বাংলাদেশ নিউজ ডেস্ক: চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি প্রকল্প সংশোধন করে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে ৩০ হাজার ৪৪৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এই অর্থ পদ্মা সেতুর নির্মাণ ব্যয়ের চেয়ে বেশি। সরকারের এমন ৩৪ উন্নয়ন প্রকল্প সংশোধন করার ফলে যে ব্যয় বাড়ছে, ওই টাকায় অন্তত দুটি পদ্মা সেতু করা সম্ভব।
এই ৩৪ প্রকল্পের মধ্যে দুটি প্রকল্প সংশোধনের জন্য আজ মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উঠছে।
চলতি অর্থবছরের গত ১০ সভায় বাকি প্রকল্পগুলোর সংশোধন ও ব্যয় প্রস্তাব অনুমোদিত হয়।
আজকের একনেক সভায় যে দুটি প্রকল্পের সংশোধন প্রস্তাব উঠছে সেগুলো হলো জয়দেবপুর-চন্দ্রা-টাঙ্গাইল-এলেঙ্গা সড়ক (এন-৪) চার লেনে উন্নীতকরণ এবং কাঁচপুর-সিলেট-তামাবিল চার লেন সড়কের ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি প্রকল্প। এর সঙ্গে নতুন আটটি প্রকল্পও অনুমোদনের জন্য উঠছে আজ।
সংশোধনী প্রস্তাব অনুযায়ী, সাউথ এশিয়ান সাব-রিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন (সাসেক) সড়ক সংযোগ প্রকল্পের অধীন জয়দেবপুর-চন্দ্রা-টাঙ্গাইল-এলেঙ্গা সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পে ব্যয় আগের চেয়ে ৪৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি এই প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনী। দুই হাজার ৭৭৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকার এই প্রকল্পের প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয়েছিল তিন হাজার ৬৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। দ্বিতীয় সংশোধনীতে আবার বাড়িয়ে ব্যয় ধরা হয় ছয় হাজার ২১৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা। তৃতীয় সংশোধনীতে ৪৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
কাঁচপুর-সিলেট-তামাবিল চার লেন সড়কের ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব উঠছে আজকের সভায়। বাড়ছে চার হাজার ৮৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। তাতে এই প্রকল্পে মোট খরচ হবে সাত হাজার ৯৭৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
প্রকল্পের সংশোধনীতে ব্যয় বাড়ানো নিয়ে একাধিকবার একনেক সভায় বিরক্তি প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একাধিকবার অনুশাসন ও তাগাদা দিয়ে দিয়েছেন সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ করার। তাতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল জনসাধারণ তাড়াতাড়ি পেতে পারে, কিন্তু প্রকল্পের সংশোধনী ও ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতা কমছে না।
চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি প্রকল্প সংশোধন করে ব্যয় ৩০ হাজার ৪৪৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা বাড়িয়ে এক লাখ ৪৫ হাজার ৯৩৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা অনুমোদন করা হয়েছিল গত একনেক বৈঠকে। এই অর্থ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ খরচের চেয়ে অন্তত ৪৫ হাজার কোটি টাকা বেশি। ব্যয়ের হিসাবে এটি এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম; নবজাতক ও শিশুস্বাস্থ্য সেবা; কভিড-১৯, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, কিডনি, মানসিক স্বাস্থ্যসহ সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
চলতি অর্থবছরে গত একনেক সভা পর্যন্ত ৩২টি প্রকল্পের সংশোধন অনুমোদ করা হয়েছে। আজকের দুটিসহ ৩৪টি প্রকল্পে মোট ব্যয় বাড়ছে ৬৩ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা। বাড়তি এই ব্যয়ের অঙ্ক কত বড় তা বোঝানোর জন্য প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা একে পদ্মা সেতুর খরচের সঙ্গে তুলনা করে বলছেন—এই টাকা দিয়ে দুটি পদ্মা সেতু করা যাবে। দেশের অন্যতম বড় প্রকল্প পদ্মা সেতু নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।
প্রকল্পের ধীরগতি ও সংশোধনীতে জনসাধারণের কী ধরনের ক্ষতি হয়—এমন প্রশ্নের জবাবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মেগাপ্রকল্পসহ যেসব উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড হচ্ছে, তা দেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। আরো গুরুত্বপূর্ণ এসব প্রকল্প সয়মমতো, সাশ্রয়ী মূল্যে শেষ করা। তাহলে জনগণ উপকৃত হবে। তিনি আরো বলেন, সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সততা ও দক্ষতার সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপির) তৈরি করতে হবে।
আট হাজার কোটি টাকার নতুন আট প্রকল্প আজ উঠছে : নতুন প্রকল্পগুলো হলো খুলনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার স্থাপন। ইন্ট্রিগেটেড কমিউনিটি বেইসড চাইল্ড কেয়ার প্রটেকশন অ্যান্ড সুইম সেফ প্রকেটশন প্রজেক্ট। বরগুনা জেলার বেতাগী শহরসহ পায়রা নদী ভাঙন প্রতিরক্ষা প্রকল্প। ভোলা জেলায় মুজিবনগর ও মনপুরা উপজেলায় বাঁধ নির্মাণ, তীর সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন প্রকল্প। বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে দুটি ফায়ার স্টেশন স্থাপন, স্মার্ট প্রি-প্রেমেন্ট মিটিং প্রজেক্ট, ফাইভজি উপযোগীকরণে বিটিসিএলের ফাইবার ট্রান্সমিশন প্রকল্প এবং ১৫ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প।
ভবিষ্যতে উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিতে কোন কোন বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া দরকার—জানতে চাইলে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, স্বচ্ছতার ভিত্তিতে প্রকল্পের ব্যয় ঠিক করতে হবে। পাশাপাশি জনগণকে জানাতে হবে কেন ও কোন কোন কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ছে। এই মেয়াদ বাড়ার কারণে কত বেশি মানুষ উপকৃত হচ্ছে এবং এর আর্থিকমূল্য কত। তাহলে উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে ওঠা প্রশ্নের মীমাংসা হবে।

