শিরোনাম
শুক্র. জানু ৩০, ২০২৬

করিমগঞ্জের ইভিএম কাণ্ডে বরখাস্ত প্রিসাইডিং অফিসার সহ চার, রাতাবাড়ির একটি কেন্দ্রে পুনর্ভোট

জন্মজিত্‍ / সমীপ, করিমগঞ্জ (অসম): আদর্শ নির্বাচনি আচরণ বিধির অধীনে ভেহিকল প্রটোকল ভঙ্গের অপরাধে প্রিসাইডিং অফিসার সহ অন্য তিন কর্মীর ঘাড়ে সাসপেনশনের কোপ নেমে এসেছে। নিজেদের নির্বুদ্ধিতার বদৌলতে যান বিধি ভঙ্গ করার দায়ে নির্বাচন কমিশনের রোষানলে পড়েছেন ১ নম্বর রাতাবাড়ি বিধানসভা ক্ষেত্র (তফশিলি জাতি সংরক্ষিত) ক্ষেত্রের ১৪৯ নম্বর ইন্দিরা মধ্যবঙ্গ বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার সহ অন্য তিন ভোট কর্মী। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্র পুনর্নিবাচন হবে বলে জানিয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। তবে পুনর্নিবাচনের দিনক্ষণ এখনও ঘোষণা করা হয়নি। আজ শুক্রবার এক নির্দেশিকা জারি করে প্রিসাইডিং অফিসার এবং তিন ভোটকর্মীর বিরুদ্ধে আদর্শ নির্বাচনি আচরণ বিধির অধীনে ভেহিকল প্রটোকল ভঙ্গের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তবে তাঁদের কারণ দর্শাও নোটিশও পাঠানো হয়েছে। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করে এই খবর জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের আন্ডার সেক্রেটারি পবন দিওয়ান।

গতরাল ১ এপ্রিল বৃহস্পতিবার রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটের দিন সমগ্র করিমগঞ্জ জেলার ভোট পর্ব অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হলেও, দিনের শেষে হঠাত্‍ করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে শহরতলি কানিশাইল এলাকা। অনভিপ্রেত একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশকে শূন্যে গুলি ছোঁড়া সহ লাঠি চার্জ করতে হয়েছ। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে প্রান্তিক শহর করিমগঞ্জ সহ সমগ্র জেলায়।

ঘটনা সম্পর্কে জারিকৃত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে নির্বাচন কমিশনের আন্ডার সেক্রেটারি দিওয়ান জানান, ২ নম্বর পাথারকান্দি আসনের বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু পালের (বিজেপি প্রার্থী) গাড়িতে ইভিএম মজুতকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, করিমগঞ্জ জেলার রাতাবাড়ি বিধানসভা ক্ষেত্রের অত্যন্ত প্রত্যন্ত এলাকার ১৪৯ নম্বর ইন্দিরা মধ্যবঙ্গ বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার সহ অন্য তিন ভোট কর্মী ও নিরাপত্তারক্ষীরা সন্ধ্যা ছয়টায় ভোটগ্রহণ পর্ব শেষ হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী জেলা সদরের স্ট্রংরুমের উদ্দেশ্যে ফিরছিলেন। কিন্তু নিলামবাজারের লালপুল এলাকায় তাঁদের সরকারি গাড়িটি বিকল হয়ে গেলে নিরাপত্তাজনিত কারণে ব্যক্তিগত গাড়ির সহায় নিয়েছিলেন। কিন্তু ছয় সদস্যের নিৰ্বাচনি দলটি যে গাড়ির সহায়তা নিয়েছিলেন তা পাথারকান্দির বিজেপি বিধায়ক তথা এবারের দলীয় প্রার্থী কৃষ্ণেন্দু পালের পত্নী মধুমিতা পালের নামে রেজিস্ট্রিকৃত তা তাঁদের জানা ছিল না।

ইত্যবসরে রাত আনুমানিক সাড়ে দশটা নাগাদ করিমগঞ্জের প্রবেশদ্বার কানিশাইল এলাকার কতিপয় জনতা বলেরো গাড়ির ভিতরে ইভিএম টেম্পারিং করা হচ্ছে অভিযোগ তুলে অতর্কিত হামলা চালায়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয় বিশাল পুলিশ বাহিনী। ততক্ষণে কানিশাইল এলাকার কয়েকশো জনতা জাতীয় সড়কের উপর তাণ্ডব শুরু করে দেন। পাথরবৃষ্টি ছাড়াও লাঠিসোঁটা নিয়ে উত্তেজিত জনতা বলেরো গাড়িটিতে ব্যাপক ভাঙচুর চালাতে শুরু করে।

খবর পেয়ে জেলা নির্বাচন আধিকারিক এবং পুলিশ সুপার বিশাল নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শূন্যে গুলি ছোঁড়া হয়েছে। এ নিৰ্বাচন কমিশন প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্পষ্টীকরণ দিয়ে গিয়ে বলেছে, ভোটকেন্দ্ৰটির দায়িত্বপ্রাপ্ত ফার্স্ট পোলিং আধিকারিক ঘটনার সময় থেকে নিখোঁজ। তাঁকে খুঁজে বের করতে গোটা রাত প্রশাসন অভিযান চালিয়েছিল। পাওয়া যায়নি। এজন্য স্পষ্টীকরণ প্ৰকাশ করতে বিলম্ব হয়েছে।

এদিকে অন্য সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ জনতাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে বারবার ব্যর্থ হয়ে এক সময় লাঠিচার্জ করে। এতেও পরিস্থিতি শান্ত না হওয়ায় পুলিশ শূন্যে দুই রাউন্ড গুলি ছুঁড়তে বাধ্য হয়। এর পর পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। জানা গেছে, পাথারকান্দির বিজেপি প্রার্থী তথা বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু পালের বড় ভাই কল্যাণ পাল এদিনের ভোট পর্ব শেষ হ‌ওয়ার পর এএস ১০ বি ০০২২ নম্বরের বলেরো গাড়িটি নিয়ে পাথারকান্দি থেকে করিমগঞ্জে তাঁর বাড়ির উদ্দেশ্যে ফিরছিলেন। নিলামবাজার থানা এলাকার লালপুল এলাকায় পৌঁছার পর কল্যাণ পাল দেখতে পান জাতীয় সড়কের পাশে ভোট ফেরত পোলিং স্টাফের একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। কল্যাণ পাল কৌতূহলবশত গাড়িটি এখানে দাঁড়িয়ে থাকার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। ঘড়িতে তখন রাত প্রায় সাড়ে আটটা। প্রত্যুত্তরে পোলিং স্টাফরা জানান, তাঁরা রাতাবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের কোনও এক ভোট কেন্দ্রের কর্মী। ইভিএম সহ আনুষঙ্গিক সামগ্রীগুলো নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী করিমগঞ্জের স্ট্রং রুমের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু মাঝেপথে তাঁদের গাড়ি বিকল হয়ে যাওয়ায় তাঁরা ফ্যাসাদে পড়েছেন। প্রায় ঘণ্টা খানেক হয়ে গেছে, তাঁরা এখানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। তাঁদের নিয়ে যাওয়ার কথা জানানো হলেও সেই সময় পর্যন্ত তাঁরা ঝুঁকি নিয়ে ৮ নম্বর জাতীয় সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

অগত্যা কৃষ্ণেন্দু পালের ভাই কল্যাণ পাল তাঁদের জিজ্ঞাসা করেন, আপনারা কয়জন স্টাফ আছেন? আমি গাড়িতে একা, যদি আপনাদের কোনও অসুবিধা না হয়, তা-হলে আমি আপনাদের করিমগঞ্জ কলেজ পর্যন্ত (স্ট্রংরুম) পৌঁছে দিতে পারি। এতে রাজি হয়ে পোলিং স্টাফরা ইভিএম মেশিন সহ আনুষঙ্গিক সামগ্রী নিয়ে গাড়িতে চড়েন। গাড়িটি যথারীতি করিমগঞ্জের উদ্দেশ্যে র‌ওয়ানা দেয়। কিন্তু বিধি বাম। কানিশাইল এলাকায় পৌঁছার পর জ্যামে ফেঁসে যায় বলেরো গাড়িটি। এই এলাকায়‌ই রয়েছে কল্যাণ পাল এবং কৃষ্ণেন্দু পালের বাড়ি। তাই স্থানীয় লোকদের‌ও জানা ছিল এএস ১০ বি ০০২২ নম্বরের বলেরো গাড়িটি কৃষ্ণেন্দুর। সড়কের ওপর জ্যাম দেখে কল্যাণ গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেঁটে, কোথায় জ্যাম লেগেছে দেখতে এগিয়ে যান।

এদিকে সুযোগ বুঝে একশ্রেণির সুযোগসন্ধানী উশৃঙ্খল জনতা পোলিং স্টাফের উপর হামলা চালায়। প্রায় ৫০/৬০ জনের উশৃঙ্খল জনতা গাড়ির কাচ গলিয়ে ভিতরে ইভিএম দেখে হল্লা-চিত্‍কার শুরু করেন, কৃষ্ণেন্দু পাল তাঁর গাড়িতে করে ইভিএম নিয়ে যাচ্ছেন। স্বাভাবিক ভাবেই একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন গাড়িতে ইভিএম দেখতে পেয়ে স্থানীয় জনতা উত্তেজিত হয়ে উঠেন। পোলিং স্টাফদের কোনও কথা না শুনে উত্তেজিত জনতা তাঁদের উপর হামলা চালায়। গাড়িতে ভাঙচুর করা হয়।

অন্যদিকে কৃষ্ণেন্দু পাল এক প্রতিক্রিয়ায় জানান, বিজেপির জয় সুনিশ্চিত বুঝতে পেরে, বিরোধীরা হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন। আর এই অবাঞ্ছিত ঘটনাটি এই হতাশার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়। তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র চালাতে একটি চক্র বেশ কিছু দিন থেকেই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। সুযোগ পেয়েই এই চক্রটি তাঁদের পরিকল্পিত রাজনৈতিক চক্রান্ত শুরু করে দেয়। এতে কোনওভাবেই চক্রান্তকারী দলটি সফল হতে পারবে না বলে দাবি করেন বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু পাল। তবে কৃষ্ণেন্দু এ-ও বলেন, পোলিং স্টাফদের ইভিএম সহ ব্যক্তি মালিকানাধীন গাড়িতে উঠানো তাঁর বড় ভাই কল্যাণ পালের মোটেই উচিত হয়নি। নিলামবাজারের পার্শ্ববর্তী যে জায়গায় পোলিং স্টাফদের সরকারি গাড়ি অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে বিকল হয়েছিল, সেই স্থান থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে রয়েছে নিলামবাজার থানা। পরিস্থিতি বিবেচনায় ভাই কল্যাণ পালের পুলিশি সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন ছিল বলে জানান কৃষ্ণেন্দু। এছাড়া নির্বাচনি আচরণ বিধির অধীনে ভেহিকল প্রটোকল ভঙ্গ করে ব্যক্তি মালিকানাধীন গাড়ির সাহায্য নেওয়াও উচিত হয়নি প্রিসাইডিং অফিসারের। এই মন্তব্য‌ও করেন বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু পাল।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *