সুশান্ত সিং মারা গেলেন। বলিউডে ছিল না কোনো খুঁটি। তাই হারিয়ে যেতে হলো সুশান্ত সিংকে। সুশান্ত সিং রাজপুতের অকাল মৃত্যুতে এ রকমই বলছে বলিউডের একাংশ। সুশান্তের মৃত্যুর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হলো ‘নেপোটিজম’ শব্দটি। বলিউড যেমন মেতে ছিল নেপোটিজম নিয়ে, তেমনি আমরাও। আমরা সীমানা পেরিয়ে ভারত কেন, বাংলাদেশের দিকেও তাকাতে পারি। বাংলাদেশের স্বজনপ্রীতিও চোখে পড়ার মতো।
উদাহরণ দিয়ে বললে, আপনি কি মিডিয়ায় কাজ করতে চান? আর একটু সহজ করে বললে, অভিনয় করতে চান? তাহলে নির্দিষ্ট কোনো পরিচালক কিংবা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ঘরের হতে হবে। তাহলেই টানা কাজ জুটবে। না হয় থেমে থেমে, আজ আছে কাল নেই। এখানে গল্প ভাবার আগে অভিনয় শিল্পী নির্বাচন হয়ে যায়। নির্দিষ্ট ঘরানার বলে তাঁকে দিয়েই সব চরিত্র করাতে হবে! যার কারণে যেমন আসছে না যোগ্যতা সম্পর্ণ নতুন মুখ, তেমনি স্টার তৈরী হচ্ছে না। সব অভিনয়শিল্পী কখনোই সব ধারার অভিনয় করতে পারে না। চেষ্টা করাও বৃথা। প্রত্যেকটি মানুষের যেমন রয়েছে নিজস্ব কিছু স্টাইল, তেমনি অভিনয় শিল্পীদেরও। তার ধার কে ধারে?
হুমায়ূন আহমেদের নাটক মানেই কিছু পরিচিত মুখের দেখা মিলতো। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভাবে বলা যায় আসাদুজ্জামান নূর,আবুল খায়ের, আলী যাকের,মাহফুজ আহমেদ, জাহিদ হাসান, বিপাশা হায়াৎ,আবুল হায়াৎ, সুবর্ণা মুস্তাফা, মোজাম্মেল হক, দিলারা জামান, সালেহ আহমেদ, ফারুক আহমেদ, মেহের আফরোজ শাওন, ডা. এজাজুল ইসলাম, মনিরা মিঠু, মাজনুন মিজান, দিহান, পুতুল, স্বাধীন খসরু, শবনম পারভীনদের নাম। এদের মধ্যে অনেকেই শুধুমাত্র হুমায়ূন আহমেদের নাটক কিংবা চলচ্চিত্রের ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করেও তারকা বনে গেছেন। তবে মূল চরিত্রে হুমায়ূন আহমেদ এক শাওনকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের জন্য যত চান্স দিয়েছেন, সেটা অন্য কোন অভিনেত্রীর বেলায় হলে সেও স্টার থাকতেন। তিনি আরো অনেক স্টার তৈরী করতে পারতেন এই ব্যক্তিগত সম্পর্কটা না থাকলে।
হুমায়ূন আহমেদের মতো ব্যক্তিগত সম্পর্কের জেরেই মিডিয়ার একাংশ চলে বলে মনে করা হচ্ছে। ধারা তৈরি করেছিল ছবিয়ালও। তবে ছবিয়ালের সেই ধারা এখন আর তেমন নেই। তবে দর্শক ঠিকই মনে রেখেছে কার উথ্থান কোথা থেকে। ছবিয়াল থেকে বেশ কয়েকজন অভিনয় শিল্পী পরিচিতি পেয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বলা যায় মোশাররফ করিম, তিশাদের নাম। এখনো ছবিয়াল থেকে উঠে আসা পরিচালকদের নাটকে সেই অভিনয় শিল্পীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। ফারুকী তো তার স্ত্রী তিশাকেই সব ছবিতে কাস্ট করবেন। তিশা গুনী অভিনেত্রী সেখানে কারো সন্দেহ নেই। কিন্তু নিয়মিত এক অভিনেত্রীকে নিয়ে কাজ না করলে হয়তো অনেক নতুন মুখ দেখা যেত। ফারুকী বলেন,‘তিশা একটা কাজে আমাকে যতটা সময় দেবেন, অন্য কেউ দেবে না। তাই সেই আমার প্রথম পছন্দ। তবে নতুন ছবে নো ল্যান্ডস ম্যান- এ কিন্তু সে নেই। প্রযোজক হিসেবে আছে।’
অনেকের হয়েছে ঘর বদল। চঞ্চলের পরিচিতিটা আসে ছবিয়ালের হাত ধরে। তবে অভিনয়ের ক্ষেত্রে চঞ্চল বেশি পরিচিতি পেয়েছে সালাউদ্দীন লাভলুর হাত ধরে। একটা সময় লাভলুর প্রায় সব নাটকেই চঞ্চল , মোশাররফ করিম , আ খ ম হাসান,খুশি , বৃন্দাবন দাসদের দেখা মিলতো। দর্শকের কাছে এদের পরিচিতি হয়েছে পরিপূরক ভাবে। শিহাব শাহিনের নাটকেও রয়েছে কিছু পরিচিত মুখ। মম, অপূর্ব , তাহসান , ইরেশ যাকের , মিথিলারা ঘুরেফিরে আসে। শিহাব শাহিনের সঙ্গে লম্বা সময় প্রেম ও বিয়ের ফলে শিহাব শাহীন মানেই মম হয়ে গিয়েছিল। যদিও শিহাব শাহীন এখন মমকে নিয়ে কাজ করেন না বললেই চলে। এর কারণটা অবশ্য বলতে চান না শিহাব শাহীন। একটু আধটু অন্যদের সুযোগ দিলে যা হয়, এবার ‘আগস্ট ১৪’ তে কাস্ট করলেন তাসনুভা তিশাকে। তাসনুভা তিশা কিন্তু কাজটি করে বেশ আলোচনায় এসেছেন।
অনিমেষ আইচের নাটকে নিয়মিত থাকে ভাবনা। দুজনে প্রেমের কথাও স্বীকার পেয়েছেন। বিয়ে নিয়েও ভাবছেন। অনিমেষ আইচ তার আগের গার্লফ্রেন্ড ও স্ত্রী দীপান্বিতাকে নিয়েও নিয়মিত কাজ করতেন। চয়নিকা চৌধুরির নাটকে জুটি হয়ে জনপ্রিয় হয়েছিলো প্রভা- অপূর্ব। তবে অজ্ঞাত কারণে চয়নিকার সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয় অপূর্বর। গিয়াসউদ্দীন সেলিমের নাটকে মিলি ছিলো নিয়মিত। ‘মনপুরা’ সিনেমার পর তাদের মধ্যে প্রেমের গুঞ্জনও শোনা গেছে। যদিও মিলি তার ইঞ্জিনিয়ার স্বামী নিয়ে ভালোই আছেন। অন্যদিকে সেলিমও তার স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ভালো আছেন। শাফায়েত মনসুর রানার নাটকে জন, অপর্ণা নিয়মিত। অপর্ণার সঙ্গে রানার প্রেমের গুঞ্জন শোনা যায় অনেকদিন ধরে। সুমন আনোয়ারের নাটকে মৌসুমী হামিদকে মাঝে নিয়মিত দেখা যেত। তবে দুজনার ব্রেক আপ হয়েছে। আর একসঙ্গে কাজ হয়না। আশফাক নিপুনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক মেহজাবিনের। সেই সম্পর্কের কারণ হিসেবে অনেকে বলেন, নিপুনের বন্ধু আদনান আল রাজিবের গার্লফ্রেন্ড মেহজাবিন। নিপুনের এ সময়ের সেরা কাজগুলো তাই মেহজাবিনকে নিয়েই।
কিছু প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান যেমন ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ঘরেও রয়েছে নিজস্ব অভিনয় শিল্পী। তাদের লাইনটা লম্বা। তাদের অভিনয় শিল্পী তৈরীর রয়েছে নিজস্ব কিছু প্রতিযোগীতা। যেমন লাক্স চ্যানেল আই সুন্দরী প্রতিযোগিতা, ভিট চ্যানেল আই প্রতিযোগীতা , ফেয়ার অ্যান্ড হ্যান্ডসাম প্রতিযোগীতা। এসব প্রতিযোগীতা থেকে বের হওয়া প্রতিযোগীদের জন্য রয়েছে বিশেষ কিছু সুবিধা। তাঁদের নিয়মিত প্রমোট করে এ চ্যানেল। তাদের চ্যানেলের সিংহভাগ নাটকেই অভিনয় করে এসব শিল্পী। ইমপ্রেসের সিনেমাগুলোতেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাঁদের দিয়েই অভিনয় করানো হয়। শুধুমাত্র অভিনয় শিল্পী নয়। তাঁদের রয়েছে নিজস্ব পরিচালকও। এটিএন বাংলারও এমন নিজস্ব কিছু অভিনয়শিল্পী আছে।
এজেন্সিগুলোর দখলেও থাকে অভিনয় শিল্পী। বর্তমান সময়ে আলফা আই অন্যতম আলোচিত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। তাদের রয়েছে নিজস্ব কিছু অভিনয় শিল্পী। তাদের নিয়েই কাজ করে থাকে। যেমন মাসুমা রহমান নাবিলাকে নিয়মিত তাদের প্রতিষ্ঠানের কাজ করতে দেখা যায়। একটা সময় নিয়মিত নাটক করতো শার্লিন ফারজানা। শার্লি হুট করে নেই হয়ে গেল। এ প্রথা আজকে চালু হয়নি। টেলিহোম ২৩ বছর ধরে নাটক প্রযোজনায় রয়েছে। তাদেরও রয়েছে নিজস্ব কিছু অভিনয় শিল্পী। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বলা যায় তানভীন সুইটি, রিচি সোলায়মান, বিপাশা হায়াত, শমী কায়সার, আফসানা মিমিদের নাম। তাদেরকে প্রাধান্য দিয়েই তারা নাটক নির্মান করতো। বর্তমানেও এমন প্রথা প্রচলিত।
মজার ব্যাপার হলো এই যে নিজস্ব বলয় তৈরী হয়েছে, তাতে অভিনয়শিল্পীদেরও ক্ষতি। অভিনয়ের ক্ষেত্রে তারা এই বলয় থেকে বের হতে পারে না। এই ঘরানা প্রথা নাটকের মান গিলে খাচ্ছে। মুষ্টিমেয় কয়েকজন নির্মাতা এবং অভিনয়শিল্পী একক ভাবে বিস্তার লাভ করছে। বরাবরই সুযোগের অভাবে অনেক তরুন অভিনয় শিল্পীদের স্বপ্ন ধূসর হচ্ছে। ঝরে যাচ্ছে অনেক মেধাবী মুখ। এর মধ্যে যারা একটু জনপ্রিয় হয় তারাই সিন্ডিকেট তৈরী করে। গেল কয়েকবছরে এর বদৌলতে এক এক জুটি বছরে ১০০ টার বেশি নাটকে অভিনয় করেছে।
গোটা পরিস্থিতিই এখন একটা এজেন্ডার ভেতরে সীমাবদ্ধ। যারা পারছে না এই ঘরানায় বন্দি বা প্রবেশ করতে। তাদের কাছে কাজ নেই, ঝড়ে যাচ্ছে! মিডিয়া দিনকে দিন মেধা শুন্য হয়ে যাচ্ছে। অনেক অভিজ্ঞ অভিনয় শিল্পীদের হাতেই কাজ নেই। তাঁরা নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। নাটক বন্দি হয়ে যাচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু ঘরে।
নতুনরা আসুক ঝাঁকে ঝাঁকে। গল্প পাখা মেলুক মুক্ত হয়ে। কর্তারা নিজের স্বার্থের বাইরে গিয়ে সংস্কৃতির সঠিক চর্চাটা করুক। টিভি চ্যানেল গুলো গল্পকে প্রাধান্য দিক। একে দিয়ে নাটক নির্মান করতে হবে ভাবনা থেকে বের হোক। নাটকের মান ভালো হবে। মুক্ত হোক প্রতিভা, হারিয়ে না যাক। সংবাদ সূত্র: বাংলা ইনসাইডার

