আমার বিদ্যার দৌড় ক্লাস নাইন পর্যন্ত। একটু বাড়িয়েই বললাম। নাইনে উঠতে না উঠতেই আমার বিয়ে হয়ে গেল। কাজেই নাইনের বিদ্যা লাভ হল কই ! এখানে সকলেই নিজের সম্পর্কে বাড়িয়ে বলে। আমিও সকলের মতোই হব, সে তো স্বাভাবিক কথা।
পড়া শেষ হওয়ার আগে বিয়ে হলে অনেকে কান্নাকাটি করে। তারা লেখাপড়া করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। আমি সেরকম নই। বিয়ে ঠিক হলে খুশি হয়েছিলাম। লেখাপড়ার হাত থেকে রক্ষা পেলাম। পড়াশোনায় আমার মোটেও মন ছিল না। ভাবতাম , নিজের পায়ে দাঁড়ানো আবার কি !বিয়ে হলে স্বামীই তো খাওয়াবে পরাবে। আরেকটা কথাও লজ্জার মাথা খেয়ে বলে ফেলি। চৌদ্দ-পনর বছর বয়সেই আমার শরীর জেগে উঠেছিল। শরীরের ইচ্ছাগুলা বশে রাখতে গিয়ে হিমশিম হচ্ছিল আমার। বিয়ে হল, বাঁচলাম!
কিন্তু বাঁচলাম আর কই। শাশুড়ি আমাকে স্বামীর থেকে পৃথক করে রাখার সর্বপ্রকার চেষ্টা করত। স্বামীটিও বাছুরের মতো মায়ের পিছন পিছন ঘোরে। মাকে যমের মতো ডরায়। তা সত্ত্বেও আমার পেটে বাচ্চা এল। পোয়াতি হয়েছি দেখে শাশুড়ির সে কী রাগ ! পারলে আমাকে ধরে মারে। ছেলেকেও হেনস্তা করতে ছাড়ল না।
মাগি ওদিকে আবার মহিলা সমিতি করে। সমিতির লিডারদের সাথে চিনা-জানা আছে। আমাকে ভয় দেখায়, তেরিবেড়ি করলে আমাকে সিধা করে দেবে। তেড়িবেড়ি মানে খিদার চোটে রান্না করার আগে একটা ডিমসিদ্ধ করে খেয়ে ফেলেছিলাম।
দিন দিন খিদার জ্বালা বাড়ে। পেট ভরে খেতে পাই না। একদিন মহিলা সমিতির এক লিডারকে একা পেয়ে দুঃখের কথা বললাম। মন দিয়ে সব শুনলেন তিনি। বললেন – শাশুড়িকে বুঝিয়ে বলবেন। আর উপদেশ দিলেন, সবার সাথে যেন মানিয়ে চলি।
এই উপদেশের মানে বুঝলাম না। আমি তো কারো সাথে ঝগড়া করি নি। পরে জেনেছিলাম, আমার নামে নানা কথা বানিয়ে বানিয়ে রটিয়েছিল শাশুড়ি। আমি নাকি অসম্ভব ঝগড়াটি। ঘরের কাজকর্মও করি না।
অথচ বিয়ের জল গায়ে শুকাতে না শুকাতেই সংসারের যাবতীয় কর্মে আমাকে জুতে দিয়েছিল শাশুড়ি। রান্না, বাসনমাজা, ঘর লেপাপুঁছা – সব করি। পাড়া প্রতিবেশীরা এসব দেখে। তার পরও আমার বদনাম হয়।
আমার স্বামী এমনিতে লোক খারাপ নয়। তবে অসম্ভব ভীতু-স্বাভাব। সে মিষ্টির কারিগর। মা সারদা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে চাকরি করে। আসাম-আগারতালা রোডের ওপর মাছলি বাজারে দোকান। খুব চলে দোকানটা। কারণ এই দোকানের মিষ্টির খুব নাম আছে। তাই বাস-ট্রাক-জীপ-সরকারি গাড়ি-প্রাইভেট গাড়ি এই দোকানের সামনে থামেই থামে। লোকেরা চা-মিষ্টি খায়। প্যাকেটে করে কিনেও নিয়ে যায়। মিষ্টি বানায় আমার স্বামী দুলাল দাস।
মাঝে-মধ্যে আমার জন্য দুই-চারটা মিষ্টি সে নিয়ে আসে, লুকিয়ে খেতে দেয়। দিয়ে ভয়ে মরে। মা না দেখে ফেলে। ইচ্ছা করে , দেখিয়ে দেখিয়ে খেয়ে বেটির গায়ে জ্বালা ধরাই ! গত এক বছরে মাগি অত্যাচারের নানা ফন্দী বার করেছে। আজকাল শনি-মঙ্গলবারে তাকে কালী ভর করে। উদলা চুল মেলে উঠানে বসে সে মাথা ঝাঁকায় আর আমাকে গালাগালের তুবড়ি ছোটায়। আমি নাকি সাক্ষাৎ ডাইনি।
সবই বুঝি। দুলাল দাস আজকাল আর অতটা মাতৃভক্তি দেখায় না। মুখে কিছু বলে না, কিন্তু মা যখন আমার নামে মন্দ কথা বলে, তখন ঘাড় গুঁজ করে থাকে। আমার প্রতি অনুরক্ত হয়েছে, তাই আমি ডাইনি।
ডাইনিকে সকলে ভয় পেতে শুরু করল। কুয়ার ধারে আমাকে দেখলে বউ-ঝি গুলা পালিয়ে যায়। আমি খুব ভয় পেলাম। দেখলাম, দুলাল দাসও ভয় পেয়েছে। বাধ্য হয়ে এক ফন্দী আঁটলাম। ক্যালেন্ডারে দেখে নিলাম, আগামি অমাবশ্যা কবে। সেদিন দুপুরবেলা স্নানটান করে লাল দেখে একটা শাড়ি পরলাম, কপালে বড় করে সিন্দুরের ফোঁটা দিলাম। তারপর উঠানে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে কথা বলতে শুরু করলাম। অদূরে কুয়ার ধারে বৌ-ঝি গুলা আমাকে লক্ষ করে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছিল। তাদের একজনকে হাতছানি দিয়ে ডেকে বললাম – শঙ্করি, ….. তোর সামনে মহা বিপদ!
শঙ্করী ডুকরে কেঁদে উঠল। বললাম – তোর স্বামীরে ক
, আইজ যেন বাড়িতে থাকে। মোটর সাইকেল নিয়া রাস্তা দিয়া না বাইর হয়!হে তো বাইর হইয়া গেছে !বলে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে শঙ্করী ছুটল বাড়ির দিকে। আর এদিকে আমি বললাম –
আইচ্ছা, তার বিপদটারে এই আমি নাশ করলাম।` বলে উঠানের ওপর জোরে জোরে পা মারলাম।
শঙ্করীর স্বামী বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল চালায় জানতাম। কাজেই আমার সাবধানবাণীতে যা চাইছিলাম, তাই হল। তৎক্ষণাৎ আসন্ন বিপদের খবর গেল তার কাছে – যেন সে খবর পাওয়ামাত্র বাড়ি চলে আসে।
শঙ্করীর স্বামী এসে বলল, তার মোটরসাইকেলে নাকি ট্রাকের ধাক্কা লাগছিল প্রায় ! নির্ঘাত লোকটা বিপদের আগাম খবরে ভয় পেয়েছিল। নার্ভাস হয়ে গাড়ি চালালে এরকম ধাক্কা-টাক্কা লাগেই।
আমার খুব সুবিধা হল। পরের অমাবস্যায় লোকজন আগে থেকে তৈরি হয়ে থাকল, কখন আমার ওপর কালীর ভর হয়। আমিও অভিনয় ভালোই করি। কাউকে বলি, সামনে তোর সুদিন
, কাউকে আগাম বিপদবার্তা দিই। কিছু ফলমূল পাই। পেট ভরে খাই। তৃতীয়বার শাশুড়ি বললেন, সত্যি সত্যি ভর হয়, না ভড়ং ধরি, সেটা পরখ করা দরকার। তিনি বললেন – চোখে মরিচগুঁড়া দেও। যদি জ্বালা করে, তবে বুঝবা, ভড়ং।
বলেই লাল লঙ্কাগুঁড়া তিনি আমার চোখে মুখে ছিটিয়ে দিলেন। আমি দাঁতে দাঁত চেপে সেই অসহ্য জ্বালা সহ্য করেছিলাম। এ না করলে আমার জীবন শেষ হবে জানতাম।
লঙ্কার গুঁড়া দেওয়ার পরও যখন যন্ত্রণার প্রকাশ দেখা গেল না, উঠানভর্তি মানুষ ভক্তিতে গড়াগড়ি গেল। আমি যে জীবন্ত কালী – তাতে আর সন্দেহ রইলো না কারোও। বুঝলাম, এখন আর সকলের মত নই আমি। এটা যে আমার কাল হবে, তখনো বুঝি নি। জীবন্ত কালী হয়ে যা উপায় হয়, তাতে আমি পেট ভরে ভাত-তরকারি খাই। ছয় মাসের মেয়েটার জন্য অপর্যাপ্ত বুকের দুধ হয়।
কিন্তু সমস্যা এল আমার ভিতর থেকে। এই অনবরত মিথ্যাচার আমাকে ক্লান্ত করে ফেলল। আর দুলাল দাসও আমাকে কেমন যেন ভয় পায়। রাতে এক বিছানায় থেকেও দূরে দূরে থাকে। নিজের মানুষটাকেও ঠকাচ্ছি ভেবে কষ্ট হচ্ছিল। তখন একদিন তাকে খুলে বললাম সত্য কথা। আর বললাম – আজকাল আমার নিজেরও যেন বিশ্বাস হতে লেগেছে – আমি কালী। বলে কেঁদে ফেললাম। তখন সে দিশাহারা হয়ে বলল – চল, আমরা এইখান থাইক্যা যাই গা।
–কই যাইবা?
–দূরে কোথাউ। যেখানে আমরারে কেউ চিনে না।
–তোমার মায়ের কী হইব?
শাশুড়ির একমাত্র ছেলে সে। এখন বুড়ির সেই তেজ আর নাই। ঢোঁড়াসাপের মতন ফণাহীন হয়েছে সে। এখন তাকে দেখলে মায়া হয়। এভাবে মাকে একলা ফেলে ভাগন ঠিক নয়।
আমার কথা শুনে দুলাল দাস চুপ করে থাকল। আমিও নিজের তৈরি করা জালে আটকা পড়ে ছটফট করতে থাকলাম। দিনদিন আমার শরীর শুকাতে থাকল। সকলে ভাবল – কালী এইবার আমাকে কাছে টেনে নেবে।
একদিন দুলাল দাস এসে বলল – দোকানে নাকি আগরতলা থেকে বিজ্ঞান-বাবুরা এসেছিলেন। চা-মিষ্টি খেয়ে, এই দিককার খোঁজখবর নিয়ে ধর্মনগরের দিকে গেছেন, সাপে কামড়ালে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত – এই কথা লোকজনকে বোঝাতে।
এই বিজ্ঞানবাবুদের কথা আমি শুনেছি। মেলায় মেলায় ঘুরে তারা আগুন খেয়ে দেখান, ডিম ভেঙ্গে তার ভিতরে নখ-চুল দেখান, আর বলেন – কীভাবে এসব করে ভণ্ড সাধু-সান্ন্যাসীরা মানুষকে ঠকায়। আমার স্বামী তাদের একান্তে বলেছে আমার কথা। তাই তারা ফিরার পথে এখানে আসবে।
এসেছিল তারা। সব দেখেশুনে বলল – আমার সমস্যা আসলে নাকি মানসিক রোগ। এর চিকিৎসা আছে। আগরতলা গিয়ে ডাক্তার দেখাতে।
আমার স্বামী আমাকে নিয়ে গেল আগরতলা জি.বি. হাসপাতালে। সেখানে মেন্টাল আউটডোরে গিয়ে দেখলাম, ডাক্তারের চেম্বারের বাইরে রোগী নিয়ে অপেক্ষা করছে লোকজন। কোনো কোনো রোগী উদ্ভট আচরণ করছে। কেউ বিড়বিড় করে কথা বলছে। কেউ নাচের ভঙ্গিতে হাত ওপরে তুলে রেখেছে। এসব দেখে দুলাল দাস ঘাবড়ে গেল।
ডাক্তারনি আমাকে নানা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় কি না। বললাম – ঘুমালেই স্বপ্ন দেখি, কালী এসে আমাকে ডাকছেন, বলছেন – চল আমার লগে।
ডাক্তারনি বললেন – এসব সেরে যাবে। চিন্তা না করতে। আর বললেন, সর্বদা হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করতে, যে কাজ করতে ভালো লাগে, তা করতে। ডাক্তারনি কী করে জানবেন, ভালো লাগুক আর নাই লাগুক – উঠান।
ঝাড়ু দেয়া, ঘরদোর লেপা, বাসনমাজা আর ভাত-তরকারি রাঁধা ছাড়া অন্য কোনোও কাজ আমার জীবনে নাই।
আগরতলায় গিয়ে ডাক্তার দেখানোর কথা জানাজানি হলে গ্রামে রটে গেল – আমি পাগল হয়েছি। আমার নতুন নাম হল – পাগলি। কুয়ার পাড়ে বৌ-ঝি, বুড়ি-আধবুড়ি – সকলে আমার দিকে কৌতূহল নিয়ে তাকায়। চেষ্টা করেছিলাম, বৌগুলার সাথে ভাব জমাব। তারা আমায় আমল দিল না। বুঝলাম, এখন আর চাইলেও অন্য সকলের মতো হতে পারব না। সব চাইতে দুঃখের কথা – দুলাল দাসও আমায় পাগল ভাবে আজকাল।
আমার রাগ বাড়ল। ঘরের কাজেও মন নাই। ডাক্তারনি বলে দিয়েছেন, যে কাজ ভাল লাগে তা করতে। ভাবলাম, প্রথমে যেসব কাজ ভালো লাগে না, তা আর করব না। পরে খুঁজে নেব ভালো লাগার কাজ। কিন্তু শাশুড়ি কেবল খোঁচায়। বলে – ঘর লেপলে না? উঠান সুরলে না? কখন রানবে……?
অনবরত খোঁচা খেতে খেতে একদিন গলা তুলে ঝগড়া করলাম। ঝগড়া শুনে আশেপাশের লোকজন ঝগড়া দেখতে এল। এসব দৃশ্য এখানকার মানুষ খুব উপভোগ করে। তাদের সকলের সামনে আমি শাশুড়িকে গালাগালের তুবড়ি ছুটিয়েছিলাম। মেয়েটা ভয় পেয়ে কান্না জুড়েছিল। তাকে তুলে আছাড় মারলাম। ব্যাস – আমি যে বদ্ধ উন্মাদ, প্রমাণ হয়ে গেল।
তারপর থেকে দুলাল দাস আর আমাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যায় না। বলে –লাভ নাই।
লাভ যে আছে, আমারও তা মনে হয় না। কিন্তু ডাক্তারদিদির কাছে প্রতি দুই মাসে একবার যাওয়া আমার কাছে এক আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। এটাই আমার কাছে একমাত্র ভালো লাগার কাজ
হয়ে উঠেছে জীবনে। তাই মেয়েকে নিয়ে সকালের ট্রেনে চলে যাই আগরতলা, বিকালের ট্রেনে ফিরে আসি। এই যাতায়াত হয়েছে বাড়তি আকর্ষণ। যাতায়াতের খরচ অবশ্য দেয় দুলাল দাস। সেটা ভয়ে। না দিলেই ধুন্দুমার বাঁধাব জানে। ধুন্দুমার বাঁধানো আমার নতুন অস্ত্র হয়ে উঠল। আর ভিতরে ভিতরে অসম্ভব একা হলাম।
জীবন নিয়ে আকাশ-পাতাল ভাবি। কোথায় গিয়ে ঠেকব শেষমেষ বুঝি না। কলিজার ভিতরে বড় কামড়ায়। মেয়েটার ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তা করি। পাগলির মেয়ে সে। তার তো বিয়ে-শাদিও হবে না। হলেও আমারি মতোন জীবন হবে তারও।
ডাক্তারদিদি আমার সব কথা মন দিয়ে শোনেন। কথার খেই ধরে আরো আরো প্রশ্ন করেন। তারপর বলেন – ….তুমি পাগল নও। বরঞ্চ অন্য সব যারা আছে তোমার চারপাশে …..।
আমি বলি – আমি ওইসব পাগলদের মেলে ফিরা যামু না দিদি। আমাকে কোথাও যদি একটা বাসাকাম ধরাইয়া দেন ….।
তিনি বলেন – তুমি বাইরে অপেক্ষা কর। আমার ডিউটি শেষ হবে দুটোয়, তারপর কথা বলব।
হাসপাতালের কাছেই তাঁর কোয়ার্টার। সেখানে নিয়ে গেলেন আমায়। বসিয়ে খেতে দিলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন – এভাবে বাড়ি ছাড়ার কথা বলছ, তোমার স্বামী এসে গণ্ডগোল বাঁধাবে না?
–সে বরঞ্চ বাইচ্যা যাইব।
–আমার কাছে থাকবে তুমি ? আমি একা থাকি।
জানতে খুব কৌতূহল হচ্ছিল – দেখতে শুনতে সুন্দর, অতবড় চাকরি করা মানুষটা কেন একা থাকেন। জিজ্ঞাসা করতে সাহস হল না। তিনি বলেন – বাড়িতে কিন্তু খবর দিতে হবে, তুমি এখানে আছ।
বললাম – চিঠি লেইখ্যা দিতাছি।
তিনি কাগজ-কলম দিলেন। কত যুগ পর যে হাতে কলম ধরলাম। চিঠি লিখলাম –……..তুমি তো পাগল ভেবে আমাকে মনে মনে ত্যাগ করিয়াছ। আমিও এইবার তোমাকে মুক্তি দিব। আমার মেয়েটার জীবন যাতে আমার মতো বিড়ম্বিত না হয়, তার জন্য তাকে লেখাপড়া করিয়ে স্বাবলম্বী বানাইব। এর জন্য চাকর খাটিব সিদ্ধান্ত নিয়াছি। বিয়ের পর প্রথমে ডাইনি,তারপর কালী, তারপর পাগলি, এখন চাকরানি …..একই জন্মে কত জন্মান্তর ঘটিবে আমার, জানি না।
আমি কোথায় থাকিব, জানিবার কৌতূহল হইবে তোমার। আমি ডাক্তার দিদিমণির বাসায় থাকিব। তিনি বলিয়েছেন – মেয়েকে ইশকুলে ভর্তি করিয়ে দেবেন। মেয়েটার তো মাত্র তিন বৎসর বয়স। কাছেই একটি বালওয়াড়িতে তাহাকে পাঠাইবেন। পাঁচ বৎসর বয়স হইলে বড় ইশকুলে তাকে ভর্তি করিয়ে দিবেন।
আমি পাগল না হইয়াও পাগল বলিয়া পরিত্যাক্ত হইলাম। না, বাড়ি হইতে বিতাড়ন করিয়াছ, এমন অপবাদ দিব না। কিন্তু ভাবিয়া দেখ, আমি এমন একটা মানুষ, যে কারোও মনে স্থান পাইল না ( তুমি অবশ্য প্রথমদিকে ভালই বাসিয়াছিলে )। যার কোনোও বন্ধু জুটিল না, কারণ জুটবার আগেই সে ডাইনি আখ্যায়িত হইয়া সকলের কাছে ভীতিপ্রদ হইয়া উঠিয়াছিল।
এইসব কথা বিস্তারিত কী লিখিব তোমায়, কিছুই তো অজ্ঞাত নয় তোমার। আমার জীবন নষ্ট হইয়াছে, তোমাদের মাছলি-তে থাকলে মেয়েটার জীবনও নষ্ট হইবে। এই কথা মান নিশ্চয়। সে যাতে সুন্দর জীবন পায়, তা তুমিও চাও নিশ্চয়। তাই এইখানে আসিয়া আমাদের নিয়া যাওয়ার চেষ্টা করিও না। চেষ্টা যে করিবে না , বরঞ্চ আমি ঘাড়ের থেকে নামলাম, তাই মুক্তির আনান্দ পাইবে – জানি। তবু মনের অতলে কেন যে কল্পনা উঁকি মারে, তুমি আসিয়া বলিতেছ –
চল !মোট কথা, আমি আর তোমাদের বাড়িতে ফিরিয়া যাইব না।ইতি ….. চিঠি লেখা শেষ হলে দিদিমনি জিজ্ঞাসা করলেন –
পড়তে পারি? -
পড়েন।ভিতরে ভিতরে অবশ্য লজ্জা পাচ্ছিলাম। চিঠির দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন –
বাঃ, বেশ সুন্দর তো হাতের লেখা। আমি তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে লক্ষ করলাম, পড়তে পড়তে কখনো কখনো তাঁর চোখের পাতা কাঁপছে, কখনো এক চিলতা হাসি ফুটে উঠছে ঠোঁটের কোনে। পড়া শেষ হলে বললেন –
হুঁ !তারপর একটু থেমে বললেন –
গুরুচণ্ডালী দোষ আছে।গুরুচণ্ডালীশব্দটি কতদিন পর শুনলাম ! মনে পড়ল ইশকুলে পড়ার দিনগুলা। স্যার-দিদিমণিরাও বলতেন, আমার গুরুচণ্ডালী দোষ। বকতেন। একটা খাম এনে দিলেন দিদিমণি। বললেন, ঠিকানা লিখে দিতে। লিখলাম – শ্রী দুলাল দাস, সারদা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। মাছলি বাজার। চিঠিখানি ভাঁজ করে খামে ভরছিলাম। দিদিমিণি বললেন –
ভাবছি তোমাকেও পড়াব।` ছলাৎ করে উঠল বুকের রক্ত।
চিঠিখানি দিলাম তাঁকে। তিনি নিলেন। বললেন – কালকেই ঠিকানায় পৌঁছে যাবে চিঠি।