সীমান্তের নাম ‘পাখিউড়া’। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়নপুর ইউনিয়নে বাংলাদেশের মানচিত্রের শেষ সীমারেখা। ওপারেই ভারত। চলতি বছরের ৩ সেপ্টেম্বর ‘পাখিউড়া’ সীমান্তে পাখির মতোই গুলি করা হয় ছবিল উদ্দিন নামের এক বাংলাদেশী তরুণকে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বিএসএফ-এর গুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন ছবিল উদ্দিন। এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সীমান্ত আইনের কোনো রকম তোয়াক্কা না করেই প্রতিনিয়ত ইচ্ছামতো গুলি করে বাংলাদেশীদের মারছে বিএসএফ। গত ২ বছরে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী হত্যার ঘটনা ৩ গুণ বেড়েছে। বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর আর কোন সীমান্তে প্রতিবেশী দ্বারা এত মানুষ হত্যার ঘটনার নজির নেই। এমনকি ইসরাইল-ফিলিস্তিন সীমান্তেও এত মানুষ খুন হয় না প্রতিবছরে।
২০১০ সালে ফেলানী নামক এক কিশোরীকে গুলি করে হত্যার পর লাশ সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। এনিয়ে তখন জনগণ ফুঁসে উঠলেও তৎকালীন শেখ হাসিনার নব গঠিত সরকার জনমতের তোয়াক্কা করেনি। এমনকি ফেলানীর পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করতে যাওয়া একটি সংগঠনকে সরকার তাড়িয়ে দেয় কুড়িগ্রাম থেকে। পরবর্তীতে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সে অর্থ ফেলানীর দরিদ্র পিতার হাতে তুলে দেয়া হয়। আমার দেশ পত্রিকাও সেদিন প্রেসক্লাবে অপর একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ফেলানীর পিতাকে সহায়তা প্রদান করে।
ফেলানী থেকে ছবিল উদ্দিনের ঘটনায় বাংলাদেশের মানুষ ক্ষুব্ধ হলেও, বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির প্রধান বা মন্ত্রীরা এসবের বিরুদ্ধে সবসময় ভারতের খুনি বাহিনীকে সমর্থন করেছেন। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো সবসময় ভারতেরই তোষামোদ করে চলেছেন। সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে কখনো তাকে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি।
প্রতিবছর হিন্দুদের ধর্মীয় ‘রাখি উৎসবে’ বিজিবির সদস্যদের হিন্দুরীতি অনুযায়ী রাখি পরিয়ে দেন ভারতের নারীরা। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, রাখিবন্ধনের দিন হিন্দুদের দেবতা গণেশের বোন তার (গণেশের) হাতে একটি রাখি বেঁধে দেন। সেই রীতি মেনেই বিজিবির সদস্যদের হাতে রাখি পরিয়ে সারাবছর সীমান্তে হত্যা চালায় বিএসএফ। আর বিজিবির সদস্যরা এক রাখির বিনিময়েই ভারতীয় আধিপত্য মেনে নেয়।
সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বেড়েই চলেছে:
আওয়ামী সমর্থক মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের পুরো সময়টায় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ’র হাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৪৩ জন বাংলাদেশী। যাদের মধ্যে ৩৭ জন নিহত হন গুলিতে, আর বাকি ৬ জনকে নির্যাতন করে মারা হয়। ২০২০ সালের প্রথম ছয়মাসেই সীমান্তে বিএসএফ ২৫ জন নিরস্ত্র বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে। চলতি বছরে সবচেয়ে বেশি সীমান্ত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলোয়।
গত বছরের প্রথম ছয়মাসের তুলনায় সীমান্তে চলতি বছরে বিএসএসফ বেশি বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাসে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ১৮ জন বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা করেছিল বিএসএফ। অথচ ২০২০ সালে একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ জনে। ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী হত্যা তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
সরকারি হিসাবে সীমান্ত হত্যা বৃদ্ধির একটি চিত্র। এই চিত্রে দেখা যাচ্ছে ২০১৮ সালের চেয়ে ২০১৯ সালের তফাত। চলতি বছরে হত্যাকান্ড বৃদ্ধির হার আরো বেশি । ২০১৮ সালে সীমান্তে প্রাণহানির সংখ্যা ছিল ১৪ জন। ২০২০ সালের প্রথম ৬ মাসেই ২০১৮ সালের পুরো বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বাংলাদেশী হত্যা করেছে বিএসএফ।
এদিকে সরকারি হিসাবেই শেখ হাসিনা সরকারের দশ বছরে সীমান্তে ২৯৪ জন বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে আওয়ামী লীগের পরম বন্ধুরাষ্ট্র ইন্ডিয়া, যার সাথে নাকি বাংলাদেশের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক। ২০১৯ সালের ১১ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে এ তথ্য জানিয়েছিলেন। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৯ সালের জুলাই পর্যন্ত ১০ বছরে ভারতীয় বিএসএফ সীমান্তে ২৯৪ জন বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে। মন্ত্রির দেয়া তথ্য অনুযায়ী ২০০৯ সালে ৬৬ জন, ২০১০ সালে ৫৫ জন, ২০১১ সালে ২৪ জন, ২০১২ সালে ২৪ জন, ২০১৩ সালে ১৮ জন, ২০১৪ সালে ২৪ জন, ২০১৫ সালে ৩৮ জন, ২০১৬ সালে ২৫ জন, ২০১৭ সালে ১৭ জন এবং ২০১৮ সালে ৩ জনের মৃত্যুর হিসাব দেওয়া হয় সংসদে। তবে মানবাধিকার সংগঠন গুলোর হিসাব মতে এই সংখ্যা আরো বেশি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবেই দেখা যায় ২০১৮ সালে ১৪ জন বাংলাদেশীকে বিএসএফ হত্যা করেছে। যদিও সরকারি হিসাবে বলা হয়েছে ৩ জন মাত্র।
সীমান্ত হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিএসএফের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় তা ‘শূন্যে নামিয়ে আনা’র প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও হত্যাকাণ্ড বেড়েই চলেছে।
বিএসএফের খুনের বৈধতা দিলেন বিজিবি প্রধান:
সম্প্রতি রাজধানীর পিলখানায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদর দপ্তরে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ে সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্মেলনে ভারতের পক্ষে নেতৃত্ব দেন ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মহাপরিচালক রাকেশ আস্থানা। বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাফিনুল ইসলাম।
সম্মেলনে বিএসএফ মহাপরিচালক রাকেশ আস্থানা স্পষ্ট করেই বলেন যে, সীমান্তে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছলে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে তাদের। এ পর্যায়ে সীমান্তে বিএসএফের নির্মমতার প্রতিবাদ তো দূরে থাক, বিজিবি প্রধান উল্টো নিহত বাংলাদেশীদের সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলাম বলেন, “সন্ত্রাসীরা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের ভেতরে ঢুকে পড়ছে। সে কারণে হত্যার ঘটনা ঘটছে।” অর্থাৎ বিএসএফের গুলিতে নিহত বাংলাদেশীদের তিনি সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করে বিএসএফের খুনের বৈধতা দেন।
অপরদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবুল মোমেন গত ২১ জুলাই এক বিবৃতিতে সীমান্তে বিএসএফের হত্যাকাণ্ড ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ঘটনাগুলোকে শুধু ‘দুঃখজনক’ বলেই দায় সেরেছেন। তার এমন নরম সুর ভারতের প্রতি আওয়ামী লীগ সরকারের নতজানু পররাষ্ট্র নীতিরই প্রতিচ্ছবি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে একবার বলেছেন, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, অন্যবার বলেছেন, রক্তের সম্পর্ক।
একনায়ক কিমও ক্ষমা চায়, নতজানু হাসিনা:
সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার একজন নাগরিককে হত্যার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন উত্তর কোরিয়ার একনায়ক কিম জং। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জা-ইনের কাছে লেখা চিঠিতে কিম ওই ঘটনার জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছেন। দক্ষিণ কোরীয় সরকার কিমের সেই চিঠি প্রকাশ করেছে। অথচ বিএসএফ যখন নির্বিচারে সীমান্তে মানুষ খুন করে তখন বাংলাদেশের মন্ত্রী থেকে বিজিবি প্রধান নিহত ব্যক্তিকে উল্টো ‘গরুচোর’ বা ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে ভারতীয় বিএসএফের নির্মমতাকেই আইনগত বৈধতা দান করেন।
এ বিষয়ে জাতিসংঘে এশিয়ান লিগ্যাল রিসোর্স সেন্টারের মেইন রিপ্রেজেন্টেটিভ মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার এক নিরস্ত্র সরকারী কর্মকর্তাকে উত্তর কোরিয়ার জলসীমায় গুলি করে হত্যা ও মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনায় স্বয়ং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কঠোর ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। যার প্রেক্ষিতে উত্তর কোরিয়ার বহুল সমালোচিত একনায়ক ব্যক্তিগতভাবে চিঠি লিখে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।
প্রথমতঃ ঘটনাটি একটি বিচারবহির্ভূত হত্যা। দ্বিতীয়তঃ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা নাগরিক খুনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের শীর্ষ পদস্থ রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ খুবই স্বাভাবিক ঘটনা, যেটা আমরা দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের কাছ থেকে দেখেছি। এই প্রতিক্রিয়ার দ্রুততম ফল হলো উত্তর কোরিয়ার স্বৈরাচারী একনায়কের ক্ষমা প্রার্থনা সম্বলিত চিঠি। এই ঘটনায় বিচারের মাধ্যমে অদূর ভবিষ্যতে কাউকে শাস্তিদানের কোনো ঘটনা উত্তর কোরিয়াতে ঘটে কি-না, সেটার জন্য আমাদেরকে চলমান পারস্পরিক টানাপোড়েনের প্রতি আরও কিছুদিন দৃষ্টিপাত করতে হবে।
মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান আরো বলেন, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে ও নির্যাতনে বাংলাদেশী খুনের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ও ভুক্তভোগী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনায় সম্পূর্ণ বিপরীত। বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশী নাগরিক হত্যার জন্য সামগ্রিকভাবে নিজ দেশের মানুষ ওপর উপর্যুপরি দোষ চাপিয়ে ভারতীয় প্রতিপক্ষের তোষামোদি ও তাবেদারি করে চলেছে।
এমনকি বাড়ির পাশে নেপালেও ভারতীয় সীমান্ত রক্ষিবাহিনী মাত্র একজন নেপালীকে গুলি করে হত্যা করলে, নেপালের সর্বস্তরে মানুষ এবং সকল রাজনৈতিক দল বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। ফলে অবস্থা সামাল দিতে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং নেপাল সরকার এবং জনগনের কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের নতজানু সরকার এবং মেরুদন্ডহীন জেনারেলরা ভারতের পদলেহন করে নিহত-নিরস্ত্র বাংলাদেশীদেরকেই সন্ত্রাসী বানিয়ে দেন।
আসলে, যে দেশের সরকার বিনাবিচারে নিজ দেশের হাজার হাজার মানুষকে খুন করে, সেই সরকারের পক্ষে প্রতিবেশী দেশ যে কিনা তাদের ক্ষমতার মূল উৎস, সেই ক্ষমতাধর প্রভুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কিংবা বা বিচারের দাবি উত্থাপন করা কোনদিনই সম্ভব নয়। নেপাল এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মত গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষেই কেবল নিজ দেশের জনগণের স্বার্থরক্ষায় কঠোর অবস্থান নেয়া সম্ভব।

