাতটি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এতে সাতজন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। গত মাসে বিএসএফ সীমান্তে তিন বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে। তাদের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন পাঁচজন। চারজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮০ জন নিহত হয়েছেন।

