নিজের ঘর সামাল দিতেই এখন নাকাল ড. কামাল হোসেন। চলছে বহিষ্কার আর পাল্টা বহিষ্কারের খেলা। রাজনীতির ছোট সংসার সামাল দিতে নাকানি-চোবানি খাওয়া এই নেতার হাতেই নাকি দেয়া হয়েছিল জাতীয় ঐক্যের ঝাণ্ডা। ফ্যাসিবাদী সরকারকে সরাতে ২০১৮ সালের শেষ দিকে তাঁকেই রাতারাতি বানানো হয়েছিল জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে নিজের ঘরই যিনি সামাল দিতে পারছেন না, তাঁর নেতৃত্বে কথিত জাতীয় ঐক্য হয়েছিল কেমন করে? নিজের ঘর গণফোরামে দেড় বছরের বেশি সময় জুড়ে চলছে টানা-হেঁচড়া। দফায় দফায় ঘটছে বহিষ্কার ও পাল্টা বহিষ্কারের ঘটনা। গত সপ্তাহ জুড়ে দলটির অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করে। হুঙ্কার, বহিষ্কার ও বিবৃতি, পাল্টা বিবৃতি চলছে নিজেদের বিরোধ নিয়ে। সর্বশেষ আজ (৪ অক্টোবর ২০২০) এক বিবৃতিতে গৃহবিবাদের জানান দিলেন গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া। গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে তারা বলেছেন, কোনো ব্যক্তি গণফোরামের রাজনীতি ত্যাগ করে নতুন রাজনীতি করতে পারেন। কিন্তু গণফোরামের নামে অগণতান্ত্রিক ও অগঠনতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দলকে বিব্রত করার এখতিয়ার কারো নেই।
এই দুই নেতা বলেন, গণফোরামের নামে কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তির কর্মকাণ্ড ইতিপূর্বেও আমাদের নজরে এসেছে। তাদেরকে বিধিসম্মতভাবে দল থেকে বহিষ্কার করে গণফোরাম যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এখন আবার বহিষ্কৃতদের সাথে মিলিত হয়ে কয়েকজন সদস্য গঠনতন্ত্র বিরোধী কর্মকাণ্ড, বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে দলের সুনাম নষ্ট করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। ফলে গঠনতন্ত্র ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে আরও কয়েকজন সদস্যকে শোকজ করা হয়েছে। শোকজের জবাব পাওয়ার পর তাদের সম্পর্কে দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার এখতিয়ার গণফোরামের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির রয়েছে।
২০১৯ সালের এপ্রিলে কাউন্সিল হওয়ার পর থেকেই চলছে বহিষ্কার এবং পাল্টা বহিষ্কারের ঘটনা। কাউন্সিলের পর ড. কামাল হোসেন সভাপতি ও ড. রেজা কিবরিয়াকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি ঘোষণার পরপরই দলটিতে বিদ্রোহের সুর বেজে উঠে। একটি গ্রুপ রেজা কিবরিয়াকে নিয়ে প্রশ্ন তোলে তখন। প্রকাশ্যেই বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন তারা। এতে নতুন সাধারণ সম্পাদক রেজা কিবরিয়া স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে ৪ জনকে বহিষ্কার করা হয় । রেজা কিবরিয়া কর্তৃক বহিষ্কৃতরা হলেন- কেন্দ্রীয় নেতা হাসিব চৌধুরী, খান সিদ্দিকুর রহমান, হেলাল উদ্দিন ও লতিফুর বারী হামিম। এর জবাব দিতে গিয়ে দলটির বিদায়ী নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বহিষ্কার করেন নতুন কমিটির সাধারণ সম্পাদক রেজা কিবরিয়াসহ ৪ জনকে। বহিস্কৃতরা হলেন- সাধারণ সম্পাদক রেজা কিবরিয়া কেন্দ্রীয় কমিটির মহসীন রশিদ, আও ম শফিকউল্লাহ ও মোশতাক আহমদ।
এই পাল্টাপাল্টি বহিষ্কারের পর বছর খানেক পার হয়ে গেছে। সম্প্রতি গত ২৭ সেপ্টেম্বর দলটির একটি অংশ জাতীয় প্রেসক্লাবে বর্ধিত সভার আয়োজন করে। এই বর্ধিত সভা থেকে আগামী ২৬ ডিসেম্বর দলের নূতন কাউন্সিলের তারিখ ঘোষণা করা হয়। এ বর্ধিত সভায় নেতৃত্ব দেন সাবেক নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, সাবেক কেন্দ্রী নেতা অধ্যাপক আবু সাঈদ প্রমুখ।
বর্ধিত সভার দিনেই ড. কামাল হোসেন হুঙ্কার দেন, গণফোরামের বর্ধিত সভা ডাকার তারা কে? ড. রেজা কিবরিয়া এক বিবৃতিতে জানিয়ে দেন বর্ধিত সভার সঙ্গে গণফোরামের কোন সম্পৃক্ততা নেই। তারা গণফোরামের নাম ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। এই বিবৃতি পাল্টা বিবৃতির পর আজ আবার নতুন করে যৌথ বিবৃতি দেন সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক রেজা কিবরিয়া।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে ১৯৯৩ সালে ড. কামাল হোসেন গণফোরাম গঠন করেছিলেন। তখন নূতন দলটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সিপিবি ত্যাগ করে আসা সাইফুদ্দিন আহমদ মানিক। যদিও সাইফুদ্দিন আহমদ মানিক এক পর্যায়ে গণফোরাম ত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন। গত ২৭ বছরে গণফোরাম কোন নির্বাচনে বিজয়ের মুখ না দেখলেও ২০১৮ সালে জাতীয় ঐক্যের কল্যাণে আওয়ামী নির্বাচন কমিশন দলটিকে ২টি আসন দিয়েছে।
জাতীয় ঐক্যের প্রবক্তাদের মুখেও এখন আর সেই ঐক্যের ধ্বনি শোনা যায় না। নিজের রাজনীতির ইতিহাসে যিনি কখনো বিজয়ের মুখ দেখেননি, তাঁর উপর ভর করে ফ্যাসিবাদ তাড়িয়ে বিজয়ের স্বপ্ন যারা দেখেছিলেন তাদের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা নিয়েই বরং এখন প্রশ্ন উঠছে।

