শিরোনাম
মঙ্গল. মার্চ ১০, ২০২৬

যে কারণে জলবায়ু সম্মেলন ব্যর্থ হবে

।। মার্ক লিওনার্ড ।।

গ্লাসগোতে জাতিসংঘের চলমান জলবায়ু সম্মেলন (কপ ২৬) বড় ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তির মধ্য দিয়ে শেষ হতে পারে। তবে এই সম্মেলনে কাগজে কলমে যে সাফল্যই অর্জিত হোক, দিন শেষে বিশ্ব মানবতার জন্য তা খুব বড় কোনো সাফল্য বয়ে আনবে না। অন্তত পরিবেশ অধিকারকর্মীরা জলবায়ু ইস্যুতে যে দাবি করে আসছেন, তার সঙ্গে বাস্তবতার যোজন যোজন দূরত্ব থাকবে।

জলবায়ু ইস্যুতে বিশ্বনেতারা একের পর এক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছেন এবং একের পর এক তা তাঁরা পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া দেশের সংখ্যা ক্রমশ বাড়লেও সে প্রতিশ্রুতি পূরণে হাতে গোনা দু–একটি দেশ ছাড়া অন্যদের বিশ্বাসযোগ্য কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এমনকি বিদ্যমান লক্ষ্যমাত্রা যদি আমরা পূরণ করতে সক্ষমও হই, তাহলেও ২০১৫ সালে প্যারিস চুক্তিতে যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল এবং লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল, তা অর্জিত হবে না। প্যারিস চুক্তিতে শিল্পায়নজনিত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঠেকাতে উষ্ণায়ন মাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তা শিগগিরই অর্জিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তদেশীয় প্যানেলের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০–এর দশকের গোড়ার দিকে এই গ্রহের তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে। মোটা দাগে বোঝা যাচ্ছে, যত দিন আন্তর্জাতিক সংহতি, আইন ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রগুলোর দিকে গুরুত্ব আরোপ করার বদলে জাতীয়তাবাদ, ক্ষমতার রাজনীতি ও বৈশ্বিক খবরদারির বিষয়ে দেশগুলো অধিক গুরুত্ব দেবে, তত দিন আমাদের ভবিষ্যৎ ফিকে হতেই থাকবে।

শীতল যুদ্ধ যখন তুঙ্গে, তখন দ্য আউটার লিমিটস নামের একটি আমেরিকান টিভি সিরিজ সম্প্রচারিত হয়েছিল। সেই টিভি সিরিজের গল্পে দেখানো হয়েছিল, একদল আদর্শবাদী বিজ্ঞানী পারমাণবিক ক্ষমতাধর দেশগুলোকে নিজেদের মধ্যকার ঝগড়াঝাঁটি থেকে ফিরিয়ে এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা করেন। এই লক্ষ্যে তাঁরা নকল ও সাজানো কিছু অদ্ভুত প্রাণীকে সামনে এনে সেগুলোকে ভিন্নগ্রহ থেকে নামা এলিয়েন বলে প্রচার করা শুরু করেন। তাঁরা সরকারগুলোকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, পৃথিবীতে নেমে আসা এলিয়েনগুলো অচিরেই গোটা বিশ্বকে ধ্বংস করবে এবং মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাঁদের এই পরিকল্পনায় কাজ হয়। নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে বিবদমান সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র ঝগড়াঝাঁটি বাদ দিয়ে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে এক হয়ে কাজ শুরু করে।

আজ প্রত্যেকের জন্য দরকারি ও উপকারী কোনো ইস্যুতেই সমন্বিতভাবে কাজ করার বিষয়ে কারও আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।

ধ্বংসাত্মক কোনো এলিয়েনের হানা দেওয়ার হুমকির মতোই জলবায়ু পরিবর্তন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেদিকে খেয়াল না দিয়ে বিশ্বনেতারা নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে ব্যস্ত আছেন। এমনকি তাঁদের অনেকেই এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে প্রকারান্তরে অস্বীকার করে যাচ্ছেন।

ধ্বংসাত্মক কোনো এলিয়েনের হানা দেওয়ার হুমকির মতোই জলবায়ু পরিবর্তন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেদিকে খেয়াল না দিয়ে বিশ্বনেতারা নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে ব্যস্ত আছেন। এমনকি তাঁদের অনেকেই এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে প্রকারান্তরে অস্বীকার করে যাচ্ছেন। ব্রাজিল থেকে অস্ট্রেলিয়া, চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় যে অর্থ খরচ করে থাকে, তা অন্য খাতে ব্যয় করার চিন্তায় আছে।

ব্রাজিল সরকার আমাজন বন উজাড় করা বন্ধের শর্ত হিসেবে বিশ্বের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করছে। তারা বলছে, তাদের উন্নয়নের প্রয়োজনে আমাজনের জায়গায় অবকাঠামো ও উন্নয়ন কাজ করতে চায়। তা থেকে বিরত থাকলে তাদের যে ক্ষতি হবে, তা বাকি বিশ্বকে পুষিয়ে দিতে হবে।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এই জলবায়ু সম্মেলনে শুধু ভিডিও লিংকের মাধ্যমে যোগ দিতে রাজি হয়েছেন। আর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্ভবত সেভাবেও এ সম্মেলনে যোগ দেবেন না।

এ ছাড়া উন্নত ও ধনী দেশগুলো, যারা গৌরবের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে, তারাও প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে। তারা দক্ষিণ বিশ্বের ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ১০ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতিপূরণ দেবে বলে কথা দিয়েছিল। কিন্তু তারা সে কথা রাখেনি। ক্ষতিপূরণ না দিয়ে উন্নত বিশ্ব এখন অপেক্ষাকৃত দরিদ্র এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর আচরণ পরিবর্তনের ওপর জোর দিচ্ছে।

চলমান সম্মেলনে সে ধরনের অনেক শর্তযুক্ত চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু আসল কথা হলো, কার্বন নির্গমনকারী দেশগুলো নির্গমন বন্ধে উদ্যোগ নিচ্ছে না। তারা উৎপাদন ও উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় মরিয়া হয়ে আছে। এ মনোভাবের পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত এই সম্মেলনের সাফল্য আশা করা যায় না।

মার্ক লিওনার্ড ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা; ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *