মুহাম্মদ এ এইচ খান: লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের মেয়াদোত্তীর্ণ নির্বাহী কমিটির এপ্রুভাল অব এক্সটেনশন ও কনস্টিটিউশনাল আমেন্ডমেন্ট এবং আগামি সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা- এই তিন বিষয়কে কেন্দ্র করে গতকাল পহেলা আগস্ট রবিবার পূর্ব লন্ডনের ‘লন্ডন এন্টারপ্রাইজ একাডেমি’ হলে অনুষ্ঠিত হওয়া যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড়, প্রভাবশালী ও মর্যাদাশীল সংগঠন ‘লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব’ এর এবারের স্পেশাল জেনারেল মিটিং বা বিশেষ সাধারণ সভাকে ঘিরে অনেক আগে থেকেই একটা বিশেষ হাইপ ছিলো। বিশেষ সভাকে ঘিরে বিশেষ হাইপ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এবারের জল্পনা কল্পনাটা তার চেয়েও অনেক বেশি ছিলো। সাবেক সভাপতি নাহাস পাশা ভাইয়ের নেতৃত্বে আনিস ভাই, আনাস ভাই, সোবহান ভাই, বাবু ভাই, সাইম ভাই, জুয়েল দা ও সারোয়ার ভাইয়েরা মেয়াদোত্তীর্ণ নির্বাহী কমিটির এপ্রুভাল অব এক্সটেনশন নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন এবং কনস্টিটিউশনাল আমেন্ডমেন্ট প্রশ্নে একযোগে ভেটো দিবেন এরকমটা শোনা যাচ্ছিলো। খেলা হবে; নির্বাহী কমিটির বৈধতা অবৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে; মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিকে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দেয়া হবে না; সংবিধান সংশোধন করে সদস্য সংখ্যা কমানো যাবেনা, পুরনো সদস্যদের সদস্যপদ নবায়নের প্রক্রিয়া জটিল করা যাবে না; সাংবিধানিক কোন পরিবর্তন মেনে নেওয়া হবে না, এ নিয়ে ফাইট হবে- এমনটা কথাও কেউ কেউ বলছিলেন। সহকর্মীরা অনেকেই মিটিংয়ে উপস্থিত থাকার অনুরোধ করেছিলেন। স্বাস্থ্যজনিত কারণে যেতে পারবো কী পারবোনা প্রথমদিকে নিশ্চিত ছিলাম না। পরে একটু ভালো ফিল করায় মিটিংয়ে উপস্থিত হই। ক্লাব সেক্রেটারি জুবায়ের ভাই গেইটে দেখে এগিয়ে এসে ধন্যবাদ জানান এবং ক্ষমা চান। ভাইস প্রেসিডেন্ট তারেক ভাই আগতদের সাথে মঞ্চের সামনে সেলফি তুলতে তুলতে দুর থেকে চোখের তারা নাচিয়ে স্বাগত জানান। নাজমুল ভাই ছাড়া আগতদের কারো মুখে মাস্ক নাই, স্বাস্থ্যবিধি মানারও কোন বালাই নাই। নাজমুল ভাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবার সাথে মুষ্ঠিবদ্ধ হাতে হাত মেলাচ্ছেন। এই অতি সতর্কতার কারণ তিনি আগে করোনায় ভূগেছেন। তারেক ভাই এমনভাবে সবার সাথে হাত মেলাচেছন আর কোলাকুলি করছেন করোনাকে যেনো তিনি মামলা করে জেলে পুড়েছেন। বয়োবৃদ্ধ সাংবাদিক হামিদ ভাই নির্দিষ্ট সময়ে এসেছেন। নির্বাহী কমিটিরও কম বেশি সবাই এসেছেন। সাজ্জাদ ভাই বরাবরের মতই এক কোনে তার এলবি টিভি নিয়ে বসে আছেন। কামাল ভাই এসেই সাইম ভাইয়ের খোঁজ দ্যা সার্চ করছেন। আশেপাশে সাইম ভাইকে না দেখে তিনি খুব অস্বস্তিবোধ করছেন। মুরাদ ভাইয়ের ছেলে মুরাদ ভাইকে ভাই ডাকছেন। একটু পর পর ব্রো, ব্রো বলে চিল্লাচ্ছেন। মুরাদ ভাই হাসছেন আর ছেলেকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচেছন। তবারক ভাই এসেই তার একটা মেয়ে হয়েছে সবাইকে সুখবর শোনাচ্ছেন। খানসূর ভাই নাজমূল ভাইয়ের সাথে বাইরে দাড়িয়ে আগামি নির্বাচন নিয়ে কথা বলছেন। কোন প্যানেলে যুক্ত হবেন নাকি এককভাকে প্রার্থী হবেন এই নিয়ে ভাবছেন। মুসলেহ ভাই সরাসরি ভোট চাইলেন। একটু পর ক্লাব সভাপতি এমাদ ভাই এলেন। ‘এই আমাদের খান ভাই’ বলে নাজমূল ভাই আমাকে এমাদ ভাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ‘খান সাব’ কে আমি খুব ভালোভাবেই চিনি বলে এমাদ ভাই আমার সাথে হাত মেলালেন। বললাম, সব বিচারক আসামিকে চিনে রাখেনা কিন্তু এমাদ ভাই চিনে রাখেন, এমাদ ভাই শুনতে পেলেন কিনা জানিনা তবে হলে প্রবেশ করার মূখে পেছন ফিরে মুচকি হাসলেন। মাহবুব ভাই কোথা থেকে যেনো মিষ্টি নিয়ে আসলেন। তবারক ভাই বাবা হওয়ার খুশিতে সবাইকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছেন ভেবে ডায়াবেটিসের রোগী হয়েও আমি সেই মিষ্টি খেলাম। খাওয়ার পর শুনলাম এটা লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের প্রপার্টি কেনা উপলক্ষে মিষ্টি। আগে জানলে পরে খাওয়ার জন্য এই মিষ্টি আমি রেখে দিতাম। লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের ১ বেড়রুমের এই প্রপার্টি সদস্যদের কী কাজে আসবে, কারা সেখানে থাকবে, নিয়মিত ক্লাব অফিস খোলার লোক যেখানে পাওয়া যায়না সেখানে কে এই প্রপার্টি মেইনটেইন করবে বা কোন নিয়মে এই প্রপার্টি পরিচালিত হবে মিষ্টি খাওয়ার আগে ইত্যাদি আগে জেনে নিতাম। একটা মানুষ মরলেন, তিনদিনও যায়নি, কাইজ্যা শুরু হলো সম্পত্তি নিয়া ভাগি-শরিকদের মধ্যে। কিংবা বাবার লাশ উঠোনে রেখে প্রপার্টি ভাগ-ভাটোয়ারা করতে বসেছেন তার প্রিয় সন্তানেরা। ভাগ-ভাটোয়ারা শেষ হওয়ার আগে তারা বাবার লাশ দাফন করবেন না বা কাউকে দাফন করতে দিবেন না। এই হচ্ছে কম বেশি বাঙালিদের একটা কমন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। মিষ্টি তেতো হতে সময় লাগে না। ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সেক্রেটারি মুহিব ভাই ও বাসন ভাই ক্লাবের শুরুর দিকের কিছু ঘটনা শেয়ার করলেন। মিষ্টি পাশ কাটিয়ে নাহাস ভাই দলবল নিয়ে হলে ঢুকলেন। আনাস ভাই, নবাব ভাই, বেলাল ভাই, লিটন ভাই এসেছেন কিনা কয়েকজন জিজ্ঞাসা করলেন। গল্প করতে করতে গল্পকার সাইম ভাই আসলেন, সাইম ভাইকে আসতে দেখে কামাল ভাই যেনো হাফ ছেড়ে বাচলেন। লন্ডন ছাড়াও মিডল্যান্ডস ও নর্থ ইংল্যান্ডসহ যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক ক্লাব সদস্যে আস্তে আস্তে উপস্থিত হলেন। বাঙালির চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী সাড়ে চারটার মিটিং সাড়ে পাঁচটায় ক্লাব সভাপতি মোহাম্মদ এমদাদুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জুবায়েরের সঞ্চালনায় শুরু হলো।
সভাপতি , সেক্রেটারি এবং ট্রেজারার তাদের বক্তব্যে বর্তমান নির্বাহী কমিটির এক্সটেনশন ও কনস্টিটিউশনাল আমেন্ডমেন্ট এবং ক্লাবের প্রপার্টি ক্রয়সহ তাদের কিছু কর্মকান্ড তুলে ধরলেন। বর্তমান নির্বাহী কমিটির বৈধতা অবৈধতার কোন প্রশ্নে তারা গেলেন না বরং নাহাস ভাইয়ের ভয়েই কিনা জানিনা তিন জনেই নাহাস পাশার প্রশংসা করে বক্তব্য রাখলেন।
নাহাস ভাই ও বাবু ভাই মাইক হাতে বৈধ, অবৈধ ও কনস্টিটিউশনাল আমেন্ডমেন্ট নিয়ে কিছু একটা বলার চেষ্টা করলেন কিন্তু যত গর্জে তত বর্ষালনা। উপরন্তু সাত্তার ভাই ‘আজকে সেলিব্রেশনের দিন, করোনা মহামারির ভেতরেও আমরা বেঁচে আছি এবং আজকে এক জায়গায় সমবেত হতে পেরেছি, ক্লাবের প্রপার্টি কেনা হয়েছে, আজকে সেলিব্রেশনের দিন, আজকে বিবাদের দিন নয়, কমিটি বৈধ অবৈধ এই প্রশ্ন তোলার দিন আজ নয়, কোন বিবাদে না গিয়ে ক্লাবটাকে আমরা এগিয়ে নেই’ এই বলে সেই আলোচনায় শুরুতেই তিনি জল ঢেলে দিলেন। যারা জমজমাট একটা ফাইট দেখার আশায় এসেছিলেন সাত্তার ভাইয়ের এই কথায় তারা কিছুটা হতাশ হলেন।
এরপর ক্লাব সেক্রেটারি আগামি ইলেকশন পর্যন্ত বর্তমান নির্বাহী কমিটির এক্সটেনশন চেয়েছেন। নাহাস ভাই ও মাহবুব ভাই সরাসরি ডেইট জানতে চেয়ে কাউন্টার দিতে চেয়েছেন। পরে সেক্রেটারি ৩১শে জানুয়ারির ভেতরে ইলেকশন করবেন বলে সবাইকে কনফার্ম করেছেন এবং ৩১শে জানুয়ারিতে নাহাস ভাইয়ের কোন ইভেন্ট থাকবেনা বলে রসিকতা করে এই আলোচনার ইতি টেনেছেন। জাকি রেজোয়ানা আপা পেন্ডামিকের কারণে ফেইস টু ফেইস ইলেকশন করা সম্ভব না হলে প্রয়োজনে অনলাইনে হলেও ৩১শে জানুয়ারির ভেতরে ইলেকশন করে ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন। আজহার ভাই ও তবারক ভাই অনলাইনে ভোট হলে ভোটারের গোপনীয়তা কীভাবে রক্ষা করবেন, নির্বাহী কমিটির কাছে এই বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। সিনিয়র সাংবাদিক উদয় শকর দাস ‘ইলেকশন কমিশনের উপর আমাদের পুরোপুরি আস্থা আছে’ এই কথা বলে ভোটারের গোপনীয়তা সংক্রান্ত আলোচনার ইতি টানতে চেয়েছেন। হাউজ সদস্যরা প্রথমে গাইগুই করেছেন পরে সেক্রেটারি প্রাইভেসী এক্সপার্টদের পরামর্শ নিবেন বলায় তিন জন বাদে বাদবাকি সবাই শেষে মেনে নিয়েছেন। মাত্র তিনজন বিপক্ষে আর বাকি সবাই পক্ষে থাকায় ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে বলে সেক্রেটারি হাউজে পাশ করেছেন। পেছন থেকে সালাহ উদ্দিন ভাই বলেছেন, ‘আমি এখন কনফিউজড হয়ে গেলাম। প্রথমে আপনাদের কথা শুনে মনে হলো ফেইস টু ফেইস ইলেকশন করবেন কিন্তু এখন আপনাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে অনলাইনে করবেন।’ সেক্রেটারি, লকডাউন না থাকলে ফেইস টু ফেইস ইলেকশন করবেন আর লকডাউন থাকলে অনলাইনে করবেন বলে সালাহ উদ্দিন ভাইয়ের কনফিউশন দুর করেছেন। হাউজ সদস্যদের কন্ঠ ভোটে আগামি ইলেকশন পর্যন্ত বর্তমান নির্বাহী কমিটির এক্সটেনশন হয়ে গেলে এরপর মিটিং এজেন্ডার দ্বিতীয় পয়েন্ট ‘কনস্টিটিউশন এমেন্ডমেন্ড’ এর বিষয়ে সেক্রেটারি কথা বলেন। নাহাস ভাই, জুয়েল দা ও সারোয়ার ভাই কনস্টিটিউশন এমেন্ডমেন্টের বিরোধীতা করেন এবং তারা এই মিটিংয়ে এই কমিটির আণ্ডারে এটা আলোচনা করার বিপক্ষে তাদের মত দেন। কামাল মেহেদী ভাই উঠে দাড়িয়ে এই মিটিংয়ে এই কমিটির আণ্ডারে এটা আলোচনা করার পক্ষে তার মত দেন। টেবিল চাপড়ে অনেকেই তাকে সমর্থন দেন। আলী বেবুল ভাই মাইক হাতে দাড়িয়ে আলোচনা না করার পক্ষে তার মত দেন, তিনি ১৪ দিন পর আরেকটা মিটিং ডেকে এই আলোচনা করার পক্ষে তার মত দেন। এ পর্যায়ে সেক্রেটারি সাবেক সভাপতি নবাব ভাইয়ের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘নবাব ভাই মিটিংয়ে আসতে না পারলেও তিনি কিছু মত দিয়েছেন। তারপরেও হাউজকে তিনি রেসপেক্ট করে বলেছেন, এই হাউজ যদি চায় তবে আলোচনা হবে, হাউজ না চাইলে হবে না।’ সাবেক সভাপতি বেলাল ভাই বলেন, ‘নির্বাচন পর্যন্ত এই কমিটির এক্সটেনশন যেহেতু এই হাউজে হয়ে গেছে যেটা সংবিধানে ছিলোনা, কাজেই আলোচনা হতে আমি সমস্যার কিছু দেখিনা।’ প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি বাসন ভাই বলেন, ‘আজকে সাত্তার ভাইয়ের মত আমিও মনে করি আজকে আমাদের আনন্দের দিন। ক্লাবের সংবিধান প্রণয়ন থেকে শুরু করে এই ক্লাব প্রতিষ্ঠার পেছনে যারা যারা অবদান রেখেছেন তাদেরকে এই হাউজে স্বরণ করার দিন। আজকে কোন বিবাদের দিন নয়, আজকে কোন বিভক্তির দিন নয়।’ তিনি যা করার হাউজের মতামত নিয়ে তা করার পক্ষে তার মত দেন। বদরুজ্জামান বাবুল ভাই ও তবারক ভাই সরাসরি আলোচনা করার পক্ষে তাদের মত দেন। মারুফ ভাই বলেন, ‘পেন্ডামিকের সময়ে ১৪ দিন পরে আরেকটা মিটিং ডেকে আলোচনা করার চাইতে আজকেই আলোচনা হোক।’ প্রবীণ সাংবাদিক জহির ভাইও অনুরুপ কথা বলেন এবং আলোচনা করার পক্ষে তার মত দেন। অভি ভাই বিজ্ঞদের মতামতের উপর গুরুত্ব দিতে বলেন যাতে করে তার মত নতুনরা শিখতে পারেন। সাইম ভাই সরাসরি আলোচনা না করার পক্ষে তার মত দেন। বুলবুল ভাই বলেন, ‘কনস্টিটিউশন এমেন্ড হবে এটা মাথায় রেখেই এখানে এসেছি।’ তিনি আলোচনা করার পক্ষে তার মত দেন। সারোয়ার ভাই বলেন,’ আমরা যারা লন্ডনে থাকি তারা এক সপ্তাহে সাতটা রিপোর্ট করতে পারি। কিন্তু যারা লন্ডনের বাইরে থাকেন তারা কোন ইভেন্ট ছাড়া রিপোর্ট করেন না বা করার সুযোগ থাকেনা। কাজেই বছরে অন্তত চারটি রিপোর্ট জমা দিয়ে সদস্যপদ গ্রহণ করার জন্য সংবিধানে যে এমেন্ডমেন্টের কথা বলা হচ্ছে আমি এই এমেন্ডমেন্টের বিপক্ষে।’ তিনি এই কথা বলার সাথে সাথে লন্ডনের বাইরে থেকে আগত কয়েকজন সদস্য ‘তারা সব সময় একটিভ ও তারা সব সময় রিপোর্ট করেন’ বলে সারোয়ার ভাইয়ের কথায় আপত্তি জানান এবং আলোচনা করার পক্ষে তাদের মত দেন। রহমত আলী ভাই, হাউজের উপরেই সব ছেড়ে দেন। তাইছির ভাই, ক্যারল ভাই, মিজবা ভাই হাউজে আছেন কিনা ঠিক বুঝা যাচ্ছেনা। তারা কোন আওয়াজ করছেন না। কাইয়ুম আব্দুল্লাহ ভাই, আব্দুল কাইয়ুম ভাই, মতিউর রহমান ভাই, এমরান ভাই, তারেক ভাই, নাজমুল ভাই, সালেহ ভাই, পলি আপা, শাহনাজ আপা, রুপি আপারা মঞ্চে উপবিষ্ট থাকায় কোন কথা বলতে পারছেন না। সোবহান ভাই বার বার উঠে দাড়িয়ে আলোচনা না করার পক্ষে তার মত দেন এবং দ্রুত মিটিং শেষ করার তাগিদ দেন। এরপর দেড় দুই ঘন্টা সবাই সবার কথা না শুনে বৈধ অবৈধ নিয়ে হাউজে সবাই শুধু বলেছেন, বাঙালি মাইক পেলেই যেমন প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় সব কথাই বলেন তেমনি সবাই শুধুই বলেছেন, ক্ষুধার্ত কেউ কেউ খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে ভেবে যেটাই হোক মিটিং তাড়াতাড়ি শেষ হোক বলে দুই পক্ষেই তালি বাজিয়ে সময় আরও নষ্ট করেছেন। শেষে সিক্রেট ভোটে সেক্রেটারি হাউজের মতামত নিতে চেয়েছেন। ভলান্টিয়াররা টেবিলে টেবিলে পেপার্স দিয়েছেন। সেই পেপার্সে সবাই তাদের মতামত দিয়েছেন। সিক্রেট ভোট কাউন্ট করার ঠিক আগে তিনি কোন পেপার্স পাননি বলে নাহাস ভাই সিক্রেট ভোট নিয়ে তীব্র আপত্তি করেছেন। সায়েমা আপা নাহাস ভাইয়ের টেবিলে পেপার দিয়ে সিক্রেট ভোট নিয়ে সব একসাথে কাউন্ট করার পরামর্শ দিয়েছেন, জটিলতা অবসানে তিনি একটা সমাধান দিয়েছেন। সোবহান ভাই, কাওছার ভাই, জুয়েল দা, শোভন ভাইয়েরা কেউ কেউ নাকি একাই চার পাঁচ ভোট করে দিয়েছেন বলে অনেকেই রসিকতা করেছেন। যাই হোক, হাউজে হাস্যরস, তর্ক বিতর্ক ও আলোচনা সমালোচনার এক পর্যায়ে মাগরিব নামাজের সময় হয়ে এলে হাউজ ক্লাব সেক্রেটারিকে আগামি ১৪ দিনের ভেতর নোটিশ দিয়ে অন্য একটা মিটিংয়ে সুবিধাজনক সময়ে পরবর্তী এসজিএম করার আহ্বান জানান। বাবু ভাই পরবর্তী মিটিংয়ে এমেন্ডমেন্ট যা আছে তাই থাকবে নাকি নতুন কিছু যোগ হবে সেক্রেটারিকে নিশ্চিত করতে বলেন। সেক্রেটারি বর্তমানে যে এমেন্ডমেন্ড আছে সেই সাথে আরও যেসব মতামত বা সাজেশন সেক্রেটারির ইমেইলে এসেছে এর বাইরে নতুন আর কিছু নিয়ে পরবর্তী মিটিংয়ে আলোচনা হবে না নিশ্চিত করলে এবং এই পর্যায়ে সভাপতিকে বক্তব্য রাখার আহ্বান জানালে সভাপতি বৈধ বা অবৈধ জাতীয় শব্দ ব্যবহারে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। তিনি প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের সাথে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতিও সবাইকে শ্রদ্ধা জানাতে অনুরোধ করেন। সেই সাথে আগামি ১৪ দিনের ভেতর সবাইকে নোটিশ দিয়ে অন্য একটা মিটিংয়ে সুবিধাজনক সময়ে পরবর্তী এসজিএম ডাকার সিদ্ধান্ত জানিয়ে সভার কাজ শেষ করেন।
সভা শেষে ইভেন্ট সেক্রেটারি মৃধা ভাই সবাইকে খেয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। রিফিউজিদের মত লাইনে দাড়িয়ে খাবার নিতে হচ্ছে দেখে কাওছার ভাইয়ের মত দু’একজন না খেয়েই চলে গেলেন। সারোয়ার ভাই একটু বাড়তি সমাদর করে একটা প্লেটে আমাকে খাবার তুলে দিলেন। টেবিলে টেবিলে খাবার পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে টেবিলে বসে থাকা কয়েকজন লাইনে দাড়িয়ে থাকাদের রোহিঙ্গা রিফিউজি বলে রসিকতা করলেন। আশ্চর্য! আমরা তো সবাই রিফিউজি। স্বর্গে ছিলাম। বাবা আদম কী একটা খাইলো আর আমরা স্বর্গ থেকে উৎখাত হলাম। দুনিয়ার জীবন তো ক্ষণস্থায়ী। এক মুহুর্তের নাই ভরসা। অথচ এটা নিয়ে কত কসরত, কত ছলাকলা! কত বাহাদুরি আর সিনাজুরি! কত ডকট্রিন, কত যুদ্ধ! যাই হোক, প্রতি উত্তরে লাইনে দাড়িয়ে থাকা সদস্যরা টেবিলে বসে থাকা সদস্যদের বুদ্ধিজীবী বলে রসিকতা করলেন এবং খাওয়া শেষে সবাই যে যার গন্তব্যে ছুটলেন। ছুটলাম আমিও।
অফটপিক: স্বাধীনতার পর পরই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিনারে এসেছিলেন ফ্রান্সের কিছু পণ্ডিত। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও ছিলেন। পরিচিতি পর্বে বাংলাদেশের সবার সম্পর্কে বলা হচ্ছিল ‘বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী’। একজন ফরাসি বক্তা মঞ্চে বললেন– বাংলাদেশের মানুষ ভাগ্যবান। তাদের মধ্যে এত এত বুদ্ধিজীবী আছেন। আমাদের ফ্রান্সে বুদ্ধিজীবী মাত্র একজন। তিনি জাঁ পল সার্ত্রে। এখন আমাদের লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবে বুদ্ধিজীবীর ছড়াছড়ি দেখলে তিনি নিশ্চয়ই ভিরমি খেতেন। আগে শুনতাম বিনয় হলো নিজকে ক্ষুদ্র ভেবে অন্তরের পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করা, জ্ঞানভারী হলে নাকি বিনয়ও বাড়ে। কিন্তু এখন দেখি উল্টো!!

