কাগজে-কলমে জাতীয় সংসদে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। কিন্তু এরশাদের মৃত্যুর পর এই দলটি আর কতদিন টিকবে সেটি এখন মহামূল্যবান প্রশ্ন। জাতীয়পার্টি এখন আর রাজনৈতিক সংগঠন নয়, এটি একটি ক্লাবে পরিণত হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
বিভিন্ন নির্বাচনে জাতীয় পার্টি প্রার্থী দেয় বটে, কিন্তু অদৃশ্য কারণে বসে পড়েন সেই প্রার্থীরা। অনেকেরই অভিযোগ, আর্থিক সুবিধা পেয়েই তারা নির্বাচনে পার্থীতা থেকে সরে দাঁড়ান। সারাদেশে জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক কার্যক্রমেও এক ধরনের স্থবিরতা রয়েছে। এছাড়া জাতীয় পার্টির বড় একটি অংশ সরকারের সঙ্গে প্রকাশ্য-গোপন সম্পর্কের মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হতে চায়। সাংগঠনিক কার্যক্রমে জাতীয় পার্টির অবস্থান কোথায়, সেটি নিয়ে জাতীয় পার্টির মধ্যেই নানারকম আলোচনা রয়েছে। তাছাড়া দলের মধ্যে আছে অনৈক্যও। একটি সমঝোতার মাধ্যমে জাতীয় পার্টি এখনো টিকে আছে বলে মনে করছেন অনেকে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনুযায়ী, একটি রাজনৈতিক দলের টিকে থাকার প্রধান শর্ত হলো একজন নেতা। যে নেতা জাতীয়ভাবে এবং দলের মধ্যে গ্রহণযোগ্য হবেন। হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি সেনা প্রধান ছিলেন এবং নয় বছর দেশ শাসন করেছেন। তাকে নিয়ে সমালোচনা-আলোচনা যাই হোক না কেন, তিনি একজন জাতীয় নেতার ইমেজ গ্রহণ করতে পেরেছিলেন। তার পেছনে তার কিছু সমর্থকগোষ্ঠীও ছিল। আর এরশাদের হাত ধরেই জাতীয় পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদের রাজনীতিতে এসেছেন। তিনি একজন সজ্জন ব্যক্তি, কিন্তু রাজনৈতিক ক্যারিশমা অথবা জনগণকে আন্দোলিত করার মতো নেতৃত্বগুণ তার নেই। আর সে কারণেই জাতীয় পার্টিতে এখন চলছে তীব্র নেতা সংকট। জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে যারা আছেন তারা সবাই সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে চান এবং এই বয়সে নতুন কোনো ঝুট-ঝামেলায় না গিয়ে সরকারের আস্থাভাজন হয়ে কিছু সুবিধাদি নিয়ে বাকিটা জীবন কাটিয়ে ফেলতে চান। এরকম বাস্তবতায় জাতীয় পার্টি সংগঠন হিসেবে ইতিমধ্যেই সংকটে পড়েছে।
জাতীয় পার্টি এরশাদ বেঁচে থাকতেই ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছিল। বাংলাদেশে জাতীয় পার্টির মূল আদর্শের জায়গা এবং বিএনপি`র আদর্শ জায়গায় খুব একটা পার্থক্য নেই। মূলত আওয়ামী বিরোধী একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবেই জাতীয় পার্টি গড়ে উঠেছিল। স্বৈরাচার জিয়াউর রহমানের মতো এরশাদও ইসলামকে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে উগ্রবাদ, মৌলবাদ গোষ্ঠীর সঙ্গে আতাঁত করে একটি রাজনৈতিক আবহ তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তাদের রাজনীতির মূল ধারাটি ছিল ৭৫ পরবর্তী সুবিধাবাদের রাজনীতিকে আঁকড়ে ধরে রাখা।
কিন্তু নানা বাস্তবতায় ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগ থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টি ঘনিষ্ট হয়। ফলে জাতীয় পার্টির যে মৌল আদর্শ সেখান থেকে অনেকাংশেই সরে এসেছে দলটি। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের বি টিম হিসেবেই জনমহলে অধিক পরিচিত। সংসদে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে জাতীয় পার্টি। কিন্তু এই বিরোধী দলটি অনেককে আজ্ঞাবহ ও লেজুরবৃত্তির বিরোধী দল হিসেবে পরিচিত। ফলে রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি জনআগ্রহ তৈরি করতে পারছে না। এরশাদের সময়েই শেষ দিকে আঞ্চলিক দলে পরিণত হয়েছিল জাতীয় পার্টি। বিশেষ করে রংপুর এবং সিলেট জেলা ছাড়া জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক তৎপরতা খুব একটা দৃশ্যমান ছিল না। এখন সেটি আরো সংকুচিত হচ্ছে। এখন জাতীয় পার্টির নেতারাই জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ নিয়ে শংকিত।
তবে জাতীয় পার্টির নেতারা মনে করেন, যতদিন আওয়ামীলীগ আছে ততদিন জাতীয় পার্টি থাকবে। আওয়ামী লীগই এখন জাতীয় পার্টির লাইফ সাপোর্ট বলে মনে করেন জাতীয় পার্টির অধিকাংশ নেতারা। লাইফ সাপোর্ট থেকে একটি রাজনৈতিক দল কতদিন টিকবে সেটি একটি বড় প্রশ্ন।

