শিরোনাম
শনি. জানু ৩, ২০২৬

কে লিখেছে বইটা, জরুরি নয় অইটা?

গোয়েন্দা কাহিনী মাসুদ রানা সিরিজের বইয়ের লেখক নিয়ে সম্প্রতি বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পাঠকরা এ সিরিজের লেখক হিসেবে এতদিন কাজী আনোয়ার হোসেন জানলেও আড়াই শতাধিক বই আবদুল হাকিম লিখেছেন বলে দাবি করেছেন। বিষয়টি গড়িয়েছে কপিরাইট অফিস পর্যন্ত।

আবদুল হাকিমের অভিযোগ, তার লেখা বই একের পর এক মুদ্রণ প্রকাশিত হলেও প্রাপ্য রয়্যালিটি তাকে দেয়া হয়নি। সেকারণেই কপিরাইট অফিসের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি।

‘মাসুদ রানা’ সিরিজ কাজী আনোয়ার হোসেন লেখা শুরু করলেও সিরিজের আড়াই শতাধিক বই লিখেছেন শেখ আবদুল হাকিম। পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তার কাছ থেকে লেখা নিয়ে কাজী আনোয়ার হোসেন নিজের নামে প্রকাশ করতেন বলে জানিয়েছে কপিরাইট অফিস।

গত বছর জুলাইয়ে ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের ২৬০টি ও ‘কুয়াশা’ সিরিজের ৫০টি বইয়ের লেখক হিসেবে মালিকানা স্বত্ব দাবি করে কাজী আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে কপিরাইট আইনের ৭১ ও ৮৯ ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ দাখিল করেছিলেন শেখ আবদুল হাকিম।

তিন দফা শুনানি, দুই পক্ষের যুক্তি-পাল্টা যুক্তি ও তৃতীয় পক্ষের বক্তব্যের আলোকে রোববার কপিরাইট অফিসের এক রায়ে বলা হয়েছে, সেবা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী কাজী আনোয়ার হোসেন কপিরাইট আইনের ৭১ ও ৮৯ ধারা লঙ্ঘন করেছেন।

বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রবাসী ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটনও এ প্রেক্ষিতে তার ফেসবুক পেইজে একটি দীর্ঘ ছড়া লিখেছেন। পাঠকদের জন্য ছড়াটি প্রকাশ করা হলো

কে লিখেছে বইটা? জরুরি নয় অইটা?

লুৎফর রহমান রিটন

[মাসুদ রানার স্রষ্টা প্রিয় লেখক কাজী আনোয়ার হোসেন এবং লেখক অনুবাদক শেখ আবদুল হাকিমের সাম্প্রতিক দুঃখজনক ঘটনাবলির প্রেক্ষিতে]

কাজী আনোয়ার হোসেন >

আমার আছে আইডিয়া আর তোমার লেখার হাত

দু’জন মিলে গড়বো একটা সুখের ‘ইমারাত’।

লিখবে তুমি পাবে টাকা ছাপবো আমি বইপ্রচ্ছদে নাম শুধুই আমার। চলবে না হইচই!

বাংলাদেশের বৃদ্ধ-যুবক-কিশোর সবার জানা

আমিই হচ্ছি স্রষ্টা রানার, আমিই মাসুদ রানা।

চরিত্ররা আমার তৈরি বিকাশ আমার হাতে

ক্রাফটিঙ-এ তোমরা খানিক হাত লাগালে তাতে।

ভিনদেশী বই থ্রিলার বাছাই এবং সম্পাদনা

সব করেছি একক হাতেই বুঝতে কি পারছ না!

কি লিখবে কি লিখবে না তা ব্রিফ করেছি নিজে

অলরাউন্ডার সুনাম নিয়েই টিকেছিলাম ক্রিজে।

তুমিও ছিলে আমার গড়া অনুবাদের টিমে

ভাগ বসাতে চাইছো এখন মাখন-রুটি-ক্রিমে!

গল্পগুলো মৌলিক নয় ইধার-উধার করাকোন মুখে চাও কৃতিত্ব তার? হায় দ্বিধা হও ধরা…

ডজন খানেক ‘মাসুদ রানা’ তোমরা আসার আগে

লিখেছিলাম একাই আমি, ভাবতে ভালো লাগে।

রানা যখন জনপ্রিয় সেবার প্রিয় বই

তোমরা তখন কেউ ছিলে না, তোমরা ছিলে কই?

প্রথম প্রথম একলা একাই অনুবাদে নামি

পাঠকপ্রিয় মাসুদ রানার নেপথ্যে এই আমি।

কাজীর নামটা ব্রান্ডনেম ভাই ব্যবসাতে তাই জপিতোমার নামে ছাপলে রানা চলতো কয়েক কপি!

তুমি হচ্ছো গোস্ট রাইটার অর্থাৎ কী না ভূত

ভূতরা থাকে অন্ধকারেই আলোতে অচ্ছুৎ।

মাসে মাসে মাইনে দিলাম। (চুকেই গ্যাছে ল্যাঠা!)কপিরাইটের দাবি এখন করছো মামুর ব্যাটা?

শেখ আবদুল হাকিম >

দেবার কথা অনেক বেশি কিন্তু দিলে কম

ঠিক করেছি ঠকবো না আর মানবো না একদম।

তুমি আমার দারিদ্র্যকে বানিয়েছিলে মইআমি লিখলাম, তোমার নামেই ছাপলে তুমি বই।

রা করিনি কারণ আমার দারিদ্র্য সংকটে–

সেই টাকাটাই বাঁচিয়েছিলো, বলছি অকপটে।

নামমাত্র টাকায় আমায় কিনে নিয়েছিলে

প্রাপ্য পুরো দাওনি কেনো? অল্প কেনো দিলে!

শয়ে শয়ে বই লিখেছি সুদীর্ঘ বৎসরে…প্রাপ্য টাকা জমতে জমতে এখন কোটির ঘরে।

তার উপরে পুত্র তোমার করলো বেয়াদবী

বিচার তুমি করলে না তার, তুমি উদাস কবি…

আমি সেবার দাস কি ছিলাম? চাকর ছিলাম? না তো!

এবার আমি রিটার্ণ দিচ্ছি হাত পাতো হাত পাতো…

মেধাসত্ত্ব আইনটা দেখেই বিগড়ে গেলো মাথাদিলাম একটা মামলা ঠুকে। ঘটলো ব্যাপার যা-তা।

কাজী আনোয়ার হোসেন >

আমার হাতেই মানুষ তুমি সেইটা মনে আছে?

কম বয়েসে অনুবাদটা শিখলে আমার কাছে।

আমি হচ্ছি বটের বৃক্ষ ছায়ায় মায়ায় গাঢ়

আমার ছায়ায় বৃদ্ধি পেয়ে আমায় কুড়াল মারো!

আমার খেয়েই হাত গজালো পা গজালো দাঁত–

আমার পাছায় কামড়ে দিচ্ছো! কী পাজি বজ্জাত!

আপন ছাড়া পর ভাবিনি তোমায় কোনোদিনওতুমি একটা অকৃতজ্ঞ তুমি একটা হীন…

শেখ আবদুল হাকিম >

অকৃতজ্ঞ নই তো আমি অকৃতজ্ঞ তুমি

আমার লেখা বিক্রি করেই কিনেছো ল্যান্ড, ভূমি।

এই যে তোমার বাড়ি-গাড়ি অঢেল টাকার পাহাড়

এই যে তুমি বিরাট লেখক বিশাল খ্যাতির বাহার

সব হয়েছে আমার জন্যে, মানো আর না-ই মানোআমার রক্ত আমার ঘামেই চকচকে চমকানো।

আমার গোটা জীবনটাই তো কাটলো তোমার চুলায় কাজী তোমার মান সম্মান লুটিয়ে দিলাম ধুলায়…

কাজী আনোয়ার হোসেন >

সেটাই আমার দুঃখ হাকিম দুঃখ বলি কারে?

অতীত স্মৃতি ঝাপসা করছে দু’চোখ বারে বারে।

পেছন ফিরে তাকাই যদি আনন্দটাই ভাসেআমি ছিলাম। তোমরা ছিলে আমার পাশে পাশে।

কী আনন্দে কাটিয়েছিলাম একটা জীবন আহা

মোৎজার্তের বিটোভেনের মূর্ছনাতে বাহা…

বিকাশ কালের হই হল্লার সুরগুলো কী মিঠেতুমিই কী না মারলে ছুরি পেছন থেকে পিঠে!

সারা জীবন তোমার হাতে দিলাম কতো খাম

মুঠো মুঠো ভালোবাসার নেই কি কোনো দাম!

তোমার পাতে তুলে দিলাম টক-মিঠে-ঝাল-নুনআজকে আমার রক্ত ক্ষরণ, তোমার হাতে খুন…

লুৎফর রহমান রিটন >

আদালতের যুক্তি-তর্ক ডকুমেন্টস্‌-এর ফেরে–

মামলাতে কে জয়ী হবেন আর কে যাবেন হেরে

তা জানি না। কিন্তু জানি সত্যি কঠিন মানা।

কোটি যুবার স্বপ্নপুরুষ নায়ক মাসুদ রানা

ভুলুন্ঠিত হলেন বটে, কিন্তু ইতিহাসে–রানা থাকবেন তরুণীদের গোপন দীর্ঘশ্বাসে…

বঞ্চিত লেখকের প্রতি সবার থাকে মায়া

সকলখানেই দীর্ঘ হচ্ছে বঞ্চিতদের ছায়া।

সে বঞ্চনা টাকার কিংবা শ্রদ্ধা ভালোবাসার দারিদ্যকে উপহাসের অপমানের ভাষার…

হয়তো হাকিম জিতে যাবেন হয়তো কাজীই জয়ী

মাঝখানে যা ঘটে গেলো তা মর্যাদাক্ষয়ী।

পাঠকদেরও নিতে হবে সেই বেদনার ভারগোস্ট রাইটার হাকিম স্যারের নেই কিছু হারবার।

ড্যামেজ শুধু কাজী স্যারের যা হাকিমের দান! টাকার থেকে মান সম্মান অধিক মূল্যবান…

অটোয়া ১৬ জুন ২০২০

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *