শ্রীতমা মিত্র: মহাসপ্তমী মানেই পুজো ঘিরে আনন্দের সূর্য কার্যত মধ্যগগনে উঠে আসা। ষষ্ঠীতে মায়ের বোধনের পর, সপ্তমীতে সকাল থেকেই বিভিন্ন পুজো উদ্য়োক্তা থেকে বনেদী বাড়ির পুজো কর্তারা ব্যস্ত থাকেন নবপত্রিকা স্নান নিয়ে। বাঙালির আটপৌরে ভাষায় এই নবপত্রিকাকে কলাবউ হিসাবেও মানা হয়। মনে করা হয় , গণেশের স্ত্রী কলাবউ সপ্তমীর দিন দেবতার পাশে এসে অধিষ্ঠান করেন। তবে এই নবপত্রিকা পুজোর নেপথ্যে রয়েছে শাস্ত্র মতে বহু তথ্য।
নবপত্রিকা কী?
সপ্তমীর দিন সকালে কলাগাছের সঙ্গে আরও আটটি গাছের অংশকে একত্রে মিলিয়ে স্নান করানো হয়। দেবীজ্ঞানে পুজো করে তাদের নববধূর বেশে সাজিয়ে ঘরে তোলা হয়। এই নয়চটি পত্রিকা হল, কদলী, বা রম্ভা যার প্রতীক কলাগাছ, কালিকা হিসাবে কচু, দুর্গা হিসাবে হলুদ, কার্ত্তিকী হিসাবে জয়ন্তী, শিবা (কৎবেল), রক্তদন্তিকা হিসাবে বেদানা, শোকরহিতা (অশোক), চামুণ্ডা (ঘটকচু), লক্ষ্মী হিসাবে ধানকে ধরে নিয়ে নয়টি গাঠের অংশ নিয়ে একসঙ্গে সপ্তমীর সকালে স্নান করা নো হয়। লাল পাড় সাদা শাড়ি পরিয়ে তাতে ঘোমটা দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হয় নবপত্রিকাকে। মূলত নয়টি ধরনের উদ্ভিদের পুজো এই সময় করা হয়।
নয় দেবীর পুজো
উল্লেখ্য, মূর্তি পুজোর চল যখন শুরু হয়নি, তখন এই নবপত্রিকাই ছিল দেবীর নয়টি রূপ বা নবদুর্গার রূপ। এই নয়টি গাছকে দেবীর রূপে কল্পনা করা হত। সপ্তমীর দিন দেবীর মৃন্ময়ী মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে নবপত্রিকার নয়টি গাছকে শ্বত অপরাজিতা লতা ও গাছ হলুদ দিয়ে বেঁধে পুজো করা হয়। বাংলার থেকে বহু দূরে যখন শারদ নবরাত্রিতে দেবীর নবদূর্গার পুজো নয় দিন ধরে চলে, তখন মহাসপ্তমীতে বাংলার বুকে বাংলার ঘরানায় পুজো হয় নবদুর্গার।
কলা বউ কেন দেবী কালিকার রূপ?
উল্লেখ্য, শাস্ত্রে কচুতে দেবীর কালিকার বাস। সেখানে দেবী ব্রাহ্মণী নামে বর্ণিত রয়েছেন। পূরাণ মতে, হলুদ গাছে অধিষ্ঠান দেবী দুর্গার, দেবীর শিবার রূপ ধরে বেলে, রক্তদন্তিকা হিসাবে রয়েছেন ডালিমে, অশোকে রয়েছেন শোক রহিতা হিসাবে, মান কচুতে রয়েছেন চামুণ্ডার বেশে, ধানে রয়েছেন লক্ষ্মীর বেশে।
নবপত্রিকা স্নানে কোন কোন জল লাগে?
শাস্ত্রে বর্ণিত বিধি অনুযায়ী, নবপত্রিকা স্নানে সমুদ্রের জল ও তীর্থের জল প্রয়োজন হয়। যেভাবে রাজ অভিষেক সম্পন্ন হয়, সপ্তমীর সকালে সেভাবেই সম্পন্ন হয় নবপত্রিকার স্নান। এই স্নানে গঙ্গা,যমুনা, সরস্বতী, আত্রেয়ী, সরযূ, কৌশিকা, ভোগবতী , মন্দাকিনী, গণ্ডকী , শ্বেত গঙ্গার জল প্রয়োজন হয়। আট ঘটের জলে নবপত্রিকাকে স্নান করিয়ে তবে তাঁকে দুর্গাবেদীতে স্থাপন করা হয়। প্রতিটি ঘটের জল দেওয়া র সময় বাজে আলাদা আলাদা ঢাকের বাদ্যি। তার বোলও রয়েছে আলাদা। এই পর্বের মাধ্যমে প্রকৃতিকে দেবী রূপে সমাদর ও পুজো করার সনাতন রীতি তুলে ধরা হয়।

