বিশু / সমীপ,কাটিগড়া (অসম): ২০২১-এর রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে কাছাড়ের কাটিগড়া আসনে টিকিট প্রার্থীদের দৌঁড়ঝাপ তুঙ্গে উঠেছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী কাটিগড়া আসনে বিজেপির টিকিট আদায়ের ক্ষেত্রে জনসমর্থনের শক্তি প্রদর্শনে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। এদিকে গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে গেরুয়া শিবিরে ২০১১-এর মতো অন্তর্ঘাতের পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা তীব্রতর হচ্ছ বলে ধারণা করছেন এলাকার নির্বাচন সচেতনরা।
আগামী সালের বিধানসভা নির্বিচনের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসছে। সেই সঙ্গে নির্বাচনে লড়তে ইচ্ছুক প্রার্থীরা ভোটারদের অনুকূলে আনতে এবং জমি উর্বর করতে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। দলীয় কর্মীমহল ও সর্বস্তরের জনগণের সমর্থন আদায়ে এ মুহুর্তে কাটিগড়ায় টিকিট প্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ তুঙ্গে উঠেছে। বিগত মাস দুয়েক থেকে কাটিগড়ায় সদম্ভে বিরাজ করছেন প্রাক্তন মন্ত্রী তথা বরাকের ডাক সাইটে কংগ্রেসত্যাগী সদ্য-বিজেপি নেতা গৌতম রায়। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশেই নাকি গৌতম রায় কাটিগড়ায় প্রার্থিত্ব পাবেন, তাই তিনি নির্বাচনী এলাকার সর্বস্তরের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যাপক তত্পরতা শুরু করেছেন।
কালাইন ও কাটিগড়া দুই মণ্ডল সভাপতির সৌজন্যে তাঁদের বাড়িতে দলীয় সমর্থকদের নিয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে গৌতম রায়ের অনুকূল ভৌটারদের প্রভাবিত করার লক্ষ্যে। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ইচ্ছুক প্রার্থীর সমর্থকদেরও আজকাল গৌতম রায়ের হয়ে কাটিগড়ার প্রত্যেক অঞ্চলে সভা সমিতিতে ভিড় জমাতে দেখা যাচ্ছে। গৌতম হাওয়ায় তলিয়ে যাচ্ছে অনেক কাগুজে বাঘ গেরুয়া টিকিট প্রত্যাশীর স্বপ্ন। ইতিমধ্যে কালাইন কলেজ রোডে বাড়ি ভাড়া করেছেন গৌতম রায়। এছাড়া সিদ্ধেশ্বর প্রশান্তি লজে প্রতিদিন সহস্রাধিক জনগণের ভিড়ের মধ্যেই গৌতম রায়ের গেরুয়া প্রার্থিত্বের মজবুত ভিত প্রকট হচ্ছে। সমগ্র কাটিগড়া, বিশেষ করে পশ্চিম কাটিগড়ার অধিকাংশ দলীয় কর্মী নেতা গৌতম ভরসায় ঝুঁকছেন।
এদিকে দিগরখালের বাসিন্দা বিশিষ্ট সমাজসেবী উত্তম কুমার নাথ বিগত কয়েক বছর থেকে কাটিগড়ার সর্বত্র ব্যাপকভাবে জনহিতকর কাজে নিজের ব্যতিক্রমী তত্পরতা জারি রেখে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে মজবুত করে তুলছেন। উত্তম নাথ ফ্যানস ক্লাবের কর্মী সমর্থকদের নিরলস কার্যসূচি ভোটারমহলে আলাদা ভিত তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া বিগতদিনে চা বাগান অঞ্চলের গরিব জনগণের মধ্যে ব্যক্তিগত উদ্যোগে শাড়ি কম্বল বণ্টনের পাশাপাশি অতিমারি করোনা কালে ঢালাও হাতে সমগ্র কাটিগড়ার গরিব জনগণের মধ্যে ত্রাণ সামগ্রী বণ্টনে নজির সৃষ্টি করেছেন উত্তম নাথ। গরিব মানুষের শোকে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর বিরল মানসিকতার দরুণ কাটিগড়ার জনমনে বিধায়ক পদপ্রার্থীর দিকে ঠেলে দিয়েছে উত্তমবাবুকেও। এছাড়া গেরুয়া দলের রাজ্যিক ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন শাখা কমিটির ঊর্ধ্বতন কর্তাদের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক টিকিট প্রত্যাশীর ক্ষেত্রে বিশেষ মাইলেজ পাবার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। আরএসএস-এর সঙ্গে রয়েছে উত্তম নাথের গভীর সম্পর্ক । এছাড়া দূরারোগ্য ব্যাধিতে অসুস্থ ব্যক্তিদের চিকিত্সার ব্যয়ভার বহন করে অনেক রোগীকে সুস্থ করে তোলার দৃষ্টান্ত রয়েছে উত্তম নাথের। করোনার সময়ে মানুষের চরম অভাব অনটনে ত্রাতার মতো উত্তম নাথের নাম শোনা গেছে কাটিগড়ার সর্বত্র। বর্তমানে শতাধিক যুবক প্রতিদিন বিভিন্নপ্রান্তে উত্তম নাথের সমর্থনে বিভিন্ন কর্মসূচি জারি রেখেছেন। এমন-কি বিভিন্ন দলের ইচ্ছুক প্রার্থী পর্যন্ত গরিব অসহায় মানুষদের উত্তম নাথের কাছে ঠেলে দিয়েছেন । ফলে উত্তম নাথ এবং গৌতম রায়ের সমানতালে ব্যাপক প্রচারাভিযান পরিলক্ষিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, সাংগঠনিক স্তরে নিরবচ্ছিন্ন অবস্থানে রয়েছেন কালাইনের বিশিষ্ট সমাজসেবী বিজেপির হয়ে আজীবন কাজ করে আসা প্রাক্তন মণ্ডল সভাপতি তথা জেলা কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য বিপ্লব কান্তি পাল। দলের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে বিপ্লববাবু অন্যতম শক্ত দাবিদার হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিত্ব। কাটিগড়া আরএসএস-এর কার্যসূচি তথা সংঘ কার্যালয়ের সূচনা হয় বিপ্লব কান্তি পালের হাত ধরেই। তখনকার সংঘ প্রচারক কাঞ্চন মণ্ডলের উদ্যোগে ও বিপ্লববাবুর প্রয়াসে নিজের ঘর থেকে সংঘের বিভিন্ন কর্মসূচি কাটিগড়ার আনাচে কানাচে বিস্তার লাভ করে। এছাড়া বিশ্বহিন্দু পরিষদের ব্যাপক কার্যসূচির অংশীদার হিসেবে বিপ্লববাবুর ভূমিকা সর্বজনবিদিত। শ্রীগৌরীতে আজকের মাধম ধাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পেছনে বিপ্লব পালের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে বলে দাবি তাঁর সমর্থকদের। সেদিক থেকে পর্যালোচনা করলে সংঘ পরিবারের সঙ্গে বিপ্লববাবুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয় তাঁর গেরুয়া টিকিট প্রাপ্তির পথ প্রশস্ত করে তুলতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
যদিও বিপ্লব পাল ও গৌতম রায় উভয় গুরুভাইয়ের মধ্যে পরস্পর আস্তা ভরসার লক্ষ্যণীয় বিষয় কাটিগড়ার রাজনৈতিক মহলকে চিন্তিত করছে। এক্ষেত্রে অন্তিমলগ্নে বিপ্লব পাল গৌতম রায়কে, নতুবা গৌতম রায় বিপ্লব পালকে প্রার্থিত্ব প্রাপ্তিতে সমর্থন করে বসলে আশ্চর্যের কিছু থাকবে না।
বর্তমানে কাটিগড়া আসন বিজেপির দখলে। শাসক দলের বিধায়ক অমরচাঁদ জৈন বিগত পাঁচ বছরের কার্যকালে জনসমর্থন কতটুকু ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন এই তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় নিয়ে সর্বত্র চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ২০১১ সালের নির্বাচনে অমরবাবু বিজেপির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেই নির্দল প্রার্থী হয়ে কার্যত গেরুয়া প্রার্থী অনিলচন্দ্র দেকে সম্ভাব্য বিজয়ের পথ রুখে দিয়ে বীরত্ব প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরবর্তীতে দলে ফিরে এসে বিগত ২০১৬-এর নির্বাচনে প্রচণ্ড মোদী হাওয়ার ফলস্বরূপ শুধুমাত্র নিজের পারিবারিক মাড়োয়ারি ভোট ছাড়া বাঙালি অধ্যুষিত কাটিগড়ার ভোটার মহলের আস্থা সমেত বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন অমর জৈন। বাঙালি ও অবাঙালি চেতনা ও আবেগের ঊর্ধে ওঠে মোদী ভরসায় ভোট পেয়ে অমরবাবু বিজয়ী হলেও সেই আস্থা ধরে রাখতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন তিনি।
ইদানীংকালে একাধিক কাজের সূচনা করার পর এক রাতের মধ্যেই কাজের ফলক উপচে ফেলে দেওয়ার নজিরবিহীন ঘটনাই তাঁর প্রতি জনগণের অসন্তুষ্টির বহিঃপ্রকাশ প্রকাশ্যে এসেছে। অরুণোদয় প্রকল্পের তালিকা তৈরিতে স্বজন-পোষণ নীতিতে আরও ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে অমর জৈনকে। এছাড়া ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েতের উন্নয়নমূলক কাজে জিপি ও এপি পর্যায়ের প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় অনধিকার হস্তক্ষেপের অভিযোগে অধিকাংশ পঞ্চায়েত প্রতিনিধিদের ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন তিনি। একাংশ এলাকার কিছুসংখ্যক স্বদলীয় কর্মীনেতাদের মুখে চাউর হচ্ছে অমর জৈন সেন্ট পারসেন্ট ব্যর্থ বিধায়ক! তাঁর সময়কালে দৃষ্টান্তমলক জনকল্যাণমুখী তেমন কোনও কাজের নিদর্শন রাখতে পারেনি বলে জনগণের অভিযোগ রয়েছে । কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন বিভাগের আওতাধীন পশ্চিম কাটিগড়ার তিন জিপিতে রুরবান মিশনের দেড়শো কোটি টাকার প্রকল্প আজও হিমঘরে। মনোনীত তিন জিপিতে রুরবান মিশনের উন্নয়নমূলক কাজের বাস্তবে কোনও নিদর্শন পরিলক্ষিত না হলেও বিধায়ক অমর জৈনের সৌজন্যে রহস্যজনকভাবে মোট বরাদ্দের অধিকাংশ অর্থের ইউসি সংশ্লিষ্ট দফতরে দাখিল হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে । রুরবান মিশনের দেউলিয়াপনা নিয়ে বিধায়কের উদাসীনতায় গণ-অসন্তোষ বিরাজ করছে পশ্চিম কাটিগড়া অঞ্চলে। বিধায়ক জৈনের ছায়াসঙ্গী অনেকেই তাঁর প্রতি অনীহা ব্যক্ত করছেন বিভিন্ন গ্রামে। তাঁরা এবার নতুন মুখের সন্ধানে তত্পরতা শুরু করছেন।
সবকিছু মিলিয়ে কাটিগড়ায় অমরবাবুর দলে যে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়া বইছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এছাড়া সুহৃদ প্রকল্প বণ্টনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে শোনা যাচ্ছে গেরুয়া দলের কর্মী মহলে। ইদানীং চার হাজার ফেরত দেওয়ার অলিখিত শর্তে একাংশ বুথ কমিটির সভাপতিদের সাত হাজার করে সুহৃদ প্রকল্পের চেক বণ্টনের হিড়িক পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সভাপতি মহলের মধ্যে উত্সাহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। যারফলস্বরূপ প্রকৃত গরিব অসুস্থ মানুষ সরকারের সুহৃদ প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে প্রবল অমর জৈন বিরোধী হাওয়া তীব্র করছেন।
এদিকে কাটিগড়ায় গেরুয়া শিবিরে অবশেষে ২০১১-এর পুনরাবত্তি ঘটতে পারে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক তথ্যবিভিজ্ঞ মহলের ধারণা। প্রার্থিত্বের ক্ষেত্রে কাটিগড়ায় গেরুয়া শিবিরে উত্তম এবং গৌতমের উত্থানে এমন আশঙ্কা তীব্রতর হচ্ছে। ২০১১-এর নির্বাচনে দলীয় টিকিট বঞ্চিত একাংশ ইচ্ছুক প্রার্থীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্ররোচনার মাধ্যমে বিজেপির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে অমরবাবু নির্দল প্রার্থী হিসেবে ভোটে দাঁড়িয়ে বিজেপি প্রার্থী অনিল চন্দ্র দের সুনিশ্চিত বিজয়ের পথ আটকে দিয়েছিলেন। তাই পুরনো অভ্যাস ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে অমর জৈন এবারও একই পথ অনুসরণ করলে অবাক হবার কিছু থাকবে না। যদিও বিজেপি প্রার্থীকে হারানোর এই ফর্মূলা এবার কাটিগড়ার ক্ষেত্রে কতটুকু প্রযোজ্য হবে তা সময়ই স্পষ্ট করবে। কারণ সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কাটিগড়ার ভোটারদের চিন্তা ভাবনারও অনেকটা উন্নতি ঘটেছে। সবকিছু পর্যালোচনা করলে টিকিট আদায়ের প্রাথমিক পর্যায়ের লড়াইয়ে শেষ হাসি হাসতে পারেন উত্তম কুমার নাথ নতুবা গৌতম রায়, এমন অভিমত ব্যক্ত করছে কাটিগড়ার রাজনৈতিক তথ্যাবিজ্ঞ মহল।

