বাংলাদেশ নিউজ ডেস্ক: অস্বাভাবিক দ্রুততায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল টিটিই (টিকেট পরীক্ষক) শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। সরকারি ছুটিতে বুধবার রাতের ঘটনা। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে বৃহস্পতিবারেই মোবাইলে টিটিই বরখাস্ত। বিনা টিকেটে প্রথম শ্রেনীর বগিতে ভ্রমনকারী যাত্রীরা দ্রুততারা সাথে টিটিইকে সাময়িক বরখাস্ত করিয়ে প্রমাণ করলেন তারা রেলমন্ত্রীর স্ত্রী’র আত্মীয়। এতেও রেহাই হয়নি টিটিই শফিকুল ইসলামের। এবার তলব করা হয়েছে পশ্চিমাঞ্চলীয় পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে কার্যালয়ে। রবিবার তাঁকে বিভাগীয় কার্যালয়ে উপস্থিত হতে বল হয়েছে। শনিবার সকালে শফিকুল ইসলাম নিজেই এ তথ্য গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।
বুধবার রাতে বিনা টিকেটে ট্রেনে উঠে প্রথম শ্রেনীর শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বগিতে ভ্রমন করছিলেন রেলমন্ত্রীর স্ত্রীর তিন আত্মীয়। বিনা টিকেটে ভ্রমন। তাও আবার প্রথম শ্রেনীর বগিতে। ট্রেনে ডিওটি করতে নিয়ে নিয়ম অনুযায়ী তাদের কাছে টিকেট দেখতে চাইলে বেঁকে বসেন তারা। নিজেদের রেলমন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় দেন তখন। নিয়ম অনুযায়ী তাদের জরিমানা করেছিলেন টিটিই শফিকুল ইসলাম।
পরের দিনই তাঁর বিরুদ্ধে উল্টা অভিযোগ করেন রেলমন্ত্রী স্ত্রী’র ওই তিন আত্মীয়। তাদের সঙ্গে ‘অসদাচরণ’ করা হয়েছে এ মর্মে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন তারা। অভিযোগ দায়েরের পরপরই টিটিইকে অতি দ্রুততার সাথে চাকুরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এই ঘটনায় চাকুরি থেকে সাময়িক বরখাস্তের খবর বের হলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠে।
উল্লেখ্য, ঈদ উপলক্ষে সরকারি ছুটির মধ্যে বুধবার রাতে এই ঘটনা ঘটে আন্তনগর ‘সুন্দরবন এক্সপ্রেস’ ট্রেনে। সরকাটি ছুটির দিনেই টিটিই’র বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণের’ অভিযোগ দেন রেলমন্ত্রীর স্ত্রীর তিন আত্মীয়। তাদের অভিযোগ পাওয়ার পরপরই ছুটির ভেতর দ্রুত টিটিই শফিকুল ইসলামকে সাময়িক বরাখাস্তের আদেশ জারি করে রেলওয়ে কতৃপক্ষ। মোবাইল ফোনে শফিকুল ইসলামকে জানিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশের সাধারণ কোন নাগরিক রেলওয়ের কারো বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ করলে কি এমন দ্রুততার সাথে ব্যবস্থা নেওয়া হয়?
যদিও শনিবার গণমাধ্যমের কাছে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন দাবী করেছেন তিন ব্যক্তিকে তিনি চিনেন। কিন্তু অতি দ্রুততার সাথে টিটিই’র শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রমান করে ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে।
স্থানীয় গণমাধ্যম গুলোতে ঘটনার পরের দিনই খবর বের হয়। এতে বলা হয়, গাড়িতে ভ্রমনের সময় টিটিই প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তাদের ব্যক্তির কাছে টিকেট দেখতে চেয়েছিলেন। তখন তারা নিজেদের রেলমন্ত্রীর আত্মীয় বলে পরিচয় দেন। ওই তিন ব্যক্তি বিনা টিকেটে প্রথম শ্রেনীর শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বগিতে ভ্রমন করছিলেন। স্থানীয় গণমাধ্যম গুলোর খবর অনুযায়ী ওই তিন ব্যক্তি রেলমন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় দেওয়া সত্বেও টিকেট পরীক্ষক তাদের জরিমানা করেন এবং প্রথম শ্রেনী থেকে শোভব শ্রেনীর টিকেট দিয়ে সেখানে যেতে বলেন। পরবর্তীতে জানা গেছে, এই ৩ ব্যক্তি রেলমন্ত্রীর স্ত্রীর আত্মীয়।
এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এই ঘটনায় রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের পদত্যাগ দাবী করেছে। শনিবার এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “ঘটনাটি ক্ষমতার অপব্যবহারের একটি নির্লজ্জ ও নিকৃষ্টতম উদাহরণ। এখানে মূলত দুইভাবে ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে, প্রথমত রেলমন্ত্রীর নিকটাত্মীয়দের বিনা টিকেটে রেল ভ্রমণ অর্থাৎ তারা ধরেই নিয়েছিলেন যে, রেলের প্রচলিত আইন তাদের জন্য প্রযোজ্য নয়! দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট টিকিট পরিদর্শক তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করায়, তাঁকে কোনো ধরনের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ প্রদান না করেই তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল ফোনে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। পুরস্কৃত হওয়ার পরিবর্তে বরখাস্ত হবার ঘটনা- দেশবাসীর কাছে এই বার্তাটিই পৌঁছেছে যে, ক্ষমতার দাপট ও অনিয়মই হচ্ছে বাস্তবতা। তাছাড়া, এই নিকৃষ্টতম দৃষ্টান্ত এখনও গুটিকয়েক যারা নিষ্ঠা ও সততার সাথে স্ব স্ব ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করছেন তাঁদের জন্য একটি শক্তিশালী নেতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হবে।”
যদিও এ ঘটনায় রেলমন্ত্রী নিজের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা গণমাধ্যমের কাছে অস্বীকার করেছেন এবং তাঁর আত্মীয় পরিচয়দানকারীদের চেনেন না বলে দাবি করেছেন। একইসাথে রেল কর্তৃপক্ষ টিটিই বরখাস্তের জন্য যাত্রীদের সাথে অসদাচরণের অভিযোগকে সামনে নিয়ে এসেছে এবং যার সাথে রেলমন্ত্রীও একমত হয়েছেন। এমন বাস্ততবতায় প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, বিনা টিকিটের সেসব যাত্রী টিটিইকে রেলমন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় কেন দিয়েছিলেন? তাদের সত্যিকার পরিচয় রেল কর্তৃপক্ষ যাচাই করেছিলেন কি-না? অধিকন্তু যাত্রীদের সাথে অসদাচরণের অভিযোগ বিষয়ে টিটিই-এর বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে রেলমন্ত্রীর পরিচয় কতোটা প্রভাব বিস্তার করেছিলো? এসব বিষয়ে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
টিআইবি মনে করে যেহেতু রেলমন্ত্রীর আত্মীয়দের জড়িয়ে এ জাতীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে; অধিকন্তু বিনা টিকেটে ভ্রমণকারীগণ রেলমন্ত্রীর পরিচয় ব্যবহার করেছেন, তাই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে নৈতিক অবস্থান থেকে সাময়িক সময়ের জন্য তাঁর পদত্যাগ করা উচিত। পাশাপাশি যে-কোনো ধরনের ভয়ভীতি ও চাপের ঊর্ধ্বে থেকে সংশ্লিষ্টগণ যাতে বিনা টিকেটে ভ্রমণের দায়ে অভিযুক্তদের ও দায়িত্ব পালনকারী টিকিট পরিদর্শকের বরখাস্তের সাথে সংশ্লিষ্টদের ব্যাপারে নির্বিঘ্নে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানায় সংস্থাটি।

