সম্প্রতি জেব্রা, বাঘ, সিংহের মৃত্যুর ঘটনায় আলোচনায় উঠে আসা গাজীপুরের শ্রীপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে এবার সাংবাদিকদের জন্য অঘোষিত নিষেধাজ্ঞার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে।
বেশ কিছু প্রাণীর মৃত্যুর ঘটনা অনুসন্ধানে গঠিত তদন্ত দল ও বিশেষজ্ঞ মেডিকেল টিম পার্কে আসছেন জানতে পেরে বুধবার গণমাধ্যম কর্মীরা খবর সংগ্রহ করতে গেলে তাদেরকে পার্কের ভেতর ঢুকতে দেয়া হয়নি।
কেন ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না বা সাংবাদিকদের প্রবেশে কোনো নিষেধাজ্ঞা আছে কিনা জানতে চাইলে পার্ক কর্তৃপক্ষ বলেন, এ বিষয়ে তাদের কিছু জানা নেই। পরে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করেও পার্কে ঢুকতে না পেরে গণমাধ্যমকর্মীরা স্থানত্যাগ করেন।
একাধিক সংবাদকর্মী জানান, খবর সংগ্রহে পার্কে প্রবেশ করতে টিকিট কেটে ঢুকতে গেলেও তাদের অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এ ছাড়া, ভেতরে প্রবেশের পর কোনো তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেনি পার্ক কর্তৃপক্ষ, অনেকে সাংবাদিকদের এড়িয়ে যান।
সাংবাদিকদের ধারণা অসুস্থ বাঘ ও সিংহটির অবস্থা সংকটাপন্ন বলে পার্ক কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের এড়িয়ে থাকতে চাইছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম মোবাইল ফোনে প্রতিবেদককে বলেন, তদন্ত দলের আজকের বৈঠকের বিষয়ে সাংবাদিকদের সাথে কোনো কথা বলা হবে না বলে আমাদের জানিয়েছিল ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।
সাফারি পার্কে সাংবাদিকদের প্রবেশে কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এখন স্যারদের সাথে রয়েছি। পরে কথা বলব বলে তিনি ফোন কলটি কেটে দেন।
সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক মোল্যা রেজাউল করিমের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে এমন আচরণের বিষয়টি আমার জানা নাই। তবে তদন্ত দল গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবে না বলে আমাদের জানিয়েছিল। পার্কের প্রধান ফটকে কি হয়েছিল খবর নিয়ে বিস্তারিত বলতে পারব।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের শুরুতেই ১১ জেব্রা, এক বাঘ ও এক সিংহীর মৃত্যুর বিষয়টি সাংবাদিকেরা জানতে পেরেই গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে আসছিলেন। গণমাধ্যমে এতগুলো প্রাণীর মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর দেশজুড়ে আলোচনায় উঠে আসে বিষয়টি। পরে এ ঘটনার তদন্তে কমিটি ও বিশেষজ্ঞ দল গঠনের পাশাপাশি মেডিকেল টিম পার্কের প্রাণীদের নিরাপত্তায় ১০টি নির্দেশনা দেয়। এ ছাড়া, পার্ক পরিদর্শনে আসেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দীন, উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার, প্রধান বন সংরক্ষক আমির হোসেন চৌধুরী। সাফারি পার্কের একাধিক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়েও দেয়া হয়। সিআইডও মৃত প্রাণীদের শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে উচ্চতর তদন্তের প্রয়োজনে।
সাংবাদিকদের ধারণা, গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর পার্ক কর্তৃপক্ষের বিপক্ষে যাওয়ায় সংশ্লিষ্টদের ক্ষোভ তৈরি হয়। অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পার্কের অনেক অনিয়ম গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়াতে তারা সাংবাদিক প্রবেশে বাধা দেন। ১১ জেব্রার মৃত্যুর খবর বের করতে এসে ফাঁস হয় বাঘ মারা যাওয়ার ঘটনা। এমন গুরুত্বপূর্ণ খবর পার্ক কর্তৃপক্ষ চেপে রেখেছিল। গোপন খবর ফাঁস হওয়াতেই সাংবাদিকদের ওপর ক্ষোভ পার্ক কর্তৃপক্ষের।
পার্কের একাধিক সূত্র জানায়, প্রাণী মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত তদন্ত দলের সদস্যরা দুপুরের একটু আগে পার্কে এসে পৌঁছান। নির্ধারিত সময়ে পার্কের ইরাবতী রেস্ট হাউসের সম্মেলন কক্ষে তারা বৈঠকে বসেন।
সূত্র জানায়, দীর্ঘ তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে তদন্ত দল বৈঠক করেন। এরই মধ্যে এক সময় দায়িত্বরতদের জানিয়ে দেওয়া হয় পার্কে কোনো সংবাদকর্মীদের সাথে তদন্ত দল কথা বলবে না। এ সময় পার্কের অনেক কর্মকর্তারাই বৈঠকের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পার্কের দুই কর্মকর্তা জানান, এক মাসের ব্যবধানে পার্কে এতগুলো প্রাণীর মৃত্যুর ঘটনায় সবাই চরম বেকায়দায় রয়েছে। এর মধ্যে ফের এক বাঘ ও এক সিংহ অসুস্থ হওয়ার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়াতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের ব্যাপারে বেশ কঠোর হয়েছেন। পার্কে সাংবাদিক প্রবেশে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা বিরাজ করছে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২ জানুয়ারি থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত পার্কের আফ্রিকান সাফারিতে ১১ টি জেব্রা মারা যায়। পরে সপ্তাহের ব্যবধানে একটি সিংহী মারা যায়। তবে জেব্রার মৃত্যু নিয়ে আলোচনা চলাকালেই একটি বাঘ মারা যাওয়ার খবর চেপে রেখেছিল পার্ক কর্তৃপক্ষ, পরে সেটিও ফাঁস হয়ে যায়। চলতি সপ্তাতে আরও একটি বাঘ ও একটি সিংহ অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

