বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী সম্প্রতি দিল্লি সফর করে এলেন। দিল্লিতে তিনি একটি বার্তা দিয়েছেন। তা হলো বাংলাদেশের জনগণ ক্রমশ ভারত বিমুখ এবং ভারতবিরোধী হয়ে যাচ্ছে। এজন্য তিনি দ্রুত বাংলাদেশকে সেরামের চুক্তি অনুযায়ী টিকা দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। ভারতের নীতিনির্ধারকদেরকে তিনি বলেছেন যে, দুই দেশের সম্পর্ক যে উচ্চতায় পৌঁছেছে সেটিকে ধরে রাখতে হলে ভারতকে ছাড় দিতে হবে। দিল্লির একাধিক কূটনৈতিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। ভারতের নীতি নির্ধারকরা এই বার্তা পেয়েছেন কিনা জানা যায়নি। তবে বাংলাদেশে যে টিকার সংকট তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশ নিজেই সেই সংকট কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। আজ বাণিজ্যিকভাবে কেনা চীনের টিকা বাংলাদেশে এসেছে। এসেছে মডার্নার টিকাও। বাংলাদেশ কিছুদিন বন্ধ রাখার পর আবার টিকা কার্যক্রম নতুন করে শুরু করতে যাচ্ছে। আর এর ফলে টিকা নিয়ে ভারত নির্ভরতা বাংলাদেশ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হলো।
এই অঞ্চলে বাংলাদেশই ছিল ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিভিন্ন সময় বলতেন যে প্রতিবেশীদের মধ্যে বাংলাদেশ সবার আগে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির তার কথা বাস্তবে রূপ দিতে পারেননি। বাংলাদেশের সঙ্গে একের পর এক যে স্বার্থপরের আচরণ ভারত করেছে তাতে ভারতই বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান সুস্পষ্টভাবে চীনের পক্ষাবলম্বন করছে এবং ইমরান খান মার্কিন নীতি পরিবর্তন করে পুরোপুরিভাবে চীনমুখী কূটনীতি গ্রহণ করেছেন। এমনকি উইঘুরে মুসলিম নির্যাতন সম্পর্কেও চীনকেই সমর্থন করেছেন ইমরান খান। আর এই মেরুকরণ এই অঞ্চলের কূটনীতিতে ভারতের প্রভাব অনেকটাই খর্ব করবে এবং চীনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করবে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। ভারত টিকা কূটনীতির মাধ্যমে বিশ্বে একটি নতুন মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হতে চেয়েছিল। কিন্তু নিজেদের দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে ভারত বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে। শুধু বন্ধুই নয় ভারত এরকম একটি মনোভাব এই অঞ্চলে তৈরি করেছেন যে ভারতকে বিশ্বাস করা যায় না।
বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে সেরাম ইনস্টিটিউটের টিকার জন্য চুক্তি করেছিল, অগ্রিম টাকাও দিয়েছিল। কিন্তু আকস্মিকভাবে সেই টিকা রপ্তানি বন্ধ করে দেয় ভারত। যার ফলে বাংলাদেশ একটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়তা এবং বিচক্ষনতার কারণে বাংলাদেশ এখন অনেকগুলো উৎস থেকেই টিকা সংগ্রহ করছে। আর এর ফলে বাংলাদেশ একটি শিক্ষা পেয়েছে। তা হলো আর যাই হোক ভারতকে বিশ্বাস করা যায় না। বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণই মনে করে যে, বাংলাদেশের যে টিকার সংকট, করোনার সাম্প্রতিক দাপট এর সবকিছুর জন্য ভারত দায়ী। কাজেই গত এক যুগ ধরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যে একটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিল সেখান থেকে এখন তা টানাপোড়েনের মধ্যে চলে গেছে। এমনকি ভারতের গণমাধ্যমগুলো এটি স্বীকার করেছে। আর এই টানাপোড়েনের জন্য বাংলাদেশ মোটেও দায়ী নয়, পুরোটাই দায়ী হলো ভারত।
ভারতের একের পর এক নিজস্ব স্বার্থের নীতি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি টানাপোড়েন তৈরি করেছে বলেই কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। শুধু টিকা নয় বিভিন্ন সময় দেখা গেছে বাংলাদেশ যখনই কোনো সংকটে পড়ে তখনই ভারত পাশে দাড়ায় না। যেমন একসময় বাংলাদেশকে ভারতের গরুর ওপর নির্ভর করতে হতো। আর কোরবানি এলেই ভারত গরু রপ্তানি বন্ধের এক ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশকে চাপে ফেলার কৌশল নিতো। পেঁয়াজ নিয়ে কূটনীতি নিয়ে বহু কথা হয়েছে এবং সেটি নিয়ে নতুন করে এখন আর বলার নেই। আর সর্বশেষ টিকা। আর এইসবের কারণেই এখন ভারত এই অঞ্চলে বন্ধুহীন হয়ে পড়ছে আর এই সুযোগটি নীচ্ছে চীন। শেষ পর্যন্ত এই উপমহাদেশের কূটনীতিতে চীন ভারতকে একঘরে করে ফেলবে কিনা সেটাই দেখার বিষয়।

