শিরোনাম
শনি. জানু ৩, ২০২৬

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সংলাপে অংশ নিবে না বিএনপি

নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যে সংলাপ করছেন তাতে অংশ নিবে না বিএনপি। দলের স্থায়ী কমিটি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুধু সংলাপ নয়, নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাবে না বিএনপি। রাজপথে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে দলটির এমন কঠোর অবস্থান সম্পর্কে জানা গেছে।

গতকাল বুধবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য বলেন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবি আদায়ে বর্তমানে জেলাপর্যায়ে যে সমাবেশ চলছে তাতে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি দেখে উজ্জীবিত তারা। এ জন্য তারা এখন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন। তারা বলছেন, দলের এখন যে কর্মসূচি চলছে সেটাকে ধাপে ধাপে এক দফা তথা সরকার পতনের আন্দোলনের দিকে নিয়ে যাবেন। তবে কবে নাগাদ চূড়ান্ত আন্দোলনে যাবেন তা এখনই বলা যাবে না বলে জানান তারা।

নতুন ইসি গঠনে রাষ্ট্রপতির সংলাপে বিএনপি না গেলেও দলটির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), কল্যাণ পার্টি ও মুসলিম লীগ সংলাপে যাবে বলে ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমাদের যে জোট তা মূলত নির্বাচনকেন্দ্রিক জোট। এর বাইরে যে যার রাজনীতি আমরা করি। জোটের শরিক দলগুলো নিজেদের ফোরামে আলোচনা করে তারা তাদের রাজনীতি করেন। তারা সংলাপে যেতে চাইলে আমরা তাদের নিষেধ করব না। তবে আমরা সংলাপে যাব না।’

খন্দকার মোশাররফ বলেন, ‘বর্তমানে আমরা দলের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে জেলা সমাবেশ করছি। জেলা সমাবেশ শেষ করে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে পরবর্তী কর্মসূচি চূড়ান্ত করব। প্রয়োজনে এ কর্মসূচিকে এক দফার সরকার পতনের আন্দোলনের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। আমাদেরকে সে পথেই যেতে হবে।’

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আবদুস সালাম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমাদের কোনো দাবি মানবে না। তাই আমরা আর সরকারকে কোনো ধরনের সহযোগিতা করব না। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দ্রুত দলের পুনর্গঠন কাজ শেষ করতে বলেছেন। পুনর্গঠন শেষে এক দফার আন্দোলনে যাব আমরা।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় এ বাহিনী, এর সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া চলমান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে বিএনপি দলীয়ভাবে অংশ না নেওয়ার পরও আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীরা যেভাবে বিরোধীদের কাছে পরাজিত হচ্ছেন। এ দুটি ঘটনায় বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত। কারণ আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা যে কমছে ইউপি নির্বাচনের ফলাফলে সেটাই বোঝা যাচ্ছে।

বিএনপির ওই নেতা বলছেন, বর্তমানে জেলা পর্যায়ে যে সমাবেশ চলছে তাতে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ব্যাপক হারে বাড়ছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এক দফার আন্দোলনে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। এ অবস্থায় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা চলমান আন্দোলনকে ধাপে ধাপে এক দফার আন্দোলনে নিয়ে যেতে চান। তিনি বলেন, লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগামী দিনের আন্দোলন সংগ্রামের জন্য নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন স্লোগান তৈরি করেছেন। স্লোগানটি হলো ‘আমার অধিকার, আমার দেশ তাঁবেদারের দিন শেষ টেক ব্যাক বাংলাদেশ’। স্লোগানটি দলের নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে শেয়ার করেছেন। এছাড়া আরও স্লোগান আসবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির ওই সদস্য আরও বলেন, যশোরে তাদের সমাবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। সে বাধা অতিক্রম করে তারা সমাবেশ করেছেন। ফেনীতে ১৪৪ ধারা জারি করার পরও নেতাকর্মীরা রাস্তায় নেমেছিলেন। নেতাকর্মীরা যেভাবে উজ্জীবিত তাতে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের আর পেছনে থাকার সুযোগ নেই।

সংলাপে না যাওয়ার কারণ সম্পর্কে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল বলেন, ‘ইসি গঠনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যে সংলাপ করছেন তা অর্থহীন। সংলাপ করে কোনো লাভ হবে না। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ (সিইসি) অন্যান্য পদে কাদের আনা হবে তা সরকার চূড়ান্ত করে রেখেছে। এখন সংলাপের নামে সরকার ধোঁকাবাজি করছে। জনগণকে দেখানোর জন্য এই সংলাপ। সংলাপের অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। তাই সরকারের সংলাপে অংশ নেবে না বিএনপি।’ তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে বিএনপি যাবে না। আগে নিরপেক্ষ সরকার গঠন করতে হবে। নিরপেক্ষ সরকার গঠন করার পর নিরপেক্ষ ইসি গঠন করতে হবে। এরপর দেশে নির্বাচন হতে হবে। অন্যথায় বিএনপি এ সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে যাবে না।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আইনে সুযোগ থাকার পরও দলের চেয়ারপারসনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর অনুমতি দিচ্ছে না সরকার। অথচ লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে পরামর্শ দিয়েছেন এভারকেয়ার হাসপাতাল গঠিত মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসকরা। এ অবস্থায় চেয়ারপারসনের মুক্তি ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আমাদের চূড়ান্ত আন্দোলনে যেতে হবে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘সরকার বিগত দিনে সংলাপ ও আলোচনা করেছে। দাবি মানার আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু সে আশ্বাস বাস্তবায়ন করেনি। গত একাদশ সংসদ নির্বাচনে আগের রাতে সরকার প্রশাসনের লোক দিয়ে কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দিয়ে বাক্স ভর্তি করেছে। জনগণকে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। তাই এ সরকারকে জনগণ বিশ্বাস করে না। সরকারের প্রতি জনগণের সমর্থন নেই।’ তিনি বলেন, ‘আমরা দলের পুনর্গঠনের কাজ করছি। দলকে শক্তিশালী করে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্বার গণআন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটানো হবে। তারপর এই দেশে নির্বাচন হবে।’

বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির প্রধান এই নেতা আরও বলেন, ‘আজকে সারা বিশ্ব জানে দেশে নির্বাচনের নামে কী হচ্ছে। তারা এ সরকারের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সরকার তার বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে তুলে নিয়ে খুন, গুম করছে। মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। এ জন্য র‌্যাবের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। সরকার র‌্যাবের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে বিদেশিদের কাছে। এ জন্য দায়ী সরকার।’

উল্লেখ্য, গত ২২ ডিসেম্বর থেকে বিএনপি পর্যায়ক্রমে দেশের ৩৪টি জেলায় সমাবেশ করে আসছে। এসব সমাবেশ শেষ হবে আগামী ৩ জানুয়ারি। এর মধ্যে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তৃতীয় বার্ষিকীতে আজ বৃহস্পতিবার ঢাকাসহ সারা দেশে মানববন্ধন কর্মসূচি দিয়েছে দলটি। বিএনপি সংসদে যোগ দিলেও তারা বরাবরই বলে আসছে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপি হয়েছে। নির্বাচনের পরপরই তারা ফলাফল বাতিল করে নতুন নির্বাচন দাবি করেছিল। সূত্র: দেশ রূপান্তর

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *