ঋদি হক, ঢাকা: ভারতবর্ষের এক স্বাধীনতা-যোদ্ধার নাম যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। বাঘা যতীন নামেই যাঁর পরিচিতি। জন্মস্থান কুষ্টিয়ার মাটিতে তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখতে গড়া ভাস্কর্যটি আজ নতুন নয়। বহু দিন থেকেই রয়েছে কুষ্টিয়ার জনপথ আলো করে। এ বারে সেই বাঘা যতীন ক্ষতবিক্ষত হলেন স্বদেশি ভাইদের আঘাতে।
কেন এই আঘাত? আমরা কি তাঁর মূল্যায়ন করতে ভুলে গিয়েছি। যাঁর নামের সঙ্গে ‘বাঘা’ শব্দটি যুক্ত হয়ে আছে ইতিহাসের অংশ হিসেবে, সেই বাঘা যতীনের ওপর আঘাত কেন? কোন দুঃসাহসে জাতির জনকের ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়েছিল সেই কুষ্টিয়ারই মাটিতে? এ সব প্রশ্ন আমজনতার, যাঁরা ভালোবাসেন বঙ্গবন্ধুকে, বাংলার অবিসংবাদিত নেতাকে। তাঁরাই যে কোনো স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনের শক্তি পান বাঘা যতীনের কর্মকাণ্ড থেকে।
রাতের অন্ধকারে ভাঙচুর
কুষ্টিয়ায় রাতের অন্ধকারে বিপ্লবী বাঘা যতীনের ভাস্কর্য ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা। বৃহস্পতিবার রাতে যে কোনো সময়ে এই আঘাত আসে। জেলার কুমারখালি উপজেলার অন্তর্গত কয়া কলেজের মূল ফটকের সামনে স্থাপিত ভাস্কর্যটি ভাঙচুর করে দুর্বৃত্তরা। শুক্রবার সকালে ঘটনাটি স্থানীয়দের দৃষ্টিগোচর হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্রের খবর, ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের অকুতোভয় যোদ্ধা বিপ্লবী বাঘা যতীনের ভাস্কর্যটি ২০১৮ সালে তাঁর বাস্তুভিটা এলাকায় কয়া কলেজের গেটের সামনে নির্মাণ করা হয়। সেই ভাস্কর্যটির নাক ভেঙে ফেলে দুর্বৃত্তরা। এ ছাড়া মুখমণ্ডলের ক্ষতি করা হয়।
এ ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে দারুণ ক্ষোভ বিরাজমান। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এ ঘটনায় কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি অ্যাডভোকেট নিজামুল হক চুন্নু, অধ্যক্ষ হারুণ-অর-রশিদ, নৈশপ্রহরী খলিলুর রহমান এবং কয়া ইউনিয়ন যুব লিগের সভাপতি আনিসুর রহমান আনিসকে জিজ্ঞাসাবাদ করে চলেছে পুলিশ।
বঙ্গবন্ধুর পর বাঘা যতীন
গত ৪ ডিসেম্বর রাতের অন্ধকারে কুষ্টিয়া শহরের পাঁচ রাস্তার মোড়ে নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর করার পর বাঘা যতীনের ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা ঘটল। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের পর এ বার বাঘা যতীনের ভাস্কর্য ভাঙচুর হওয়ায় কয়া কলেজের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থী-সহ স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ন্যক্কারজনক এ ঘটনার সঙ্গে কে বা কারা জড়িত তা পুলিশ এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। তবে একটি সংগঠিত চক্র এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে বলে পুলিশ ও স্থানীয়রা প্রাথমিক ভাবে ধারণা করছে।
দুর্বৃত্তদের শাস্তি দাবি
কয়া কলেজের অধ্যক্ষ হারুণ-অর-রশিদ জানান, রাতের অন্ধকারে কে বা কারা ন্যক্কারজনক এ ঘটনা ঘটিয়েছে। ভাস্কর্য ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।
কুমারখালি থানার ওসি মজিবুর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, সংঘটিত অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ তদন্তে নেমেছে। যারাই এ ঘটনার সাথে জড়িত থাকুক কেন, তাদের কোনো রেহাই নেই। কুমারখালি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজীবুল ইসলাম খান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দুর্বৃত্তরা ভাস্কর্যটির কান ও চোয়ালের অংশবিশেষে ক্ষতিসাধন করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বুড়িবালামের লড়াইয়ে মৃত্যু বাঘা যতীনের
উল্লেখ্য, ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের যোদ্ধা বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় তথা বাঘা যতীন ১৮৭৯ সালের ৮ ডিসেম্বর কুমারখালি উপজেলার কয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ওড়িশার বুড়িবালাম নদীর তীরে ব্রিটিশের সঙ্গে গুলির লড়াইয়ে আহত হওয়ার পর ১৯১৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বালেশ্বরের হাসপাতালে তিনি মারা যান।

