শিরোনাম
শুক্র. ফেব্রু ২০, ২০২৬

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাধায় এলসি বন্ধ: আমদানিকারকদের ব্যবসায় ধস

চট্টগ্রামের বড় একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান তিন মাস আগে ইউরোপের একটি দেশ থেকে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করতে সেই দেশের অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী চলতি বছরের আগস্টের মধ্যে এসব পণ্য আমদানির ঋণপত্র বা এলসি দেয়ার কথা। সেই অনুযায়ী সব কাগজপত্র জমা দিয়ে ব্যাংকে শতভাগ মার্জিনসহ একটি ঋণপত্র আবেদন জমা দেন। তবে সপ্তাহখানেকের মাথায় তিনি জানতে পারেন তার সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সেই এলসি খুলতে পারেনি। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক তা আটকে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি আটকে দেয়ার ঘটনা বাংলাদেশ নয়, সারা পৃথিবীতেই নজিরবিহীন বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মালিক। শুধু একটি দু’টি ঘটনা নয়, প্রতিদিন এমন শ’ শ’ প্রতিষ্ঠানের এলসি আটকে দেয়া হচ্ছে শুধু ডলার সঙ্কট ধামাচাপা দেয়ার জন্য। বাংলাদেশ ব্যাংক যাদের ঋণপত্র আটকে দিয়েছে, তাদের মধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় খাদ্যপণ্য আমদানি, উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত বড় শিল্পগোষ্ঠীও রয়েছে।

ডলার সংকট কাটাতে আমদানিতে ৩০ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের পণ্যের ঋণপত্র (এলসি) খোলার তথ্য ২৪ ঘণ্টা আগে জানাতে গত ২৮ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্ট নির্দেশনা দেয় ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের।

জানা গেছে, দেশে ডলার সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করেছে। সেই সাথে এই সঙ্কট কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক তার রিজার্ভ থেকে বাজারে ডলার বিক্রি করতে গিয়ে রিজার্ভ কমে এসেছে উদ্বেগজনক পর্যায়ে। তবে এই তথ্য আড়ালে রাখছে সরকার। অভিযোগ উঠেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়িয়ে দেখাতে রেমিট্যান্স আয়ের ভুল তথ্যও উপস্থাপন করা হচ্ছে।

ডলার-সংকট নিরসনে গত ২৮ জুলাই একসঙ্গে চারটি সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সেগুলো হচ্ছে ব্যাংকের ডলার ধারণের সীমা (এনওপি) হ্রাস, রপ্তানিকারকের প্রত্যাবাসন কোটায় (ইআরকিউ) ধারণকৃত ডলারের ৫০ শতাংশ নগদায়ন, ইআরকিউ হিসাবে জমা রাখার সীমা কমিয়ে অর্ধেকে নামিয়ে আনা এবং অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ইউনিটে স্থানান্তর। এ ছাড়া ৩০ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের বেসরকারি যেকোনো আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার ২৪ ঘণ্টা আগে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানানোর নির্দেশনা।

এর আগে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশভ্রমণ বন্ধ করা হয়। দামি গাড়ি, প্রসাধনী, স্বর্ণালংকার, তৈরি পোশাক, গৃহস্থালিতে ব্যবহার্য বৈদ্যুতিক সামগ্রী, পানীয়সহ ৩৮ ধরনের পণ্য আমদানিকে নিরুৎসাহিত করতে ব্যাংকঋণ বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, গত দুই মাস ধরে সরকারি চাপে প্রায় সব ধরণের আমদানি অর্ধেকে নেমে এসেছে। তবে সরকার তা প্রকাশ করছে না। এতে কয়েক মাসের মধ্যে আমদানি নির্ভর পণ্য বাজারে চরম অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে। ইতিমধ্যে এসব পণ্যের দাম দুই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। সেই সাথে আমদানিকারক এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসাও লাটে উঠার উপক্রম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আমদানির পরিসংখ্যান বলছে, গত জুনে পণ্য আমদানির এলসি খোলা হয়েছে ৭৩৮ কোটি ডলার। মে মাসে যা ছিল ৮২০ কোটি ডলার। যদিও জুনে এলসি নিষ্পত্তি প্রায় ১৮ শতাংশ বেড়ে ৮৫৫ কোটি ডলারে ওঠে। তবে এসব নিষ্পত্তি এলসির বড় অংশই আগের মাসগুলোতে খোলা। আর এলসি খোলা কমে যাওয়া মানে এসব পণ্যের সঙ্কট বাড়বে।

দেশে ডলার সঙ্কট চলছে গত ৬/৭ মাস ধরেই। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন সরকার বিষয়টি ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল। তবে তা সম্ভব হয়নি জ্বালানি আমদানিতে ডলার সঙ্কটের তথ্য ফাঁস হওয়ায়। জ্বালানি বিভাগ ডলার সঙ্কটের কারণে জ্বালানি তেল আমদানি করতে পারছে না জানিয়ে এক মাস আগে চিঠি দেয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। জ্বালানি বিভাগের চিঠিতে বলা হয়, জ্বালানি তেল আমদানিতে প্রতি মাসে ১৬ থেকে ১৭টি আমদানি ঋণপত্র খুলতে হয়। ঋণপত্রগুলো সাধারণত সোনালী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংকে খোলা হয়ে থাকে। অভ্যন্তরীণ বাজারে ডলারের ঘাটতি রয়েছে জানিয়ে ব্যাংকগুলো চাহিদা অনুযায়ী ঋণপত্র খুলতে প্রায়ই অপারগতা প্রকাশ করছে। এ ছাড়াও ঋণপত্র খুললেও তেল সরবরাহকারীর মূল্য পরিশোধে দেরি হচ্ছে। একাধিক কিস্তিতে পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে করে জ্বালানি তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে। এই চিঠির পরই ডলার সঙ্কটের বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে উঠে।

বিপিসি সূত্রমতে, গত এপ্রিলের শুরু থেকেই ঋণপত্র খোলা ও তেলের দাম পরিশোধ নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়। মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হলে কিছু ডলার ছাড় করা হয়। এরপর আবার ব্যাংকগুলো অস্বীকৃতি জানাতে থাকলে গত ১৭ মে ও ২৩ জুন দুই দফায় জ্বালানি বিভাগে চিঠি পাঠায় বিপিসি।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *