জন্মজিত্ / সমীপ, করিমগঞ্জ (অসম): ‘অসম ভাষা গৌরব’ প্রকল্পের অধীনে আর্থিক অনুদান থেকে রাজ্যের বাঙালি সংগঠনগুলোকে রাজ্য সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে বঞ্চিত করেছে। শাসকদলের বিরুদ্ধে কংগ্রেসি বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থের এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনের প্রাক-মূহূর্তে বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক পরিমণ্ডল সরগরম হয়ে উঠেছে।
কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থের এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল করিমগঞ্জ বিজেপির নেতৃবৃন্দ সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে উত্থাপিত এই অভিযোগ ফুত্কারে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, সত্য না জেনে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ফায়দা নিতে কংগ্রেসি বিধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটাচ্ছেন। সরকারের পক্ষ থেকে ফলাও করে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হলেও, বরাকের একমাত্র বাঙালি সংগঠন ‘বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন’ এই প্রকল্পের সুবিধা লাভের জন্য কোনও আবেদনপত্র জমা দেয়নি। বিধায়ক কমলাক্ষ অযথা এনিয়ে নাটক করছেন। তবে বিষয়টি গোচরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বরাকবঙ্গকে এই প্রকল্পের আওতায় আনা হবে বলে কথা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল।
করিমগঞ্জ বিজেপির পক্ষ থেকে এই সাফাই দেওয়ার চব্বিশ ঘণ্টা পর পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ বলেন, আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, রাজ্য সরকার এই প্রকল্পের জন্য কোনও পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেনি। তাছাড়া ‘অসম ভাষা গৌরব’ প্রকল্পের অধীনে আর্থিক অনুদানপ্রাপ্ত রাজ্যের ২১টি সংগঠনের মধ্যে কোনও একটি সংগঠনও আবেদন করেনি। ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর গুয়াহাটিতে ব্রহ্মপুত্র গেস্ট হাউসে তাঁরা সরকারি আবাসে রাজ্যের ২২টি বিভিন্ন ভাষাভাষী সংগঠনকে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী একটি বৈঠক করেছিলেন। সেদিনের বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে এই সংগঠনগুলোকে নিজ নিজ ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও সাহিত্য চর্চার জন্য রাজ্য সরকার আর্থিক অনুদান দেবে। মুখ্যমন্ত্রীর সেদিনের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারেই ‘অসম ভাষা গৌরব’ প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন ভাষাভাষীর সংগঠনগুলোকে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এককালীন আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়েছে।
সেই প্রসঙ্গ টেনে কমলাক্ষ প্রশ্ন তুলেন, সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রী সত্যিকার অর্থে যদি বাঙালি দরদি হতেন, তা-হলে সেদিনের বৈঠকে কোনও বাঙালি সংগঠনকে আমন্ত্রণ জানালেন না কেন? কমলাক্ষ অভিযোগ করে বলেন, করিমগঞ্জ সহ বরাক বিজেপির নেতৃবৃন্দ বলছেন আমি মিথ্যা অপপ্রচার করছি। আসলে মেরুদণ্ডহীন করিমগঞ্জ বিজেপির বাঙালির স্বার্থে কথা বলার সত্সাহস নেই। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার দলীয় নেতাদের লিখিত স্ক্রিপ্ট পড়ে শুনানো করিমগঞ্জ বিজেপির অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সত্য জেনেও প্রতিবাদ করার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন তল্পিবাহক জেলা বিজেপির নেতারা। তাই এখন তাঁরা লজ্জায় শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন, অসেমে বসবাসরত বিভিন্ন ভাষিক সংখ্যালঘু যাঁদের জনসংখ্যা তিন-চার লক্ষ হবে, তাঁদের ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও সাহিত্য চর্চার জন্য বিজেপি সরকার আর্থিক অনুদান প্রদান করেছে। অথচ রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতি বাঙালির ভাগ্যে জুটেছে শুধু বঞ্চনা। প্রায় এক কোটির বেশি মানুষ বাংলায় কথা বলেন। সেই বাঙালির ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও সাহিত্য চর্চার জন্য সরকার কোনও গুরুত্বই দিল না, বলে বিস্ময় প্রকাশ করেন বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ। তিনি বলেন, এ থেকেই প্রমাণ হয়, বিজেপির বাঙালিপ্রীতি কতটুকু খাঁটি। আরও বলেন, করিমগঞ্জে প্রস্তাবিত মেডিক্যাল কলেজ, শিলচরে প্রস্তাবিত মিনি সচিবালয় এখন পর্যন্ত বিশবাঁও জলে। এ নিয়েও প্রদেশ বিজেপির কাছে মুখ খুলে কিছু বলার দম নেই বরাক বিজেপির। বন্ধ পাঁচগ্রাম কাগজ কল পুনরুজ্জীবিত করা হবে, ২০১৬ সালে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। কিন্তু এক্ষেত্রেও চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে মিথ্যাবাদী বিজেপি। বরাক সহ সমগ্র রাজ্যের বঞ্চিত বাঙালি মানুষ বিজেপি সরকারের এই বিরোধী নীতির যোগ্য জবাব দিতে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকেই বেছে নেবেন বলে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ।
মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, প্রতারণা ও বিভাজনের রাজনীতি করে বেশিদিন মসনদে থাকা যায় না, এই বলেও বিজেপিকে হুঁশিয়ার করে দেন কমলাক্ষ। উজান অসম এবং নিম্ন অসমে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে নিজেদের অস্তিত্ব তলানিতে এসে ঠেকেছে, বুঝতে পেরে প্রদেশ বিজেপি নেতারা বরাক উপত্যকার বাঙালিদের টার্গেট করেছেন। বরাকের সহজ-সরল বাঙালিদের মন গলাতে এখন থেকেই বিজেপি নেতারা নানা ফন্দি আঁটতে শুরু করে দিয়েছেন। মিথ্যাবাদী ও প্রতিশ্রতি ভঙ্গকারী বিজেপি নেতাদের কোনও প্রলোভনে পা না দিতে বরাকবাসীর প্রতি আহ্বান জানান বিধায়ক কমলাক্ষ। এখানকার ভাষিক সংখ্যালঘু ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে রাজনৈতিক মুনাফা লুটাই হলো বিজেপি দলের মূল উদ্দেশ্য। উন্নয়ন তো শুধু বিজেপি নেতাদের মুখেই শোভা পাচ্ছে। বাস্তবে কংগ্রেস আমলের প্রকল্পগুলোর শুধু নাম পরিবর্তন করে নিজেদের বলে প্রচার করাই হচ্ছে ভাওতাবাজ বিজেপি দলের কাজ। @হিন্দুস্থান সমাচার

