শিরোনাম
বৃহঃ. মার্চ ১৯, ২০২৬

আওয়ামী ব্যাংকে জনগণের অর্থ হরিলুট

আওয়ামী লীগের এক যুগের শাসনামলে রাজনৈতিক বিবেচনায় একের পর এক নতুন ব্যাংক অনুমোদন,রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের চাপে বারবার ব্যাংকিং নীতি পরিবর্তন এবং অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে অনেকটাই ঝুঁকির মুখে রয়েছে ব্যাংকিং খাত।

রাজনৈতিক বিবেচনায় আওয়ামী লীগের তিন মেয়াদে অনুমোদন পেয়েছে ১৪টি ব্যাংক।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুমোদন পাওয়া নতুন তিনটি ব্যাংক কার্যক্রম শুরু করলে দেশে মোট ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়াবে ৬২-তে। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি ব্যাংক রয়েছে নাজুক অবস্থায়।

আওয়ামী লীগের নেতাদের পাশাপাশি নতুন ব্যাংক পেয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বাংলাদেশ পুলিশও।

টিআইবির এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বর্তমানে ৭ বা ১০ জন শীর্ষ ঋণ গ্রহীতা খেলাপি হলে যথাক্রমে ৩৫ টি এবং ৩৭ টি ব্যাংক মূলধন সংকটে পড়বে।

এ থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে আওয়ামী লীগের তিন মেয়াদে ব্যাংক গচ্ছিত জনগণের টাকা কী ভয়াবহভাবে লুটপাট করা হয়েছে।

প্রয়োজনীয়তা না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় ২০০৯ সালের পর থেকে ১৪টি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে বাধ্য করে আওয়ামী লীগ। নতুন ব্যাংকগুলোর উদ্যোক্তার মধ্যে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্য, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী, ছাত্র সংগঠনের নেতা,রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বিভিন্ন পেশাজীবী গ্রুপ রয়েছে।

উল্লেখ্য,আওয়ামী লীগ সরকারের ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে অনুমোদন পায় ১৩ ব্যাংক। আর ২০০৯ এর পর থেকে তিন মেয়াদে ১৪টি ব্যাংকের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুমোদন পাওয়া নতুন তিনটি ব্যাংকের মধ্যে বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক পেতে আবেদন করেছিলেন বেঙ্গল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন। আওয়ামী লীগের সাংসদ মোরশেদ আলম বেঙ্গল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালক। প্রস্তাবিত এই ব্যাংকটির পরিচালক হিসেবে রয়েছেন চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার আগারওয়াল, পোশাক খাতের ব্যবসায়ী সাহাবুদ্দিন, চট্টগ্রামের কেডিএস গ্রুপ ও ম্যাক্স গ্রুপ, পোশাক খাতের লাবিব ও শারমিন গ্রুপসহ আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী।

পিপলস ব্যাংক পেতে আবেদন করেছিলেন প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা এম এ কাশেম। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে তার বাড়ি। যুক্তরাষ্ট্রে তার ব্যবসা রয়েছে বলে দাবি তার। তবে এ সংক্রান্ত পর্যাপ্ত নথিপত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিতে পারেননি।

আর সিটিজেন ব্যাংক পেতে আবেদন করেছিলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের মা জাহানারা হক।

লুটপাটের খতিয়ান:

শুধু গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে বেসরকারি সংস্থা সিপিডির দেয়া এক হিসেবে, গত দশ বছরে (ডিসেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত) ব্যাংক খাতে ২২ হাজার ৫০২ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে।

তবে অনিয়ম আর দূরাবস্থার জন্য সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ফারমার্স ব্যাংক, যেটি পরে নাম পরিবর্তন করে নতুন নামে কার্যক্রম শুরু করেছে।

এছাড়া, সবশেষ পিপলস লিজিং কোম্পানি থেকে ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে লাপাত্তা হয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিস লিমিটেডের পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদার (পিকে হালদার)।

পি কে হালদার প্রথমে রিলায়েন্স ফাইন্যান্স এবং পরে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। এমন আরো কিছু প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি) ইত্যাদি।

মখা’র ফার্মার্স ব্যাংকে যেভাবে লুটপাট:

২০১৩ সালে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় যে ৯টি ব্যাংকের অনুমোদন দিয়েছিলো, ফারমার্স ব্যাংক ছিলো তার অন্যতম।

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম খা আলমগীর, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিদ্দীকী নাজমুলের মালিকানাধীন বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ফারমার্স ব্যাংকের ছয়টি শাখায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকার লুটপাটের হিসাব পাওয়া যায়। এতে জনগণের সংরক্ষিত আমানত ফেরত দিতে অক্ষম হয়ে পড়ে ব্যাংকটি।

এখানে উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনতাসির মানুন পারিবারিক সম্পর্কে সাবেক দুর্নীতিবাজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরের ভাইয়ের ছেলে। এই মুনতাসির মামুনের মত মুখোশধারী আওয়ামী আতেলরা জনগণকে নীতি নৈতিকতার সবক দেন। কিন্তু ব্যক্তি জীবনে তারা যে একেক জন বড় দুর্নীতিবাজ সেটি ফার্মার্স ব্যাংক লুটেই প্রমানিত হয়েছে। ১/১১-এর সরকারের আমলে মহিউদ্দিন খান আলমগীর কেবল জেলই খাটেননি, তিনি আদালতে দুর্নীতির মামলায় দন্ডিতও হয়েছিলেন। এই দন্ডিত ব্যক্তিকে শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে মন্ত্রী বানিয়েছিলেন। এবং বাংলাদেশের অকার্যকর আদালত প্রমাণিত দুর্নীতিবাজ ম খা’র সংসদ সদস্য পদ বাতিল করতেও সাহস পায়নি।

এই ব্যাংক থেকে ১৬০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তাদের একজন মাহবুবুল হক চিশতী। সরকারের জলবায়ু ট্রাষ্ট ফান্ডের ৫০০ কোটি টাকার আমানতও ছিল এ ব্যাংকে।

লুটপাটের ঘটনা প্রকাশ হয়ে পড়লে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদ ছাড়তে বাধ্য হন মহিউদ্দীন খান আলমগীর ও নিরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান মাহাবুবুল হক চিশতী। পরিচালক পদ থেকেও পদত্যাগ করেন তারা। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ কে এম শামীমকেও পরে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আবুল মাল আবদুল মুহিত যখন অর্থমন্ত্রী ছিলেন, তখন সিলেটে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ৪৩তম শাখা উদ্বোধন কালে তিনি বলেছিলেন, ফারমার্স ব্যাংকের বিপর্যয়ের জন্য এর প্রতিষ্ঠাতারাই দায়ী। তারাই ব্যাংকটিকে লুটপাট করে শেষ করে দিয়েছে।

বেসিক ব্যাংকে জালিয়াতি:

বেসিক ব্যাংক ছিল এক সময় রাষ্ট্রীয় মালিকানার সবচেয়ে ভাল ব্যাংক৷ রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া আব্দুল হাই বাচ্চু পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান নিয়োগ পাওয়ার পর ব্যাংকটি অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়৷

২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ব্যাংকটিতে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণে বড় ধরনের অনিয়ম পায় বাংলাদেশ ব্যাংক৷ ব্যাংকের টাকা মেরে দিতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অনেক ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়া হয়। এসব ঋণের বেশিরভাগই আর ব্যাংকে ফেরত আসেনি।

‘হলমার্ক’কেলেঙ্কারি:

রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী ব্যাংক থেকে একদমই অপরিচিত ব্যবসায়িক গ্রুপ ‘হলমার্ক’ ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে প্রায় মোট তিন হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা ঋণের নামে আত্মসাৎ করে। হলমার্কের মতো প্রতিষ্ঠানকে এত বড় অংকের ঋণ দেয়ার পেছনে রাজনৈতিক অঙ্গনের কারও কারও সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে গুঞ্জন ছিল।

উল্লেখ্য, সোনালী ব্যাংকের তখনকার পরিচালক যারা ছিলেন, তাদের বড় অংশই সরাসরি রাজনীতিতে জড়িত। যেমন, সুভাষ সিংহ রায় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা, সাইমুম সরওয়ার স্বেচ্ছাসেবক লীগের আন্তর্জাতিক-বিষয়ক সম্পাদক এবং জান্নাত আরা মহিলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক। বাকিরা আওয়ামী লীগের কোনো পদে না থাকলেও সমর্থক হিসেবে পরিচিত। পরিচালকদের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া এতোবড় দুর্নীতি অসম্ভব বলে মনে করে বিশেষজ্ঞরা।

রিজার্ভের অর্থ উধাও:

২০১৬ সালে ঘটে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসের সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনা। হ্যাকাররা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অফ নিউ ইয়র্কে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপিন্স ও শ্রীলঙ্কায় পাচার করে দেয়। ফিলিপিন্সে পাচার করা ৮.১ কোটি ডলারের এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।

সমঝোতায় লুটপাট:

ব্যাংক খাতের একাধিক সূত্র জানায়, একদমই যাচাই-বাছাই ছাড়া এক ব্যাংকের পরিচালক আরেক ব্যাংক থেকে ইচ্ছামতো ঋণ নেন। নামমাত্র ব্যবসায়ী, ব্যাংক পরিচালক, ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা ও রাজনীতিকের সংঘবদ্ধ চক্র এই লুটপাটে জড়িত।

রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভুয়া কাগজপত্র মর্টগেজ হিসেবে দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে যাচ্ছেন তারা। কখনও কখনও মর্টগেজ ছাড়াই করপোরেট গ্যারান্টির নামে ঋণ দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। এসব কাজ হচ্ছে ব্যাংক মালিক, ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা ও শীর্ষ রাজনীতিবিদরা জড়িত।

ফলে ব্যাংক খাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে জনগণের গচ্ছিত টাকা, যা আর ফিরে আসছে না।

সংসদে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যমতে, শুধু ব্যাংক পরিচালকরাই ১ লাখ ৭১ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন; যা মোট বিতরিত ঋণের ১১ দশমিক ২১ শতাংশ। এর ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

একই সঙ্গে সব ধরনের দায় এড়াতে এবং অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ কমাতে ও ব্যাংকের ফিন্যানশিয়াল রিপোর্ট ভালো দেখাতে অবলোপন করা হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর গবেষণায় দেখা যায়, ব্যাংকিং খাতে সংঘটিত ৯০ শতাংশ অপরাধে জড়িত ব্যাংকের নিজস্ব লোকজন। বিশেষ করে পরিচালকদের হাত রয়েছে সবচেয়ে বেশি। পরিচালকরা বর্তমানে একে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করেও ঋণ নিচ্ছেন।

ব্যাংকগুলোর খেলাপিদের ঋণের একটি বড় অংশই বর্তমান ও সাবেক ব্যাংক পরিচালক, তাদের স্ত্রী-পুত্র-সন্তান বা তাদের নিকটাত্মীয়দের কাছে আটকা পড়ে আছে। এসব ঋণ প্রস্তাব, অনুমোদন ও বিতরণের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আর তাদের সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *