শিরোনাম
শুক্র. ফেব্রু ২০, ২০২৬

চীনের ‘নয়া সমাজতন্ত্র’ যেভাবে বিশ্বকে প্রভাবিত করতে পারে

চীন বলছে যে, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গতিপথ ঠিক রাখার জন্যই তারা সমাজে সম্পদের ব্যবধান কমিয়ে আনার নীতি নিয়েছে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন যে, ব্যবসা এবং সমাজকে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার জন্যই এই নীতি নিয়েছে চীন। এবং বিশ্বের বাকি অংশেও চীনের এই নীতির ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে।

‘সকলের জন্য সমৃদ্ধি’ বা ‘সম্পদের ব্যবধান’ কমানোর সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিণতিগুলোর মধ্যে একটি হল কর্পোরেট চীনের দেশীয় বাজারকে অগ্রাধিকারকে দেওয়া।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বব্যাপী ফুলেফেঁপে ওঠা চীনের বিশাল প্রযুক্তি কম্পানি আলিবাবা এখন চীনে সকলের সমৃদ্ধি উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য ১৫.৫ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এবং এর বস ড্যানিয়েল ঝাং এর নেতৃত্বে একটি নিবেদিত টাস্ক ফোর্স গঠন করেছে।

সংস্থাটি বলছে যে, তারা পুরো দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুবিধাভোগী একটি প্রতিষ্ঠান, এবং ‘যদি সমাজ ভাল থাকে এবং অর্থনীতি ভাল থাকে, তাহলে আলিবাবাও ভাল থাকবে’।

তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রযুক্তি কোম্পানি টেনসেন্টও এই বিষয়ে এগিয়ে এসেছে এবং ৭.৭৫ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

চীনা রাষ্ট্র এখন এটা দেখাতে আগ্রহী যে, তারা কমিউনিস্ট পার্টির কর্তব্য পালন করতে চায়, সমাজ থেকে আর্থ-সামাজিক বৈষম্য দূর করতে চায়। কিন্তু শি জিনপিং যখন এই নতুন নীতিকে সার্বজনীনভাবে সহায়তা করার জন্য কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ দেওয়া শুরু করেন, তখন একটি বড় চীনা কোম্পানির কর্ণধার বিবিসির প্রতিবেদকের কাছে ব্যক্তিগতভাবে একে একটি ‘বড় ধাক্কা’ হিসেবে আখায়্যিত করেছিল।

পরে অবশ্য তিনি বলেন, ‘কিন্তু তারপর আমরা এই ধারণায় বেশ অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। এটা ধনীদের ছিনতাই করা নয়। এটা সমাজের পুনর্গঠন, এবং মধ্যবিত্তকে গড়ে তোলার বিষয়’।

বিলাসদ্রব্য ব্যবসা হারাতে পারে

যদি সাধারণ সমৃদ্ধি মানে হয় উদীয়মান চীনা মধ্যবিত্তের ওপর বাড়তি মনোযোগ, তাহলে এর অর্থ হতে পারে যে, এই গ্রাহকদের জন্য বিশ্বব্যাপী ব্যবসার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা তৈরি করে দেওয়া।

চীনের ইইউ চেম্বার অফ কমার্সের প্রেসিডেন্ট জোয়ার্গ উটকে বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি যে তরুণদের চাকরি পাওয়ার দিকে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা ভাল’।

‘যদি তারা মনে করতে পারে যে, তারা এদেশের সামাজিক গতিশীলতার অংশ, যা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, তাহলে তা আমাদের জন্য ভাল। কারণ যখন মধ্যবিত্ত বড় হয়, তখন আরও সুযোগ তৈরি হয়’।

যাহোক, জোয়ার্গ উটকে সতর্ক করেছেন, এর ফলে বিলাসদ্রব্য খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসাগুলো ভাল নাও করতে পারে।

‘বিশ্বব্যাপী বিলাসবহুল পণ্য ব্যবহারে যত অর্থ ব্যয় হয় তার প্রায় ৫০% ব্যয় করেন চীনারা। এবং চীনের ধনীরা যদি সুইস ঘড়ি, ইতালিয়ান টাই এবং ইউরোপীয় বিলাসবহুল গাড়ি কম কম কেনার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে এসব শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে’।

তবে জোয়ার্গ উটকে স্বীকার করেন যে, চীনের জনগণের গড় আয় বাড়ানোর জন্য চীনের অর্থনীতির সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু তিনি বলেন যে, ‘সাধারণ সমৃদ্ধি’র নীতি সেখানে পৌঁছানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে না।

চীনের ব্রিটিশ চেম্বার অব কমার্সের স্টিভেন লিঞ্চও বলেন, ‘সাধারণ সমৃদ্ধি’ এই গ্যারান্টি দেয় না যে, গত চল্লিশ বছরে মধ্যবিত্ত যেভাবে বেড়েছে সেভাবেই সামনেও বাড়বে।

গত কয়েক দশকে চীনের অর্থনীতি কত দ্রুত প্রসারিত হয়েছে সে সম্পর্কে তিনি একটি গল্প বলতে পছন্দ করেন।

‘তিরিশ বছর আগে একটি চীনা পরিবার মাসে একবার এক বাটি ডাম্পলিং খেতে পারত। বিশ বছর আগে, সম্ভবত তারা সপ্তাহে একবার এক বাটি ডাম্পলিং খেতে পারত। আর দশ বছর আগে তারা প্রতিদিন ডামপ্লিং খেতে পারার সক্ষমতা অর্জন করে। এখন, তারা একটি গাড়িও কিনতে পারে’।

কিন্তু লিঞ্চ বলছেন, আলিবাবা এবং টেনসেন্ট যেসব কর্পোরেট সামাজিক দায়িত্ব গ্রহণ করেছে তার ফলে এখনও কোথাও ‘সাধারণ সমৃদ্ধি’ ফলতে দেখা যায়নি।

প্রযুক্তি খাতের উপর সাম্প্রতিক ক্র্যাকডাউন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন খাতে অনেক তাৎক্ষণিক বিধিবিধান তৈরি হয়েছে। যার ফলে অনেক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এবং প্রশ্নও উঠেছে। যদি তারা আরও ভেতরের দিকে ঢুকে পড়ে, তাহলে কি তাদের সত্যিই বাকি বিশ্বের প্রয়োজন হবে?’

‘নয়া সমাজতন্ত্র’

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মতে, চীনের সমাজকে আরো বৈষম্যমুক্ত করে তোলাটাই সাধারণ সমৃদ্ধি অর্জনের মূল বিষয়। এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সমাজতন্ত্রের অর্থকে রূপান্তরিত করার সম্ভাবনা রাখে এটি।

বেইজিং ভিত্তিক সেন্টার ফর চায়না অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশনের ওয়াং হুয়াও বলেন, ‘কমিউনিস্ট পার্টি এখন সাধারণ শ্রমিকদের উন্নতি চায়- যেমন ট্যাক্সি ড্রাইভার, অভিবাসী শ্রমিক এবং ডেলিভারি বয়’।

‘চীন উন্নত পশ্চিমা দেশগুলোর মতো মেরুকরণকৃত সমাজের মতো হয়ে চায় না, যার ফলে আমরা দেখেছি যে বিশ্বায়ন থেকে পেছন দিকে হাঁটা এবং কট্টর জাতীয়করণের দিকে পরিচালিত হচ্ছে তারা’।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চীনকে পর্যবেক্ষণকারীরা বলছেন, যদি চীনা বৈশিষ্ট্যের সমাজতন্ত্রকে আমাদের বাকীদের জন্য একটি বিকল্প মডেল হিসেবে হাজির করা হয়, তাহলে সাধারণ সমৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে সেখানে পৌঁছানো যাবে না।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির চায়না সেন্টারের সহযোগী জর্জ ম্যাগনাস বলেন, ‘এটি বাম দিকে বেশি ঝুঁকে পড়া এবং আরও বেশি নিয়ন্ত্রণের দিকে ঝুঁকে পড়ার পদক্ষেপ, যা শি জিনপিংয়ের সময়কালের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য’।

ম্যাগনাস আরও বলেন যে, সাধারণ সমৃদ্ধির অর্থ ইউরোপীয় স্টাইলের সমাজকল্যাণ মডেলের অনুকরণ করা নয়।

‘এর অন্তর্নিহিত চাপ হল পার্টির লক্ষ্যগুলি মেনে চলা। উচ্চ এবং ‘অযৌক্তিক’ আয়ের উপর কর থাকবে এবং কমিউনিস্ট পার্টির অর্থনৈতিক লক্ষ্যে দান করার জন্য বেসরকারি কম্পানিগুলোর উপর চাপ থাকবে, কিন্তু প্রগতিশীল করের দিকে কোন বড় পদক্ষেপ নেই’।

একটি টপ ডাউন ইউটোপিয়ান চীন

এটা স্পষ্ট যে, শি জিনপিংয়ের অধীনে চীনের রাষ্ট্র ও সমাজ কীভাবে পরিচালিত হবে তার একটি বড় বিষয় হল ‘সাধারণ সমৃদ্ধি’।

এর সঙ্গে থাকবে আরও বৈষম্যহীন সমাজের প্রতিশ্রুতি, একটি বৃহত্তর এবং ধনী মধ্যবিত্ত, এবং এমন কম্পানি যারা নেওয়ার পরিবর্তে কেবল বেশি বেশি ফেরত দেবে।

এক ধরনের টপ ডাউন ইউটোপিয়ান চীন বিশ্বের জন্য একটি কার্যকর বিকল্প মডেল হয়ে উঠতে পারে, পশ্চিমের কাছেও যার জন্য একটি প্রস্তাব রয়েছে।

কিন্তু এর ফলে কমিউনিস্ট পার্টির হাতে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতাও কুক্ষীগত হবে।

চীনে সবসময়ই বিদেশী ব্যবসার জন্য একটি কঠিন পরিবেশ ছিল, ‘সাধারণ সমৃদ্ধি’র নীতি গ্রহণের ফলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই অর্থনীতিতে চলাচল করা এখন আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *