শিরোনাম
বুধ. মার্চ ১৮, ২০২৬

আল-জাজিরার প্রতিবেদন: জলবায়ু সংকটে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে বাংলাদেশি শিশুরা

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে ইলশা নদীর পারে বাড়ি ছিল আলামিনের। গত বছর পর্যন্ত সে ইলশাপারের বাড়িতেই ছিল। কিন্তু নদীভাঙনে বাড়ি ও ফসলি জমি হারানোয় পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসে ১২ বছরের আলামিন। এখন আলামিনের ঠাঁই হয়েছে রাজধানী ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের একটি বস্তিতে।

আলামিনের বাবা নেই। জাহাজভাঙাশিল্পে কাজ করতে গিয়ে মরণব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে কয়েক বছর আগে আলামিনের বাবা মারা যান। তাঁর মা আমিনা বেগমও ওই শিপইয়ার্ডের কর্মীদের জন্য রান্না করতেন। দুজনের আয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে চলত সংসার, আলামিন ছাড়াও পাঁচ ও তিন বছরের অন্য দুই সন্তানের মুখে খাবার জোগাতেন তাঁরা।

আমিনা বেগম বলেন, ‘একসময় আমাদের অভাব ছিল না। আমার স্বামী ও আমি আয় করতাম। কৃষিজমি থেকেও ফসল আসত। আমাদের ছেলে (আলামিন) প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ত।’ তবে এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। আমিনা বেগম জানান, নদী বাড়ি–জমি কেড়ে নেওয়ায় তাঁরা উদ্বাস্তু হয়েছেন। টাকার অভাবে অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। সঞ্চয় যা ছিল, তা–ও শেষ হয়ে গেছে।

আলামিন ও তার পরিবারের দুরবস্থার অন্যতম কারণ বৈরী আবহাওয়া। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণবঙ্গসহ পুরো নিম্নাঞ্চলে ঝড়–বন্যা–ভাঙন অনেক বেড়ে গেছে। এর ফলে এসব এলাকা থেকে হাজারো পরিবার উদ্বাস্তু হয়েছে। ঢাকার বস্তিগুলোয় মানবেতর জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।

উদ্বাস্তু হওয়া পরিবারগুলোর শিশুরাও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম সংকটে পড়েছে। তাদের অনেকেরই পড়াশোনা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও অনেকেই কাজে যুক্ত হয়েছে। আলামিনের মতো কম বয়সেই উপার্জন করে পরিবারের হাল ধরতে হয়েছে।

চরম ঝুঁকিতে বিশ্বের ১০০ কোটি শিশু

জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক তহবিল ইউনিসেফ গত আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশের শিশুরা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও ভারত। আর বিশ্বজুড়ে ৩৩টি দেশের প্রায় ১০০ কোটি শিশু এমন চরম ঝুঁকিতে পড়েছে।

”প্রাথমিক বিদ্যালয়সংক্রান্ত বার্ষিক শুমারিতে গত বছর বলা হয়েছে, দেশে ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। আর শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক কোটির বেশি। কিন্তু গত বছর বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার ১৭ শতাংশের বেশি। সংখ্যার হিসাবে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাট চুকিয়েছে।”

এ বিষয়ে ইউনিসেফের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক জর্জ লারইয়া-আজি বলেন, ‘এবারই প্রথমবারের মতো আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় কয়েক লাখ শিশুর চরম ঝুঁকিতে পড়ার সুস্পষ্ট তথ্য–প্রমাণ পেয়েছি।’ সংস্থাটির কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া বিশেষত খরা, বন্যা ও নদীভাঙন দক্ষিণ এশিয়ার লাখো শিশুকে গৃহহীন করেছে। তাদের প্রয়োজনীয় খাবার, স্বাস্থ্যসেবা ও সুপেয় পানির সংকটে ফেলেছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব শিশু বিদ্যালয় ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

দেশে ১৭ লাখ শিশুশ্রমিক

নদীবিধৌত দেশ হওয়ায় বাংলাদেশে দুর্যোগ, বিশেষত ঝড়, বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু। তাই জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগে এসব শিশুকে খেসারত দিতে হয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকেই।

ইউনিসেফের তথ্যমতে, শহরের বস্তিতে থাকা বেশির ভাগ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যায় না। আর দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ আরও কম। সংস্থাটির গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রায় ১৭ লাখ শিশু নিষিদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। তাদের প্রতি চারজনের মধ্যে একজনের বয়স ১১ বছর কিংবা তারও কম। অনেক মেয়েশিশু গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে। তাদের সঠিক তথ্য ও গল্প গবেষণায় যুক্ত করা কঠিন। তা করা হলে সংখ্যাটি আরও বাড়বে।

ঢাকা ও আশপাশের বস্তিতে বসবাস করা বেশির ভাগ শিশু ট্যানারি, লঞ্চইয়ার্ড, দরজির দোকান, অটোমোবাইল কারখানায় কাজ করে। অনেকে ফল ও সবজির বাজারে মাল টানা এবং বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট কিংবা রেলস্টেশনে কুলির কাজ করে। তাদের বেশির ভাগ দুর্যোগপ্রবণ বিভিন্ন জেলা থেকে উদ্বাস্তু হয়ে ঢাকায় এসেছে।

আর পড়বে না আলাউদ্দিন

ঢাকার একটি সবজিবাজারে মালামাল টানার কাজ করে আলাউদ্দিন। বয়স মাত্র ১০ বছর। কয়েক মাস আগে সে এ কাজে ঢুকেছে। মালামাল টানার পাশাপাশি সবজি ধুয়ে পরিষ্কার করার কাজও করে সে। কাজের ফাঁকে কথা বলতে গিয়ে আলাউদ্দিন জানায়, একসময় তাদের বাড়ি ছিল উত্তর–পূর্বের জেলা জামালপুরে। সেখানে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ত সে। কিন্তু গত বছরের বন্যায় তাদের বাড়ি, কৃষিজমি ও বিদ্যালয় ভবন নদীগর্ভে হারিয়ে হয়। এরপর পরিবারসহ আলাউদ্দিনের ঠাঁই হয় ঢাকার একটি বস্তিতে। এখন তার বাবা ঢাকায় রিকশা চালান। মা একটি বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে খণ্ডকালীন কাজ করেন।

সবজিবাজারে কাজ করে প্রতিদিন আলাউদ্দিন মজুরি পায় মাত্র ১০০ টাকা। এ টাকা সে সংসারের খরচ জোগাতে মা–বাবাকে দিয়ে দেয়। আলাউদ্দিনের বাবা জানান, ঢাকা শহরে পরিবার নিয়ে টিকে থাকতে আলাউদ্দিনের আয় করা ওই ১০০ টাকা তাঁর প্রয়োজন। তা না হলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে। তাই শিশুসন্তানকে তিনি কাজে পাঠান। তাঁর সরল স্বীকারোক্তি, আলাউদ্দিন আর কখনোই বিদ্যালয়ে ফিরতে পারবে না। তিনি বলেন, ‘নিত্যদিনের খরচ জোগানো আর বস্তিঘরের ভাড়া দেওয়ার জন্য আমাকে রিকশা চালাতে হয়। আমি কীভাবে ছেলের পড়াশোনার খরচ দেব?’

পাঁচ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি

গত বছরের বন্যায় দেশের ১০ জেলায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানিয়েছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী। তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। পানি শুকানোর পর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে সংস্কার করে ক্লাস নেওয়ার উপযোগী করা সম্ভব হয়েছে।

বন্যার কারণে দীর্ঘ সময় দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। কেননা এসব এলাকায় বিদ্যালয় ভবন দুর্যোগে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া করোনা মহামারির কারণে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে যেতে পারেনি। এর মধ্য ঝরে পড়েছে বিদ্যালয়গামী অনেক শিশু।

প্রাথমিক বিদ্যালয়সংক্রান্ত বার্ষিক শুমারিতে গত বছর বলা হয়েছে, দেশে ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। আর শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক কোটির বেশি। কিন্তু গত বছর বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার ১৭ শতাংশের বেশি। সংখ্যার হিসাবে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাট চুকিয়েছে।

দায়ী বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও করোনা

এক বছরে এত পরিমাণ শিশু বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর মুহম্মদ মনসুরুল আলম বলেছেন, ঝরে পড়ার এ হার উদ্বেগজনক। অস্বীকার করার উপায় নেই, এটার পেছনে বড় একটি কারণ জলবায়ু পরিবর্তন।

আলমগীর মুহম্মদ মনসুরুল আলম আরও বলেন, গত বছরের বন্যায় দেশে পাঁচ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে দীর্ঘ সময় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যেতে পারেনি। এ সময় ঝরে পড়া শিশুদের অনেকে আর বিদ্যালয়ে ফিরবে না। এসব শিশু পরিবারের আয় বাড়াতে বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়ে পড়েছে।

”এবারই প্রথমবারের মতো আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় কয়েক লাখ শিশুর চরম ঝুঁকিতে পড়ার সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ পেয়েছি”। – জর্জ লারইয়া-আজি, ইউনিসেফের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক।

এ ছাড়া করোনা মহামারিতে দেশে ১৪ হাজারের বেশি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এ তথ্য জানিয়েছেন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সংগঠনের চেয়ারম্যান ইকবাল বাহার চৌধুরী। তিনি বলেন, সাময়িক বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন বিঘ্নিত হয়েছে।

ইউনিসেফ ও ইউনেসকোর যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে মহামারির কারণে শিক্ষাজীবন বিঘ্নিত হওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ। গত অক্টোবরে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। এসব শিশুর মধ্যে রয়েছে ৯ বছর বয়সের রুপা। খুলনার শ্যামনগরে রুপাদের বাড়ি ছিল। গত বছর ঘূর্ণিঝড়ে তা বিধ্বস্ত হয়। এরপর পরিবারের সঙ্গে রুপা আশ্রয় নেয় ঢাকার পাশের একটি বস্তিতে। সেই থেকে আর পড়াশোনা করা হয়নি শিশুটির।

রুপা এখন ঢাকার একটি ফলের বাজারে কাজ করে। ট্রাক থেকে তরমুজ নামানো তার কাজ। মজুরি পায় দৈনিক ১০০ টাকা। পাশাপাশি ঘরে এসে অন্ধ বাবার দেখভাল করার দায়িত্বও পালন করে। মা অন্যের বাড়িতে রান্নার কাজ করেন। রুপার মা বলেন, ‘আমার স্বামী অন্ধ। কাজ করতে পারে না। সংসার চলে না, মেয়েকে পড়াশোনা করাব কেমনে?’

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) জাতীয় প্রকল্প সমন্বয়ক হিসেবে কর্মরত আছেন সৈয়দা মুনিরা সুলতানা। তিনি বলেন, ‘আমি রুপার মতো অনেক মেয়েশিশুকে দেখেছি, যারা বৈরী আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিদ্যালয় ছেড়ে কাজে যক্ত হতে বাধ্য হয়েছে। কেরানীগঞ্জে মেয়েদের পোশাক তৈরির একটা কারখানায় ১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের কাজ করতে দেখে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম।’

সৈয়দা মুনিরা সুলতানা বলেন, তাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছেন, বেশির ভাগই দুর্যোগপ্রবণ খুলনা, বরিশাল ও সাতক্ষীরা থেকে এসেছে। আগে সেখানে বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। এখন ঝরে পড়েছে। সংসারে অর্থ জোগান দিতে কাজ করছে।

অল্প বয়সে কাজে যুক্ত হওয়ার ফলে এসব শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভবিষ্যতের সম্ভাবনার পথ রুদ্ধ হচ্ছে। দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে পড়ছে এসব শিশুর জীবন। এমনটাই বলছেন আইএলওর বাংলাদেশ অফিসের পরিচালক টুমো পটিআইনেন। অন্যদিকে বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি শেলডন ইয়েট বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের খেসারত দিচ্ছে শিশুরা।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *