শিরোনাম
শুক্র. ফেব্রু ২০, ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন কেন আমাদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ?

।। জাকির তালুকদার ।।

মুসলিম ও হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা সরাসরি একে অপরকে বাড়িয়ে তোলে। সীমান্তের কাঁটাতার সাম্প্রদায়িকতাকে রুখতে বিন্দুমাত্র কার্যকর নয়।

বাংলাদেশে অনেকগুলো কারণে সাম্প্রদায়িকতা এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাড়বাড়ন্ত। রাষ্ট্র কখনো নিশ্চুপে সেটি বাড়তে দিচ্ছে, কখনো পরোক্ষ মদদ দিচ্ছে নানা রকম সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে। ফলে সাম্প্রদায়িকতা প্রতিনিয়ত আঘাত হানছে আমাদের সমাজের প্রগতিশীলদের ওপর, প্রগতিশীল সংস্কৃতির ওপর, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর। সেটি আরও বেড়ে যাবে পশ্চিমবঙ্গে যদি বিজেপি ক্ষমতায় আসে। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার উদাহরণগুলোকে নিজেদের নির্বাচনী প্রচারে সরাসরি কাজে লাগাচ্ছে বিজেপি। ২০০১ সালের পূর্ণিমা ধর্ষণ থেকে শুরু করে সেই ১৯৪৬ সালের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা পর্যন্ত এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির অন্যতম প্রচারণা-হাতিয়ার। অর্থাৎ বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষকেও সাম্প্রদায়িকতায় উদ্বুদ্ধ করছে বিজেপি। আগেই কাশ্মীরের জনগণের অধিকার কেড়ে নেওয়া, আসামের এনআরসি, মুসলিম বালিকাকে বিজেপি-নেতার ধর্ষণ বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পালে বাড়তি হাওয়া লাগিয়েছে। এবারের নির্বাচনে বিজেপি সরাসরি বাংলাদেশ-বিরোধিতাকে পুঁজি করেছে।

অমিত শাহ কিছুদিন আগে বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখল করতে পারলে তারা বাংলাদেশ থেকে একটি পাখিও ঢুকতে দেবেন না সেখানে। যদি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারে, তাহলে তার প্রতিক্রিয়ায়, এবং নানা ঘাত-প্রতিঘাতে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষবাষ্প যে অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়বে, তা বোঝার জন্য ভবিষ্যদ্বাণীর প্রয়োজন হয় না। সে কারণে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল চিন্তার মানুষগুলো অনেকটাই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে খেয়াল করছে সেখানকার বিধানসভা নির্বাচনের গতি-প্রকৃতি। বলতে পারছে না, একটি ভিন্ন দেশের একটি প্রদেশে যে ক্ষমতায় আসে আসুক তাতে আমাদের কী! কেন্দ্রে তো বিজেপি ক্ষমতায় আছেই। তাহলে একটি প্রদেশ নিয়ে এত চিন্তা কিসের? চিন্তা এই কারণে যে সমগ্র ভারতের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের সাথে আমাদের যোগাযোগ এবং আদান-প্রদান সবচাইতে বেশি। সেই আদান-প্রদান ভাবের, চিন্তার, সখ্যের, সাহিত্যের, এমনকি ঈদ-পূজার বাজারেও। তাই সেখানে বিজেপি ক্ষমতায় আসছে কি না, তা নিয়ে আমাদের যথেষ্ট মাথাব্যথা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে মোদির আগমনের পেছনে যে ওড়াকান্দিতে গিয়ে মতুয়া সম্প্রদায়ের মন জয় করার উদ্দেশ্যও ছিল, সেটি বুঝতে এই দেশের মানুষের বেশি বেগ পেতে হয়নি। তবে এই বুঝতে পারাটা মানুষের আতঙ্ক বাড়িয়েছে বৈ কমায়নি।

পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস অক্লেশে বিজেপিকে ঠেকিয়ে দেবে, সেই বিশ্বাসে চিড় ধরেছে ২০১৯ সালের লোকসভার নির্বাচনে। অবিশ্বাস্য রকমের ভালো ফল করেছে সেখানে বিজেপি। ৪২টির মধ্যে ১৮টি আসন দখল করে নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ অসাম্প্রদায়িকতার শক্ত ঘাঁটি এবং ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী বলে যে সান্ত্বনাটুকু ছিল, তা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। সেখানে এখন পথে-ঘাটে মানুষের মুখে মুখে জয় শ্রীরাম ধ্বনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দলকে এখন আর বিজেপি ঠেকানোর মতো যথেষ্ট মনে হচ্ছে না। একদিকে বিজেপির রয়েছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। আম্বানি, আদানিদের টাকা পুরোপুরি কাজ করছে বিজেপির পক্ষে। সেই সাথে আছে কেন্দ্রীয় সরকার হিসেবে বিজেপির ক্ষমতার প্রয়োগ। অবস্থা এমন যে বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগেও বিজেপি টাকা এবং ক্ষমতা দিয়ে কিনে নিয়েছে তৃণমূলের অনেক হেভিওয়েট নেতাকে। এমনকি মানুষের মনে এই ভয়ও আছে যে যারা তৃণমূলের হয়ে নির্বাচন করছেন তাদের অনেকেই ভোটে জেতার পরে বিজেপিতে যোগ দিতে পারেন। স্বয়ং মমতা এই আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। তৃণমূলের মুখে বাঙালিত্বের স্লোগান, কিন্তু তাদের অবস্থা অনেকটাই বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের মতো। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্লোগান দিয়ে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ১২ বছর ধরে ক্ষমতায়। দলের এবং সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ও মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতির অভিযোগ, রটেছে দুর্নাম। তাই দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন দেওয়ারও সাহস পাচ্ছেন না তারা, নির্ঘাত হেরে যাওয়ার ভয়ে। তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীরা গত ১০ বছরে এত বেশি দুর্নীতি করেছেন যে তাদের নামই হয়ে গেছে কাটমানি আর তোলাবাজির সরকার। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস এবং বামফ্রন্ট রাজনীতিবিদদের একটি পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও সাধারণ জীবনযাপনের ঐতিহ্য ছিল। জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যরা মুখ্যমন্ত্রী হয়েও দুই কামরার ফ্ল্যাটেই বসবাস করেছেন। মানুষ নেতাদের এভাবে দেখতেই অভ্যস্ত ছিল। তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীরা সেই ঐতিহ্য উল্টে দিয়েছেন। বাংলাদেশের নেতা-মন্ত্রীদের মতোই প্রাসাদোপম বাড়ি এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন তাদের। দলে ক্যাডার বাহিনী বা গুন্ডা পোষার ব্যাপারটি আগেও ছিল। তবে তৃণমূলের সময়ে সেটি সাংগঠনিক রূপ পেয়ে গেছে অনানুষ্ঠানিকভাবে।

বুদ্ধিজীবী, লেখক, কবি, অভিনেতাদের ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিল তৃণমূল। এখন সেখানে আছেন কেবল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সুবিধাভোগীরা। চলচ্চিত্র জগৎ থেকে অনেককে নিয়ে এসে বিধায়ক বানিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তারা নির্বাচিত হওয়ার পরে আর এলাকায় বা জনগণের কাছে যাননি। এই সব বিভিন্ন কারণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পুরোটাই পরিচালনা করেছেন প্রশাসন-আমলাদের দ্বারা। এর ফলে একদিকে যেমন দলের সাথে সাধারণ মানুষের দূরত্ব বেড়ে গেছে, একইভাবে দলের সাংগঠনিক কাজকর্মে ভাটা পড়েছে খুব। অনেক ধরনের অনুদান কার্ড চালু করেছেন মমতা। কিন্তু বিরোধীরা দাবি করেন, এসব কার্ডের মাধ্যমে মানুষেকে ভিক্ষুকে পরিণত করেছেন মমতা। কিন্তু মানুষ তো অনুদান নয়, চায় চাকরি। সেই চাকরির সুযোগ ও ক্ষেত্র তৈরির কাজে পুরোপুরি ব্যর্থ মমতার ১০ বছরের সরকার। মমতা এবং তৃণমূলের ক্ষমতায় টিকে থাকার অন্যতম ফ্যাক্টর ছিল সংখ্যালঘু মুসলমানদের ভোটব্যাংক। সেই ব্যাংকে ব্যাপক ফাটল ধরেছে ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট গঠনের কারণে। ভারতে আজমীর শরিফের পর মুসলিমদের দ্বিতীয় বৃহত্তম তীর্থকেন্দ্র ফুরফুরা শরিফ। কোটি মানুষ সেই দরবারের মুরিদ। এই মুরিদরা পীরজাদাদের ভালোবাসেন প্রাণ দিয়ে।

আব্বাস এখন মমতার বিপক্ষে। তিনি দাবি করছেন, মমতা পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু-মুসলিম বিভেদ সৃষ্টি করেছেন তীব্রভাবে। তিনি মসজিদের ইমামদের মাসে আড়াই হাজার টাকা ভাতা দিয়েছেন। এটি সব হিন্দুকে ক্ষুব্ধ করেছে। অথচ মসজিদের ইমামরা কেউ ভাতা চাননি বা চান না। তারা ভাতার পরিবর্তে চান তাদের ঘরে বিএ বা এমএ পাস করে বসে থাকা বেকার সন্তানটির চাকরি। অথচ পশ্চিমবঙ্গে মমতার আমলে সরকারি বা আধা সরকারি চাকরিতে নিয়োগ বন্ধ বেশ কয়েক বছর ধরে। অন্য মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের মতো আব্বাস সিদ্দিকী কেবল মুসলমানদের স্বার্থ নিয়ে কথ বলেন না। একই সাথে তিনি পিছিয়ে থাকা আদিবাসী, দলিত, মতুয়া, গরিব হিন্দুর স্বার্থ নিয়ে কথা বলেন। তার দল ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের সভাপতি একজন আদিবাসী। সাধারণ সম্পাদক একজন নিম্নবর্ণের হিন্দু। আব্বাস সিদ্দিকীর মধ্যে ভারতের প্রগতিশীল সমাজের একটি অংশ মওলানা ভাসানীর ছায়া দেখতে পাচ্ছেন। এই দল কংগ্রেস এবং বামফ্রন্টের সাথে যৌথভাবে সংযুক্ত মোর্চা নামে বিধানসভার নির্বাচনে লড়াই করছে।

এবারে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে প্রায় হারিয়ে যেতে বসা বামফ্রন্টের ব্যাপকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো। দুই মাস আগেও বামদের নিয়ে কোনো আলোচনা ছিল না মূলধারার কোনো গণমাধ্যমে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্রিগেডের বিশাল সমাবেশের মাধ্যমে নিজেদের গুছিয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিয়েছিল বামফ্রন্ট। কোটি কোটি টাকা খরচ এবং রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের মেশিনারি ব্যবহার করার পরও বিজেপি এবং তৃণমূলের সমাবেশ ছিল বামেদের বা সংযুক্ত মোর্চার সমাবেশের তুলনায় অনেক ছোট। ২০১১ সালে ক্ষমতা হারানোর পরে বেশির ভাগ অঞ্চল থেকে বামফ্রন্টের সব দলের অফিস উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, অথবা সেগুলো চলে গিয়েছিল তৃণমূলের দখলে। বামেরা সংগঠিত হয়ে সেই সব অফিস ফের নিজেদের দখলে নিয়েছে। অনেক জেলাতে সিপিআইএম-কে ১০ দশ বছরে কোনো মিছিল বা সভা করতে দেওয়া হয়নি।

যে নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরকে ধরা হয় বামশাসনের অবসানের সূত্রবিন্দু হিসেবে, সেখানে এলাকাছাড়া করা হয়েছিল হাজার হাজার বামকর্মী ও পরিবারকে। সেই নন্দীগ্রামে এবার শুধু চমক নয়, নিজেদের সাংগঠনিক ক্ষমতা আর আদর্শবাদের সাহসিকতা দেখিয়ে দিয়েছে বামেরা মীনাক্ষী মুখার্জীর মতো আনকোরা এক যুবনেত্রীর নেতৃত্বে। মীনাক্ষী সেখানে ভোটে জিতবেন কি না তা ২ মে-ও আগে জানা যাবে না। তবে তিনি যে সর্বস্তরের মানুষের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছেন, তার বিরোধীরা পর্যন্ত সেকথা স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন। মীনাক্ষীর মতোই শতরূপ, প্রতীক, পৃথা, দীপ্সিতাসহ প্রায় এক ডজন তরুণ নেতৃত্বকে এবার ভোটের ময়দানে এনেছে বামফ্রন্ট। তারা প্রত্যেকেই অসাধারণ দৃঢ়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং মানুষের মনজয়ের কারিশমা দেখিয়ে চলেছেন। পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র বামেদের সাংগঠনিক শক্তির ভিত্তি পুনঃপ্রোথিত হচ্ছে। মূলধারার মিডিয়া এবং প্রচারযন্ত্র তাদের কোনো খবর মানুষকে জানাচ্ছে না। সেই প্রতিকূলতা তারা মোকাবিলা করছেন পায়ে হেঁটে প্রতিটি ভোটারের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে। এখন সংযুক্ত মোর্চা ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। মিডিয়াও সে কথা আর উড়িয়ে দিতে পারছে না।

বাংলাদেশের বাম-প্রগতিশীলরা যদি পশ্চিমবঙ্গের বাম নেতা ও কর্মীদের কাছ থেকে এই শিক্ষাটা নিতে পারে, নিজেরা সেভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে সেটাই হবে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া একমাত্র লাভজনক শিক্ষা।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *