২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিসর্জন দিয়ে পালন হবে কিনা—এমন প্রশ্ন তুলেছেন দেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সিনিয়র নেতারা। তারা মনে করেন, দেশের বর্তমান শাসনতান্ত্রিক রীতি ও নীতি স্বাধীনতার চেতনার বাইরে চলে গেছে। আর এ থেকে বেরিয়ে আসতে মুক্তিযুদ্ধের সময় যে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি হয়েছিলো, সেই চেতনার পথ ধরেই প্রয়াত শাজাহান সিরাজসহ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ত্রিশ লক্ষ শহীদের মর্যাদা দেওয়া সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট রিসার্চ অ্যান্ড কমিউনিকেশস (বিএনআরসি) এর উদ্যোগে বিএনপির সদ্য প্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান ও স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠকারী শাজাহান সিরাজের স্মরণে আয়োজিত ভার্চুয়াল সভায় রাজনীতিকরা এসব কথা বলেন। ‘স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রামকে স্বাধীনতা যুদ্ধের রূপান্তরে শাজাহান সিরাজ এর ভূমিকা’ শীর্ষক এই ভার্চুয়াল আলোচনা সভার আয়োজন করে বিএনআরসি। গত ১৪ জুলাই ঢাকার এভার কেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন শাজাহান সিরাজ।
আলোচনা সভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘কী দুর্ভাগ্য আমাদের আজকে যারা ক্ষমতায় বসে আছে, যারা বলে তারা স্বাধীনতা চেতনা ধারণ করে তারাই আজ সচেতনভাবে এদেশের মানুষের যে ভোট দেওয়ার অধিকার হরণ করে নিয়ে গেছে। দুর্ভাগ্য আজকে শাজাহান সিরাজের এই স্মরণ-সভায় যারা আছেন, তারা এই বাংলাদেশ দেখতে চাননি। তারা একটা সুখী, সমৃদ্ধ, সাধারণ মানুষ যাতে বেঁচে থাকতে পারেন সেই বাংলাদেশ দেখতে চেয়েছিলেন। আজকে আমরা কী দেখছি?’
এই অবস্থা থেকে উত্তরণে জাতীয় ঐক্যের আহবান জানিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘শাজাহান সিরাজ যে বাংলাদেশ দেখতে চেয়েছিলেন সেই বাংলাদেশকে যদি আমরা নির্মাণ করতে চাই আজকে আবার ১৯৭১ সালের মতো আমাদেরকে একটা জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে।’
শাজাহান সিরাজের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে তিনি বলেন, ‘আমি শাজাহান সিরাজকে শুধু বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দেখতে চাই না, আমার মনে হয় দেশের মানুষও দেখতে চায় না। তাকে সবাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠকারী, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন নায়ক হিসেবে দেখতে চান, সেভাবে তারা দেখেছেন শাজাহান সিরাজ সাহেবকে। ফখরুল আক্ষেপ করেন, আমরা খুব কষ্ট পাই যখন দেখি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর যোদ্ধা যারা জীবন বাজি রেখে সংগ্রাম করেছেন, লড়াই করেছেন তাদের খাটো করে দেখার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা ডাকসুর সাবেক ভিপি ও জেএসডির সভাপতি আসম আবদুর রব বলেন, ‘১৯৬২ সালে সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের গঠনের মধ্যে দিয়ে প্রত্যেকটা আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। ওই সময়ে সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে নিউক্লিয়াসের সদস্যরা ছাড়া কেউই পৃথিবীতে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নই দেখে নাই। আমি ও শাজাহান সিরাজ ৬২ সালে নিউক্লিয়াসের সদস্য। আমরা কোনওদিন স্বায়ত্তশাসনের জন্য আন্দোলন করি নাই। একটা কথা বলে দিলে আজকে সবাই বুঝতে পারবেন, পাকিস্তানে লাথি মারো বাংলাদেশ স্বাধীন করো, ৬ দফা না ১ দফা, জিন্নাহ মিয়ার পাকিস্তান, আজিমপুরের গোরস্থান, বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’
আসম রব আরও বলেন, ‘শাজাহান সিরাজের তার সারাজীবনের মধ্যে কী কাজ করেছেন আমি জানি না। তবে একটি জিনিসের জন্য তিনি বাংলাদেশে বেঁচে থাকবেন সেটি হলো তেসরা মার্চ। সারা বাংলাদেশে সেদিন স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়েছিল যেটা দোসরা মার্চ আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তোলন করেছিলাম। বলা হয়েছিলো তেসরা মার্চ পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে দিয়ে সারাদেশে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করতে হবে। সেদিন বঙ্গবন্ধুকে সামনে রেখে সিরাজুল আলম খানের নির্দেশে শাজাহান সিরাজ স্বাধীনতা ইশতেহার পাঠ করেছিলেন।’
স্বাধীনবাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘জাতিকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরিচালিত করতে, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতাকে যারা সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, শাজাহান সিরাজ তাদের মধ্যে অগ্রপথিক ছিলেন। শাজাহান সিরাজের ভূমিকা তাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরঞ্জীব করে রাখবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ছাত্রলীগের মধ্যে যারা গণতান্ত্রিক বলে পরিচিত ছিলাম, আমরা সবসময় স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতাম। আমরা বিশ্বাস করতাম একটা জাতীয় ম্যান্ডেট প্রয়োজন। স্বাধীনতার ডাক বঙ্গবন্ধুও যদি দেন তাহলেও এটা বিচ্ছিন্নতাবাদে পরিণত হবে যদি একটি নির্বাচনের ম্যান্ডেট আমরা গ্রহণ করতে না পারি। কথাটাকে টুইস্ট করে বললে অবিচার হবে, কথাকে টুইস্ট করে বললে ইতিহাসের বিকৃত হবে। আমরা স্বাধীনতা চেয়েছিলাম মানুষের ম্যান্ডেটের মাধ্যমে একটি নেতৃত্বের মাধ্যমে মানুষের আনুগত্য ঘোষণার মধ্যে, একটি ম্যান্ডেটের মধ্যে সমস্ত জাতির ঐক্যের মাধ্যমে। ৭০ এর ম্যান্ডেন্ট পাওয়ার আগে যদি আমরা স্বাধীনতার স্লোগান দিতাম, ম্যান্ডেট পাওয়ার আগে যদি আমরা স্বাধীনতা প্রথম পরিক্রমায় অংশ নিতাম তাহলে জনগণও আমাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী ভাবতো এবং পাকিস্তানি শত্রুরা আমাদের আক্রমণ করতে সুযোগ নিয়ে নিতো আরও।’
বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের টেবিলে, আলোচনায় আমাদের স্বাধীনতা আসে নাই। এটা ছিল জনযুদ্ধ। ফলে জনযুদ্ধে জনগণের যে ভূমিকা সেটা বাদ দিলে সেই ইতিহাস কখনো সম্পূর্ণ ইতিহাস হয় না।’ খালেকুজ্জামান বলেন, ‘এখন গণতন্ত্রের হাল কী? গণতন্ত্র তো দূরে থাক, ভোটতন্ত্রও নাই। পার্লামেন্ট থেকে ইউনিয়ন কাউন্সিল পর্যন্ত প্রায় ৬৬ হাজার কথিত জনপ্রতিনিধি রাতের ভোট, টাকার জোরে, বাহু বলে ভোট, শাসন ক্ষমতার দাপটে-আনুকূল্যে, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের কারসাজিতে নির্বাচিত হয়ে যান।’
শাজাহান সিরাজের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাসদ সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, ‘ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জন-আকাঙ্ক্ষা থেকে দেশ বহু পেছনে চলে গেছে। ফলে, সামনের বছর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিসর্জনের সুবর্ণজয়ন্তী হবে, নাকি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবো?’
নাগরিক ঐক্য আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘স্বাধীনতার পক্ষে যারা যারা কাজ করেছেন, তাদের সবার কাজ একসঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। ইতিহাসে যারা ভূমিকা রেখেছেন, পুরো বিষয়টিকে সন্নিবেশিত করতে হবে।’
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য জহিরউদ্দিন স্বপনের পরিচালনায় এই আলোচনা সভায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী বক্তব্য রাখেন।

