শিরোনাম
বৃহঃ. ফেব্রু ৫, ২০২৬

কুয়েতে দণ্ডিত পাপুল বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সদস্য পদ হারালেন

হাবিবুর রহমান, ঢাকা: লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের সংসদ সদস্য পদ বাতিল করা হয়েছে। সোমবার সংসদ সচিবালয় এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। সিনিয়র সচিব ড. জাফর আহমেদ খান স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, কুয়েতে ফৌজদারি অপরাধে ৪ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ায় লক্ষ্মীপুর-২ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য শহিদ ইসলাম বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য পদ থাকার যোগ্য নয়। সেই কারণে সংবিধানের ৬৭ (১) (ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রায় ঘোষণার তারিখ ২৮ জানুয়ারি হতে তার আসন শূন্য হয়েছে। মানব ও অর্থপাচারের দায়ে কুয়েতের আদালতের রায়ে দণ্ডিত হওয়ায় সংসদ সদস্য পদ হারালেন তিনি। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি প্রথম এমপি যিনি বিদেশে আটক ও ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পর পদ হারালেন।

জানা গেছে, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বিষয়টি নিয়ে সংসদ সচিবালয়ে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আলোচনা করেন। এসময় কুয়েত থেকে পাঠানো পাপুলের মামলার রায়ের কপি পর্যালোচনা করা হয়। আরবি ও ইংরেজিতে লেখা ৬১ পৃষ্ঠার রায়ের কপি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের স্পিকারের দফতরে ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। মাঝখানে তিন দিনের সরকারি ছুটির পর প্রথম কর্মদিবসেই স্পিকার এ বিষয়টি নিয়ে সংসদ সচিবালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এখানেই বহুল আলোচিত এবং বিতর্কিত কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের সদস্য পদ বাতিলের চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। সংবিধান, কার্যপ্রণালি বিধি ও আইন অনুযায়ী এখন তার আর সংসদ সদস্য পদ নেই। অর্থ ও মানবপাচারের মামলায় গত ২৮ জানুয়ারি পাপুলকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন কুয়েতের আদালত। পাশাপাশি তাকে ১৯ লাখ কুয়েতি দিনার বা ৫৩ কোটি টাকা জরিমানাও করা হয়। গত বছরের ৬ জুন রাতে কুয়েতের বাসা থেকে আটক করা হয় পাপুলকে। আটকের সাড়ে ৭ মাস আর বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর সাড়ে তিন মাসের মাথায় দণ্ডিত হন তিনি।

সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে-কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না, যদি-(ক) কোনো উপযুক্ত আদালত তাকে অপ্রকৃতিস্থ ঘোষণা করে,(খ) তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর দায় হতে অব্যাহতি না পেয়ে থাকেন, (গ) তিনি যদি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন, (ঘ) তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং মুক্তির পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হয়ে থাকে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে মুক্তি পাওয়ার পর পাঁচ বছর পর্যন্ত তিনি আর সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হন না। স্বাধীনার পর বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সংসদ সদস্যের বিদেশে আটক ও ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পর পদ হারানোর ঘটনা এটিই প্রথম। নির্বাচন কমিশন সচিব হুমায়ুন কবীর খোন্দকার গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় বলেন, আসন শূন্য ঘোষণা সংক্রান্ত গেজেটর কপি আমরা হাতে পেয়েছি। পরবর্তী করনীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে তা কমিশনের কাছে উপস্থাপন করা হবে। আর সাংবিধানিকভাবে পাপুলের আসন শূন্য ঘোষণার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সেখানে নির্বাচনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম জানান। তিনি বলেন, সংসদ সচিবালয়ের চিঠি কমিশন সভায় উপস্থাপনের পর সার্বিক বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করব। নির্বাচন করতে ৪০-৪৫ দিন সময় হাতে লাগবে আমাদের। ২ মার্চ হালনাগাদের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে। এরপরই তফসিল ঘোষণা করা হবে।

সাধারণ শ্রমিক হিসাবে কুয়েত গিয়ে বিশাল সাম্রাজ্য গড়া পাপুল ২০১৮ সালে লক্ষ্মীপুর-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে ওই আসনটি আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু জাতীয় পার্টির প্রার্থী শেষ মুহূর্তে ভোট থেকে সরে দাঁড়ালে ‘বিএনপি ঠেকানোর’ কথা বলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ পাপুলের পক্ষে কাজ করে বলে দলটির নেতাদের ভাষ্য। পাপুল নিজে এমপি হওয়ার পর স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের কোটায় পাওয়া সংরক্ষিত একটি আসনে তার স্ত্রী সেলিনা ইসলামকে এমপি করে আনেন। প্রবাসী উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠিত এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন পাপুল, যেখানে তার বড় অঙ্কের শেয়ার রয়েছে। পাপুলের মালিকানাধীন মারাফি কুয়েতিয়া গ্রুপে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি কাজ করেন বলে কুয়েতে বাংলাদেশি কমিউনিটির ধারণা। পাচারের শিকার পাঁচ বাংলাদেশির অভিযোগের ভিত্তিতে গত জুনে গ্রেফতারের পর পাপুলের বিরুদ্ধে মানবপাচার, অর্থপাচার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের শোষণের অভিযোগ আনা হয়। পরে তদন্ত করে পাপুলসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, মানবপাচার, ঘুষ লেনদেন ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ভঙ্গের অভিযোগ আনে কুয়েতের পাবলিক প্রসিকিউশন। অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর পাপুলের মামলায় আনুষ্ঠানিক বিচার কাজ শুরু হয়। জানুয়ারিতে আদালত যে রায় ঘোষণা করে, তাতে পাপুলের কাজে সহায়তাকারী হিসাবে কুয়েতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা মাজেন আল জারাহ এবং কুয়েতি দুই কর্মকর্তাকেও চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ওই দুই কর্মকর্তা ছিলেন পাপুলের বিভিন্ন কাজের মধ্যস্থতাকারী এবং এজেন্ট। পাপুলসহ দণ্ডিত প্রত্যেককে ১৯ লাখ কুয়েতি দিনার অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে ওই রায়ে। বাংলাদেশে দুদকও পাপুল, তার স্ত্রী, শ্যালিকা ও মেয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। পাপুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম ও মেয়ে ওয়াফা ইসলাম সেই মামলায় জামিনে আছেন।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *