বুধবার রাতে কুতুপালং শিবিরের লম্বাশিয়া নামক স্থানে নিজ অফিসে রোহিঙ্গা সশস্ত্র সন্ত্রাসীর হাতে নৃশংসভাবে হত্যার শিকার রোহিঙ্গা নেতা মহিব উল্লাহর দাফন সন্ধ্যায় সম্পন্ন হয়েছে। বিকালে আসরের নামাজের পর হাজারো শোকার্ত রোহিঙ্গা মহিব উল্লাহর জানাজায় অংশ নেন। এর আগে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে তাঁর ময়নাতদন্ত করা হয়। সন্ধ্যা পর্যন্ত হত্যার বিষয়ে উখিয়া থানায় কোনো মামলা হয়নি বলে জানান ওসি আহম্মেদ সঞ্জুর মোরশেদ।
আমার ভাইকে ‘আরসা’ হত্যা করেছে
নিহত রোহিঙ্গা নেতা মহিব উল্লাহর ছোট ভাই হাবিবুল্লাহ দাবি করে বলেছেন, আমার ভাইকে ‘আরসা’ নামের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠি হত্যা করেছে। হত্যাকারীদের সবার হাতেই ছিল বিদেশি পিস্তল। তিনি বলেন, এর আগেও অনেকবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। সাধারণ রোহিঙ্গাদের কাছে হত্যাকারীরা আল-ইয়াকিন গ্রুপের সদস্য হিসাবেই পরিচিত। রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপ অনেক আগে থেকেই আল-ইয়াকিন নামে পরিচিত। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের মিয়ানমারে জেনোসাইডের সময় ‘আরসা’ নামে এই গ্রুপটি পচিতিতি লাভ করে।
ভয়ে মুখ খুলতে রাজি নয় রোহিঙ্গারা
রোহিঙ্গা নেতা মহিব উল্লাহকে হত্যা করা হবে এটা কারও ভাবনায় ছিল না। মহিব উল্লাহ এত বড় মাপের নেতা যে, তার সামনে গেলে সবাই কাবু হয়ে যায়। তার ছিল অসাধারণ সন্মোহনী শক্তি। তিনি এমনভাবে মানুষকে বুঝাতে পারতেন যে, যারা একবার তার সাথে কথা বলেছে তারাই তার পিছু আর ছাড়েনি। এমন একজন নেতাকে হত্যা করার পর থেকেই রোহিঙ্গা শিবিরের সাধারণ রোহিঙ্গারা রিতীমতো হতবাক হয়ে পড়েছেন। মহিব উল্লাহকে হত্যার পর থেকে রোহিঙ্গারা এমনই ভীতিকর অবস্থায় রয়েছেন যে, এ সম্পর্কে কেউই মুখ খুলতেও সাহস পাচ্ছে না। এমনকি ‘আরসা’বিরোধী অনেক রোহিঙ্গা নেতা নিরাপত্তার অভাবে শিবির ছেড়ে অন্যত্র গাঢাকা দিত শুরু করেছে।
মৃত্যুর আগে মহিব উল্লাহর শেষ কথা
‘আমাদের মনে হয় আর বেশিদিন এখানে থাকতে হবে না। আমরা আমাদের দেশে ফিরতে পারব।’ এ কথাটুকু শেষ হতে না হতেই ‘পুলিশ আইয়্যের-পুলিশ আইয়্যের’ শব্দে ছুটাছুটি শুরু হয়ে যায়। বাস্তবে পুলিশ নয় হত্যাকারীরা পুলিশের ভয় দেখিয়ে মহিব উল্লাহর বৈঠকে যারা উপস্থিত ছিল তাদের ভয় দেখিয়ে সরিয়ে দেওয়ার জন্যই এমন কৌশল করেছিল। আর এ ফাঁকেই হত্যাকারীর দল খুব কাছ থেকেই পিস্তলের গুলি ছুড়তে থাকে। একে একে ৫টি গুলি ছুড়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেই তারা গাঢাকা দেয়।
মহিব উল্লাহর সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ) অফিসেই ঘটে বুধবার রাত সাড়ে ৮টার এমন হত্যাকাণণ্ডটি। এ ঘটনার বিবরণ দিয়ে রাতের এ সময় মহিব উল্লাহর সাথে থাকা রোহিঙ্গা নুরুল আমিন বলেন, ‘এশার নামাজের পর আমরা সবাই অফিসে গিয়ে বসি। মহিব উল্লাহ আমাদের নিয়ে বসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের অধিবেশনে গিয়ে আমাদের রোহিঙ্গা জাতির জন্য বিশ্বনেতাদের সাথে আলাপের কথা বলেন।’
তিনি বলেন, মহিব উল্লাহ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে দেশে ফেরাবার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে আলাপের কথাও বৈঠকে প্রকাশ করেন। নুরুল আমিন জানান, মহিব উল্লাহ এমনই একজন খাঁটি রোহিঙ্গা নেতা যিনি মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরে নিরাপদ জীবন-যাপনের কথাই চিন্তা কথা বলেছেন।
এমন জনপ্রিয় কিভাবে হলেন তিনি
সাধারণ রোহিঙ্গা পরিবারের একজন সন্তান মহিব উল্লাহ। মিয়ানমারের আরাকানের মংডুর গারাতিবল এলাকার মৌলভী ফজল আহমদের সন্তান তিনি। ২০১৭ সালের আগষ্টের রোহিঙ্গা ঢলের সময় বাংলাদেশে যখন মহিব উল্লাহ আসেন তখন নেতৃত্বহীনতায় ভুগছিল রোহিঙ্গারা। এর আগে যত রোহিঙ্গা নেতৃত্ব দিয়েছে তাদের প্রায় সবাইর বিরুদ্ধে বিদেশি দাতাদের টাকা নিয়ে নিজের ভাগ্য গড়ার অভিযোগ রয়েছে। এ সময় রোহিঙ্গারা একজন শিক্ষিত তরুণ নেতার অপেক্ষায় ছিলেন। সেটাই পূরণ করেছেন মহিব উল্লাহ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহিব উল্লাহ আরকানের নিজ এলাকায় শিক্ষকতা করেছেন। পরে সেখানে একটি এনজিওতে বেশ কবছর চাকরিও করেছেন। কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিওে এসে তিনি জাতিগত সমস্যা নিয়ে অত্যন্ত যুক্তি সহকাওে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়ার কাজ শুরু করেন। ইংরেজি ও বার্মিজ ভাষা অনর্গল বলতে পারদর্শী ছিলেন তিনি। গুছিয়ে কথা বলেন। লোকজনকে সান্ত্বনা দেওয়ার অসাধারণ এক ক্ষমতাও ছিল তার।
২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট জেনোসাইড দিবস পালন উপলক্ষে কুতুপালং শিবিরে তার ডাকে ৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার সমাবেশ হবার পর থেকে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেন। বিশ্বের অন্যান্য সংখ্যালঘু নির্যাতিত জাতিগোষ্ঠীর সাথে রোহিঙ্গাদের পক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তদানীন্তন প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎও দেন তিনি। এ সময়েও তিনি রোহিঙ্গাদেও নিরাপদে নিজেদেও দেশে ফেরার সুযোগ চেয়েছিলেন। তদুপরি রোহিঙ্গা জেনোসাইড নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যাবতীয় তথ্যাদি দিয়েও সহযোগিতা করেন মহিব উল্লাহ। এসব কারণেই ৪৮ বছর বয়সী এ রোহিঙ্গা নেতা জনপ্রিয়তা অর্জন করেন স্বল্প সময়ের মধ্যেই।
দীর্ঘদিনের মিশন
মহিব উল্লাহর স্বজনরা জানিয়েছে, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডসহ নানা দেশ থেকে বিভিন্ন সময় মোবাইলে তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। এ ছাড়াও রোহিঙ্গা শিবিরে থাকা প্রত্যাবাসনবিরোধী সশস্ত্র রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নানাভাবে মহিব উল্লাহকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। হুমকির জবাবে মহিব উল্লাহ নাকি বার বার বলতেন- রোহিঙ্গা জাতির জন্য আমি কথা বলছি, ব্যক্তি স্বার্থে নয়। রোহিঙ্গাদের দাবি দাওয়ার কথা বলে মৃত্যু হলেও মেনে নেব।
মহিব উল্লাহর সাহসী ভুমিকা
বিশ্বব্যাংকের তরফে যখন রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের জনগণের সাথে একীভূত করার প্রস্তাব দেওয়া হয় তখন মহিব উল্লাহ উল্টা ভুমিকা পালন করেন। মহিব উল্লাহ রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নয়- মিয়ানমারের নাগরিকত্ব নিয়ে স্বদেশে ফেরার জন্য নানাভাবে রোহিঙ্গাদেও সচেতন করার কাজে নামেন। এমনকি নিজের সংগঠনের তরফে এ বিষযে একটি বিবৃতি দেওয়ার কথাও জানা গেছে। সেই সাথে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথেও নানাভাবে যোগাযোগ রক্ষা করতে থাকেন। এ বিষয়টি নিয়ে আরসা সন্ত্রাসীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এর পরই হত্যাকারীরা মিশনটি নিয়ে সিরিয়াস হয়ে ওঠে বলে রোহিঙ্গাদেও ধারণা।

