শিরোনাম
বৃহঃ. জানু ২২, ২০২৬

ত্রিপুরায় বাঙালি নির্যাতনের প্রতিবাদে আসামের শিলচরে ‘আমরা বাঙালী’র বিক্ষোভ, রাষ্ট্রপতিকে আট দফা দাবি সংবলিত স্মারকপত্র প্রদান

বিশু / সমীপ, শিলচর (অসম): মেঘালয়, মিজোরামের পাশাপাশি ত্রিপুরায় ইদানীং বাঙালি নির্যাতনের মাত্রা বেড়েছে। বাঙালি হত্যা ও নির্যাতনের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার শিলচরে শহিদ ক্ষুদিরাম বসুর প্রতিমূর্তির পাদদেশে ‘আমরা বাঙালী’ বিক্ষোভ-ধরনা কর্মসূচি পাবন করেছে।

ত্রিপুরায় পুলিশের গুলিতে নিহত শ্রীকান্ত দাস, মেঘালয়ে নিখিল দে ও দিলোয়ার হোসেন হত্যা, মিজোরামে পুলিশি হেফাজতে ইন্তাজ আলি লস্কর হত্যা, ত্রিপুরায় বাঙালিদের অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি, অসমে নাগরিকপঞ্জি নিয়ে রাজনীতি এবং আইনের প্যাঁচে অসংখ্য বাঙালিকে বিদেশি বানানো প্রভৃতির প্রতিবাদে জ্বালামুখী বক্তব্য পেশ করেছেন বিক্ষোভ প্রদর্শনকারীরা।

আজ বেলা এগারোটা থেকে বেলা দুটা পর্যন্ত চলে বিক্ষোভ-ধরনা কর্মলূচি। ‘আমরা বাঙালী’ আহূত ধরনা কর্মসূচিকে সমর্থন করে অংশগ্রহণ করেছিল এআইইউডিএফ, আম আদমি পার্টি, বঙ্গ সাহিত্য ও সম্মিলনী, ইয়ুথ অ্যাগেইনস্ট এভিলস্, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা সমিতি, পাঁচগ্রাম পেপারমিল রিভাইভাল কমিটি সহ বিভিন্ন সংগঠনের কর্মর্তারা। সাম্প্রতিককালে অসমের মাটিতে মিজো আগ্রাসন, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামে চূড়ান্ত বাঙালি নির্যাতনের ঘটনাবলির প্রেক্ষিতে সরকারের নমনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ ব্যক্ত করে বক্তব্য পেশ করেন বরাক উপত্যকার বিশিষ্ট চিন্তাবিদ বরিষ্ঠ সাংবাদিক অতীন দাশ, পাঁচগ্রাম পেপার মিল রিভাইভাল কমিটির কর্মকর্তা মানবেন্দ্র চক্রবর্তী, বিশিষ্ট সমাজসেবী শরিফুজ্জামান লস্কর, আপ নেতা মৌলানা ফরিদ সাহেব, আনোয়ার হোসেন, প্রাক্তন বিধায়ক আতাউর রহমান মাঝারভুইয়াঁ, এআইইউডিএফের ফয়জুর আহমেদ, আমরা বাঙালীর অসম প্রদেশ সচিব সাধন পুরকায়স্থ, অমলকান্তি দাস, ইয়াসি-র দিলীপ সিং প্রমুখ।

মোট আয়তন দশ হাজার ছয়শো একান্নব্বই বর্গ কিলোমিটারের ত্রিপুরার জনসংখ্যা ছত্রিশ লক্ষ একাত্তর হাজার। অথচ একুশ হাজার আটশো সত্তর বর্গ কিলোমিটারের বেশি জমি সংবলিত মিজোরামের জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। তার পরও মিজোরামের ব্রু রিয়াং জনগণকে ত্রিপুরা রাজ্যে সুকৌশলে পুনর্বাসন দিয়ে বাঙালিদের বিপদঘণ্টা বাজানোর গভীর চক্রান্ত চলছে। ৪২ হাজার তথাকথিত ব্রু রিয়াংদের পুনর্বাসন দেওয়ার অর্থ হচ্ছে তাদের অন্ন-বস্ত্র বাসস্থানের মৌলিক চাহিদা মেটাতে মিনিমাম গ্যারান্টির ব্যবস্থা করে দেওয়া। তা করতে গিয়ে ত্রিপুরার অর্থনৈতিক অবস্থানকে পিছিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। রিয়াংদের কর্মসংস্থান প্রদানের মাধ্যমেই বাঙালি জনগণকে বঞ্চিত করার নামান্তর হবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন বক্তারা।

সাধন পুরকায়স্থ বলেন, বিগত দিনে বিভিন্ন শিবিরে থাকাকালে স্থানীয় বাঙালি বাড়িতে চুরি ডাকাতির পাশাপাশি মারধর করে বাঙালিদের নির্যাতন করেছে ব্রু রিয়াং শরণার্থীরা। তিনি বলেন, মিজোরাম থেকে আগত ব্রু রিয়াং জনগণকে শরণার্থী বলা যায় না। কারণ তারা ভারতের অঙ্গরাজ্য মিজোরাম থেকে ত্রিপুরায় এসেছেন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, ১৯৮০ সালের জুন মাসে ত্রিপুরার মান্দাই সহ বিভিন্ন স্থানে একতরফা ভাবে বাঙালি গণহত্যা, লুটপাট, ছিনতাই, বাড়িতে অগ্নি সংযোগ প্রভৃতি হিংসাত্মক কার্যকলাপের শিকার বাঙালিদের তা-হলে শরণার্থী বলা হবে কি?

এ ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করে সাধন পুরকায়স্থ বলেন, মিজোরামের ব্রু রিয়াংদের ত্রিপুরায় শরণার্থী হিসেবে পুনর্বাসন দেওয়া হলে ১৯৮৩ সালে অসমে নেলির গণহত্যা, গহপুরের গণহত্যা, ১৯৫০ সালে একতরফা বাঙালির উপর অত্যাচার, শারীরিক নির্যাতন, বিভিন্ন সময়ে মেঘালয়, মিজোরাম, মণিপুর, অরুণাচল প্রদেশ থেকে বাঙালিদের উত্‍খাতে নির্যাতন, নিপীড়িত হয়ে অসংখ্য বাঙালি পশ্চিমবাংলা সহ পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোতে আশ্রিত হয়েছেন, তাঁদেরকেও একইভাবে শরণার্থীর মর্যাদা প্রদান করে পুনর্বাসন দিতে হবে।

প্রায় তিন ঘণ্টার বিক্ষোভ ধরনা কর্মসূচির পর বেলা দুটায় কাছাড়ের জেলাশাসকের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির উদ্দেশ্যে আট দফা দাবি সংবলিত এক স্মারকপত্র প্রদান করেন আন্দোলনকারীরা। দাবিগুলো মিজোরাম থেকে তাড়া খেয়ে আগত ব্রু রিয়াংদের ফেরত পাঠানো, ২১ নভেম্বর পানিসাগরে পুলিশের গুলিতে নিহত শ্রীকান্ত দাস হত্যাকাণ্ডের উচ্চ আদালতের বিচারপতির মাধ্যমে তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা, ত্রিপুরা পুলিশের গুলিতে নিহত শ্রীকান্ত দাসের পরিবারকে এককালীন এক কোটি টাকার আর্থিক সাহায্য ও নিহতের পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি প্রদান, ত্রিপুরা পুলিশের গুলিতে হরেকৃষ্ণ দাসের ডান পা কেটে ফেলতে হয়েছে। অঙ্গহানির শিকার হরেকৃষ্ণ দাসকে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা ক্ষতি পূরণের পাশাপাশি তাকে সরকারি চাকরি প্রদান, অন্যান আঘাতপ্রাপ্তদের উন্নত চিকিত্‍সা ব্যবস্থার পাশাপাশি আর্থিক সাহায্য ও সরকারি চাকরি প্রদান, বাঙালিদের কোণঠাসা করতে ত্রিপুরা সরকার প্রত্যক্ষ মদতে দিয়ে উগ্রপন্থীদের দিয়ে লাগাতার বাঙালি অপহরণ কাণ্ডের ঘটনা বন্ধ করা, ত্রিপুরা, মিজোরাম সহ সীমান্ত অঞ্চলে কেন্দ্রীয় সুরক্ষা বাহিনী নিয়োজিত করা এবং ত্রিপুরার শান্তি সম্প্রীতি বিঘ্নকারী ও সাম্প্রদায়িক বীজ বপনকারী স্বশাসিত জেলা পরিষদ সহ বাঙালি বিদ্বেষী প্রত্যেক আইন শীঘ্র বাতিল করা। স্মারকপত্রের প্রতিলিপি ত্রিপুরা ও মিজোরামের রাজ্যপালের কাছেও পাঠানো হয়েছে।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *