শিরোনাম
শনি. ফেব্রু ২১, ২০২৬

সীমান্তে মাদকসহ ২ হাজার কোটি টাকার চোরাচালান পণ্য জব্দ

বাংলাদেশ নিউজ ডেস্ক: সীমান্তে চোরাচালান ও মাদক কারবার ঠেকাতে তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। গত ১৯ মাসে বিজিবির অভিযানে ২ হাজার ৬৬ কোটি ১৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা সমমূল্যের চোরাচালান পণ্য সামগ্রী, অস্ত্র-গোলাবারুদ ও মাদকদ্রব্য জব্দ হয়েছে বলে সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীটির সদর দপ্তর থেকে জানা গেছে। এসব অভিযোগে ৯ হাজার ৩৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে বিজিবি। তাদের মধ্যে ১৭২ ভারতীয় ও একজন আফগান নাগরিক।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিজিবি ও বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকেও সীমান্তে চোরাচালান ও মাদক সিন্ডিকেটের অপতৎপরতা রুখতে একমত হয়েছে বাংলাদেশ-ভারতের প্রতিনিধি দল। এতে সীমান্ত-অপরাধ রুখতে বিজিবি আরো কঠোর হচ্ছে বলে জানা গেছে।

বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে জানান, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ৯৯২ কোটি ৭৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকার এবং ২০২১ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ১০৭৩ কোটি ৪৩ লাখ ৫৮ হাজার টাকার চোরাচালান ও মাদকদ্রব্য জব্দ হয়েছে বিজিবির হাতে।

প্রাপ্ত তথ্যানুয়ায়ী, গত বছর যে পরিমান চোরাচালান ও মাদক জব্দ হয়েছে, গত সাত মাসে প্রায় একই পরিমান চোরাচালকৃত পন্য-দ্রব্য এবং মাদক বিজিবি জব্দ করেছে।

গত ১৯ মাসে ধরা পড়েছে ৩ কোটি ২১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৬৩ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ হয়েছে। যার ৯৭৩৬৬৫৪ পিস জব্দ হয়েছে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত এবং ২০২১ সালে ২২৪৪০০০৯ পিস। এছাড়া ২০২১ সালে ক্রিস্টাল মেথ নামের ভয়ংকর মাদক ধরা না পড়লেও চলতি বছরের গত মাস মাসে ধরা পড়েছে ৫৯.২৯৩ কেজি।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধদিপ্তরের তথ্য অনুয়ায়ী, ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে প্রতি পিস ইয়াবা। সে হিসেবে ২০০ টাকা হারে মূল্য ধরে গত ১৯ মাসে বিজিবির হাতে যে ইয়াবা ধরা পড়েছে তার মূল্য দাঁড়ায় ৬০০ কোটি টাকা।

১৯ মাসে স্বর্ণ ধরা পড়েছে মোট ৬৯২.২৯২ কেজি। এর মধ্যে চলতি বছরের ৭ মাসে ৬৪১.৮৫৯ কেজি এবং ২০২১ সালজুড়ে ৫০ কেজি ৪৩৩। একই সময়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ধরা পড়েছে মোট ২০৪টি। এর বেশিরভাগই পিস্তল ও রিভলবার। এর মধ্যে গত সাত মাসে ৮৮ টি এবং ২০২১ সালে ১১৬টি আগ্নেয়াস্ত্র ধরা পড়ে সীমান্তে।

এসময়কালে এসব অভিযোগে ৫৪৬৫ জন চোরাকারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে গত সাত মাসে ১৮৬৬জন এবং ২০২১ সালে ৩৫৯৯ জন। এছাড়া অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমকালে মোট গ্রেপ্তার হয়েছেন ৩৮৭৯ জন। এর মধ্যে ৩৭০৬ জন বাংলাদেশী, ১৭২ জন ভারতীয় এবং একজন আফগান নাগরিক।

বিজিবি সদর দপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) লে. কর্ণেল ফয়জুর রহমান বলেন, ‘সীমান্তে অপরাধ দমনে বিজিবি কঠোর। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘সীমান্ত হোক অপরাধ শূন্য- এ প্রত্যয় নিয়েই চোরাচালানসহ মাদক ও মানব পাচারকারীদের নিশ্চিহ্ন করতে কাজ করে যাচ্ছে বিজিবি।’

বিজিবি সদর দপ্তর থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ২১১ কোটি ৬৭ লাখ ৯৮ হাজার টাকার, ফেব্রুয়ারি মাসে ১১৯ কোটি ৬১ লাখ ৬৪ হাজার টাকার, মার্চ মাসে ১১৮ কোটি ১১ লাখ ২৩ হাজার টাকার, এপ্রিল মাসে ১৪৩ কোটি ১ লক্ষ ২৮ হাজার টাকার, মে মাসে ১৩১ কোটি ৪১ লক্ষ ৭৯ হাজার টাকার, জুন মাসে ১৩১ কোটি ৫৮ লাখ ৮৭ হাজার টাকার এবং জুলাই মাসে ১৩৭ কোটি ৩০ লক্ষ ৮৮ হাজার টাকার চোরাচালান ও মাদকদ্রব্য বিজিরি অভিযানে জব্দ হয়েছে।

সর্বশেষ জুলাই মাসে যা ধরা পড়েছে-

বিজিবি সদর দপ্তর জানিয়েছে, বিজিবি চলতি বছরের জুলাই মাসজুড়ে দেশের সীমান্ত এলাকাসহ অন্যান্য স্থানে অভিযান চালিয়ে সর্বমোট ১৩৭ কোটি ৩০ লক্ষ ৮৮ হাজার টাকা মূল্যের বিভিন্ন প্রকারের চোরাচালান পণ্য সামগ্রী, অস্ত্র ও গোলাবারুদ এবং মাদকদ্রব্য জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে।

জব্দকৃত মাদকের মধ্যে রয়েছে ১১,০০,২৬২ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ১২ কেজি ৪০০ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ আইস, ৩ কেজি ১৪৭ গ্রাম হেরোইন, ৩১,১৭৪ বোতল ফেনসিডিল, ১৪,৬৩৩ বোতল বিদেশী মদ, ৪,৭২১ ক্যান বিয়ার, ৩৪৪ লিটার বাংলা মদ, ২,৫৩৮ কেজি গাঁজা, ৪,১৬,৩০১ প্যাকেট বিড়ি ও সিগারেট, ১৯,২৭২টি নেশাজাতীয় ইনজেকশন, ৬,৭১৪টি ইস্কাফ সিরাপ, ৫৩৬ কেজি তামাক পাতা, ১,০০০ বোতল এমকেডিল ও কফিডিল, ৪,৩০,৪১৪ পিস বিভিন্ন প্রকার ঔষধ, ১৬,৬৯৫টি এ্যানেগ্রা ও সেনেগ্রা ট্যাবলেট এবং ৭৭,৮০০টি অন্যান্য ট্যাবলেট। জব্দকৃত অন্যান্য চোরাচালান দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে ৫৮২.৬৮ গ্রাম স্বর্ণ, ২৬ কেজি রূপা, ১,৭৫,৬৪৬টি কসমেটিক্স সামগ্রী, ৩,৮১৪টি ইমিটেশন গহনা, ১০,০৭৬টি শাড়ী, ১,৩৯৭টি থ্রিপিস-শার্টপিস-চাদর ও কম্বল, ১,০৯২টি তৈরী পোষাক, ১,০২৭ ঘনফুট কাঠ, ১,৮১৬ ঘনফুট পাথর, ৮,৩৫৯ কেজি চা পাতা, ১,৩১,৭০০ কেজি কয়লা, ৪৪১ কেজি কারেন্ট জাল, ১৫টি কষ্টি পাথরের মূর্তি, ৫টি ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান, ৫টি প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস, ৬টি পিকআপ, ৩২টি সিএনজি ও ইজিবাইক এবং ৭০টি মোটরসাইকেল।

উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ৬টি পিস্তল, ৭টি রাইফেল, ১০টি বন্দুক, ১টি গান, ৫টি ম্যাগাজিন, ১টি মর্টাল শেল, ১টি রাইফেলের ব্যারেল, ৩১টি খালি খোসা এবং ২৮ রাউন্ড গুলি।

এই সময়ের মধ্যে ইয়াবাসহ বিভিন্ন প্রকার মাদক পাচার ও অন্যান্য চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে ২৬০ জন চোরাচালানীকে এবং অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের দায়ে ৩৬২ জন বাংলাদেশী নাগরিক ও ২৩ জন ভারতীয় নাগরিককে আটকের পর তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম জানান।

কী ধরা পড়েছে ২০২১ সালে-

বিজিবি সদর দপ্তর জানিয়েছে, বিজিবি ২০২১ সালে (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) দেশের সীমান্ত এলাকাসহ অন্যান্য স্থানে অভিযান চালিয়ে সর্বমোট ১,০৭৩ কোটি ৪৩ লক্ষ ৫৮ হাজার টাকা মূল্যের বিভিন্ন প্রকারের চোরাচালান পণ্য সামগ্রী, অস্ত্র ও গোলাবারুদ এবং মাদকদ্রব্য জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে।

জব্দ মাদকের মধ্যে রয়েছে ২,২৪,৪০,০০৯ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ৩,৩১,৭৮৫ বোতল ফেনসিডিল, ২,১৩,৯৮৯ বোতল বিদেশী মদ, ৩,২৬৮ লিটার বাংলা মদ, ১,৩১,৮৯৯ ক্যান বিয়ার, ১৯,৪৯২ কেজি গাঁজা, ১৩৯ কেজি হেরোইন, ২,২৪,৬৫৭টি নেশা জাতীয় ও উত্তেজক ইনজেকশন, ২,৩৭,৫০৬টি এ্যানেগ্রা ও সেনেগ্রা ট্যাবলেট, ৬৮,০৪৭টি ইস্কাফ সিরাপ, ৭,১৬৯টি এমকেডিল ও কফিডিল এবং ৬০,৯২,১৮৪টি অন্যান্য ট্যাবলেট।

জব্দকৃত অন্যান্য চোরাচালান দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে ৫০ কেজি ৪৩৩ গ্রাম স্বর্ণ, ৩২১ কেজি রূপা, ৫৫,৯৪৭টি শাড়ি, ৩০,২৪৫টি থ্রিপিস/শার্টপিস, ৯,৬২৭টি তৈরী পোষাক, ২,১৫৯ মিটার থান কাপড়, ১২,৯৫,৫৪২টি কসমেটিক্স সামগ্রী, ৩৮,৩৮১ ঘনফুট কাঠ, ৫৩,৭৫৭ কেজি চা পাতা, ১,৬৫,৪০৫ কেজি কয়লা, ১,০৯,২৭১টি ইমিটেশন গহনা, ০৯টি কষ্টি পাথরের মূর্তি, ৮৫টি ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান, ৬০টি প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস, ৮০টি পিকআপ, ৩৬৮টি সিএনজি ও ইজিবাইক এবং ১,১০৩টি মোটরসাইকেল।

একই সময়কালে উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ৪৪টি পিস্তল, ১টি এসএমজি, ৪টি রিভলভার, ৬৭টি সকল প্রকার গান, ২৫০ রাউন্ড গোলাবারুদ, ৩৫টি ম্যাগাজিন, ৩২টি মর্টার শেল, ৪৯টি আর্টিলারি-রকেট শেল, ৫টি বোমা, ১১টি ককটেল এবং গানপাউডারসহ ৯১৯ কেজি বিস্ফোরক।

এছাড়াও সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ২০২১ সালে ইয়াবাসহ বিভিন্ন প্রকার মাদক পাচার ও অন্যান্য চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩,৫৯৯ জন চোরাচালানীকে এবং অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের দায়ে ২,২৪৪ জন বাংলাদেশী নাগরিক ও ৮৬ জন ভারতীয় নাগরিককে আটকের পর তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এরটি আধা-সামরিক বাহিনী। বাংলাদেশের সীমান্ত সুরক্ষা, চোরাচালান প্রতিরোধ, নারী ও শিশু এবং মাদক পাচার প্রতিরোধসহ অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত। বাহিনীটি বিডিআর নামে প্রতিষ্ঠিত হলেও ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি বাহিনীর সদর দপ্তর, পিলখানায় সংঘটিত বর্বরোচিত হত্যাকান্ডে ৫৭ জন সেনাকর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হওয়ার পর ২০১০ সালের ৮ ডিসেম্বর বাহিনীটির নাম ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ’ দিয়ে আইন পাস হয় জাতীয় সংসদে। ২০ ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকর হয়। ২০১১ সালের ২৩ জানুয়ারি বিজিবি’র নতুন পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন এবং মনোগ্রাম উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর এর মধ্য দিয়ে বিডিআর নাম বদলে বিজিবি নাম নিয়ে পথচলা শুরু হয় এ বাহিনীর।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *