শিরোনাম
শনি. জানু ৩, ২০২৬

মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে নতুন বিতর্ক: উদ্দেশ্য কি?

বাংলাদেশে কয়টি মন্ত্রণালয় একের পর এক বিতর্ক সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে নজিরবিহীন সাফল্য অর্জন করছে। এরমধ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এর আগে রাজাকারদের তালিকা তৈরি করেছিল। যে তালিকার মধ্যে অনেক মুক্তিযোদ্ধাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। পরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সংসদে নিজেই বলেছিলেন যে, এটি একটি বেকুবের মতো কাজ তিনি করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিযুদ্ধের তালিকা নিয়ে নিত্য নুতন বিতর্ক তৈরি করছেন এবং মীমাংসিত বিষয়কে আবার প্রশ্নবিদ্ধ করার ক্ষেত্রে এই মন্ত্রণালয় বিশেষভাবে বিতর্ক তৈরি করছেন বলেও বিভিন্ন মহল মনে করছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো যে, মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের যে নির্দেশনা, সেই নির্দেশনা তারা অনুসরণ করছে না। সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো যে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র বলা হয়েছে ১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত কারো বয়স ন্যূনতম ১২ বছর ৬ মাস না হলে তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। কিন্তু এই বিষয়টি ইতিমধ্যে হাইকোর্ট নাকচ করে দিয়েছে।

হাইকোর্টের রায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স নির্ধারণকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়। এছাড়াও সার্টিফিকেটে উল্লেখিত জন্মতারিখ প্রকৃত জন্ম তারিখ নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রেজিস্ট্রেশনে মুক্তিযোদ্ধার বয়স নির্ধারণকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও ওই পরিপত্র বাতিল করেনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ে একজন মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ব্যাপারে একজন বিচারকের আবেগঘন একটি অবজারভেশন লক্ষ্য করা যায়। একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান যখন সরকারি চাকরি নেন, তখন মুক্তিযোদ্ধা কোটায় পাওয়া তার চাকরি নাকচ করে দেয় এই অজুহাতে যে তার জন্ম ১৯৭২ সালে। প্রশ্ন উঠেছিল যে ১৯৭১ সালে শহীদ হয়ে যাওয়া একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের জন্ম কিভাবে ১৯৭২ সালে হয়। কিন্তু হাইকোর্ট সউদ্দ্যোগে এ ব্যাপারে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখতে পায় যে, শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের জন্ম আসলে একাত্তরের আগেই। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রেজিস্ট্রেশনের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত স্কুলের শিক্ষক তার জন্ম তারিখ এবং বয়স পরিবর্তন করে দেয়। যেটি বাংলাদেশের হরহামেশাই হয়ে থাকে।

এরপর ওই শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। হাইকোর্টের এরকম একাধিক ঘটনার উদ্ধৃতির পরও সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়ে নানারকম বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে। সম্প্রতি দুইজন মন্ত্রীর ব্যাপারে নতুন করে অযাচিত বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে। এই দু’জন মন্ত্রীর মধ্যে রয়েছেন সরকারের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এবং অন্যজন হচ্ছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। এই দুজনের মধ্যে আবার শ ম রেজাউল করিমকে বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়ার পর এটি আবার নতুন করে পুনঃবিবেচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আ হ ম মুস্তফা কামালের আবেদন যাচাই বাছাইয়ের পর বাতিল করে দেয়া হয়েছে। এই সমস্ত ঘটনাগুলো স্পর্শকাতর এবং নির্বাচনের আগে এগুলো নতুন বিতর্ক তৈরি করছে। শ ম রেজাউল করিমের মুক্তিযোদ্ধা সনদ যাচাই বাছাই করা হবে কেন এনিয়েও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা প্রশ্ন তুলেছেন। কারণ শ ম রেজাউল করিমের মুক্তিযুদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি ছিল মুক্তিবার্তায় এবং শ ম রেজাউল করিমই হলেন গুটিকয়েক ব্যক্তির মধ্যে এক অন্যতম যিনি হাইকোর্টে মুক্তিযোদ্ধাদের বয়সের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে রিট পিটিশন দায়ের করেছিলেন এবং সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স নির্ধারণ সংক্রান্ত ২০১৬ সালের ১০ নভেম্বর যে গেজেট প্রকাশ করেছিল সেই গেজেট প্রকাশকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।

মহামান্য হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ সহকারের সচিব, চেয়ারম্যান জামুকা, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সদস্য, পিরোজপুর জেলা ইউনিট কমান্ডার, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, পিরোজপুর ইউনিট, জেলা প্রশাসক পিরোজপুর ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজিরপুরের উপর ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বর রুল জারি করেন এবং বয়স নির্ধারণ কেন এখতিয়ার বহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না সে বিষয়ে ছয় সপ্তাহের মধ্যে কারণ দর্শাতে বলেন। একই সাথে মহামান্য আদালত উক্ত রিট পিটিশন রুল শুনানি না হওয়া পর্যন্ত রিট আবেদনকারীদের নাম মুক্তিযোদ্ধা গেজেট থেকে বাদ না দিতে সরকারের প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। রুল ইস্যুকালে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেওয়া হয়েছিল যে রুল শুনানি না হওয়া পর্যন্ত নাম গেজেট থেকে বাদ দিতে পারবে না। পরবর্তীতে রুল শুনানি হয়। চূড়ান্ত রায়ে বলা হয়, কোনো বয়স নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের নেই। ফলে সরকারের সিদ্ধান্তকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়। এর বিরুদ্ধে সরকারপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল দায়ের করলেও হাইকোর্টের রায় বহাল থাকে। অর্থাৎ বয়স নির্ধারণের সিদ্ধান্ত বেআইনি থেকে যায়। সর্বোচ্চ আদালতের এই রায়কে উপেক্ষা করে অন্যকোনোভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কোনো কর্তৃপক্ষের নেই। কাজেই এটি একটি আদালতের নিষ্পন্ন বিষয়। সেটিকে আবার নতুন করে খুঁচিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে কি এটি একটি রহস্যময় প্রশ্ন বটে। সরকারের কোনো কোনো মহল কি নিজেরা নিজেদেরকে বিতর্কিত করার খেলায় মেতেছে? আ হ ম মুস্তফা কামালেরও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আবেদন জামুকা কেনো বাতিল করে দিলো সেও এক রহস্যময় প্রশ্ন। এই সমস্ত বিষয়গুলো নির্বাচনের আগে সরকারকে বিব্রত করেছে এবং যারা এই কাজটি করছে, তারা পরিকল্পিতভাবে সরকারকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্যই এটি করছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা দরকার বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *