শিরোনাম
শুক্র. ফেব্রু ২০, ২০২৬

এফডিসি ঘরানার ছবির দিন কি শেষ হয়ে যাচ্ছে!

বিনোদন ডেস্ক: ‘যারা নাটক নির্মাণ করে চলচ্চিত্রে এসেছেন তারা টেলিফিল্ম ছাড়া কিছুই নির্মাণ করতে পারেন না!’- এমন অভিযোগ বহুদিনের। আর অভিযোগ তুলে থাকেন মূলত মূলধারার নির্মাতারা। যাদের বলা হয় এফডিসির নির্মাতা। যারা বাণিজ্যিক ছবি নির্মাণ করে টিকিয়ে রেখেছেন ইন্ডাস্ট্রি! আসলেই কি টিকে আছে ইন্ডাস্ট্রি? এফডিসির নির্মাতাদের ছবিগুলো কি দেখছেন সাধারণ দর্শক? এমন প্রশ্নও উঠেছে বহুবার। নায়ক বাপ্পারাজ তো ক্ষোভ নিয়ে বলেই দিয়েছেন- এখনকার চলচ্চিত্র নিয়ে আমার কোনো ভাবনা নেই। আমার মনে হয় এফডিসির চলচ্চিত্র আর কখনো ঘুরে দাঁড়াবে না। যদি বিশ্বাস না হয় এই কথা আমি লিখে দিতে পারি। এফডিসিতে চলচ্চিত্র নির্মাণের মতো কেউ আর নেই। অন্য মিডিয়া থেকে এখন সিনেমা হবে। এফডিসি থেকে দর্শক দেখবে এমন সিনেমা নির্মাণের কোনো সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি না। সিনেপ্লেক্সকেন্দ্রিক কিছু সিনেমা হয়তো নির্মাণ হবে।’ বাপ্পারাজের কথা ধরেই বলা যায়, সিনেমা দিন দিন চলে যাচ্ছে এফডিসির বাইরে। যার প্রমাণ বর্তমান সময়ের আলোচিত দুই সিনেমা ‘পরান’ ও ‘হাওয়া’। সিনেমা দুটি যথাক্রমে নির্মাণ করেছেন রায়হান রাফি ও মেজবাউর রহমান সুমন।

শুক্রবার সব কটি মাল্টিপ্লেক্সসহ দেশের ২৪টি সিনেমা হলে মুক্তি পেয়েছে মেজবাউর রহমান সুমনের ‘হাওয়া’। মুক্তির আগ থেকে ‘হাওয়া’ নিয়ে দর্শকের প্রবল আগ্রহ লক্ষ করা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতমেতা ঝড় ওঠে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরের সিনেমা হলে প্রথম দিনের দর্শক-সাড়া দেখে বোঝা যাচ্ছে, এই ঝড় শিগগিরই থামবে না। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সিনেপ্লেক্সগুলোর দুই-তিন দিনের আগাম টিকিট আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। ছবির পরিচালক, অভিনেতা থেকে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। অপেক্ষায় ছিলেন মুক্তির পর প্রথম দিনে দর্শক প্রতিক্রিয়া দেখার। প্রথম দিনেই যেন উতরে গেল ‘হাওয়া’। যেসব হলে মুক্তি পেয়েছে, সেখানে যেন ‘হাওয়া উৎসব’ চলছে। ফেসবুকে দুই-একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া বাদে বেশির ভাগই ছবিটি নিয়ে ইতিবাচক রিভিউ দিয়েছেন। চঞ্চল চৌধুরী, শরীফুল রাজ, নাজিফা তুষি ছাড়াও ‘হাওয়া’র বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুমন আনোয়ার, সোহেল মণ্ডল, নাসির উদ্দিন। এদিকে ঈদের ছিব ‘পরাণ’-এর সিনেমা হলের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। শুক্রবার চতুর্থ সপ্তাহে এসে এই সিনেমার হল সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৬টিতে। ঈদে মাত্র ১১ সিনেমা হলে মুক্তি পেয়েছিল ছবিটি। মুক্তির পর থেকে চিত্র পাল্টাতে থাকে। রায়হান রাফি পরিচালিত আলোচিত সিনেমাটি নিয়ে দেশীয় দর্শকের পাশাপাশি চাহিদা বেড়েছে প্রবাসেও। যে কারণে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে জানানো হয়, এটি শিগগিরই ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, মালয়েশিয়া, লন্ডন, ওমান, দুবাই, কানাডাতে মুক্তি পাবে। এর কেন্দ্রীয় চরিত্রে আছেন শরীফুল রাজ, বিদ্যা সিনহা মিম ও ইয়াশ রোহান।

এই দুটি ছবি দর্শকের কাছে জনপ্রিয় হওয়ায় এফডিসির নির্মাতাদের সিনেমা আর এর বাইরের সিনেমা- এমন বিভেদ কিংবা বিভাজনের দেয়াল নিয়ে আবার সামনে এসেছে। খ্যাতিমান পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম বলেছেন, ‘এফডিসির সিনেমা কিংবা এর বাইরের সিনেমার যে দেয়াল সেটা ভেঙে যাক, এটা আমিও চাই। আমাদের দিক থেকে চেষ্টা ছিল এই বিভেদটা ঘোচানোর, কিন্তু অপর দিক থেকে সে রকম কোনো সাড়া পাই না। সিনেমা মানে সিনেমা। এফডিসির ভেতরে আবার বাইরে সেটি কী? আমার নির্মিত সব ছবিই এফডিসির সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে। আসলে ছবি হচ্ছে- ভালো ছবি না হয় খারাপ ছবি। আমি কমার্শিয়াল কিংবা আর্ট ছবি সেভাবে দেখি না।’ নাট্যনির্মাতা অনিমেষ আইচ। তার নির্মিত ‘জিরো ডিগ্রি’ ও ‘ভয়ংকর সুন্দর’ দুটি ছবিই আলোচিত। তিনি বলেন, ‘মানুষ সময়ের দাবি হিসেবে তাদের মতো করেই সবকিছু চাইবে। কোন ছবি ভালো লাগবে, কোন ছবি ভালো লাগবে না। কোন ছবি হিট হবে, কোন ছবি হিট হবে না। আর কারও কথাতেই দর্শকদের কিছু যায় আসে না। কারণ সময়ই তার জবাব দেবে। আর আমরা যদি বিষয়টি নিয়ে কথা বলতেই থাকি, তা হলে তো তারাও ভাববে যে, বিভেদ আসলেই আছে। আর নতুন কিছু করতে গেলে সমালোচনা হবেই, কথা উঠবেই।’

বাস্তবতা হচ্ছে- মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমার গতিপথ থমকে গেছে অনেকটা। নিকট অতীতে যেখানে বছরে শতাধিক সিনেমা মুক্তি পেত, সেখানে এখন সেই সংখ্যাটা ত্রিশের ঘরে। পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারের পানে চেয়ে আছেন এফডিসি ঘরানার নির্মাতারা। অন্যদিকে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের সংখ্যা বাড়ছে। এফডিসির বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো আন্তর্জাতিকভাবে পুরস্কৃত হচ্ছে; দেশের জন্য বয়ে আনছে সম্মান। বাণিজ্যিক ধারার পরিচালকরা মনে করেন, বিকল্প ধারার বেশি চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও সেগুলো কোনো কাজে আসছে না। চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি সোহানুর রহমান সোহান বলেন, ‘চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে মূলধারার চলচ্চিত্র বেশি দরকার। বাজার টিকিয়ে রাখতে হলে কমার্শিয়াল ছবির বিকল্প নেই। দর্শক চায় হলে গিয়ে সিনেমা দেখতে। ইন্ডাস্ট্রি চাঙা করতে বছরে ন্যূনতম ১০টি হিট সিনেমা দরকার।’ চলচ্চিত্রকে দুই ভাগ করতে নারাজ নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল। স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র দিয়ে ইন্ডাস্ট্রি বাঁচবে না- এমনটাই বলছেন বাণিজ্যিক ছবির নির্মাতারা। আপনি কী বলবেন? উত্তরে তিনি বলেন, ‘এটা আমি কোনোমতে মানতে রাজি নই যে, ইনডিপেনডেন্ট সিনেমা দিয়ে ইন্ডাস্ট্রি বাঁচবে না। অথচ গত কয়েক বছরের খতিয়ান দেখলে বোঝা যাবে, বেশিরভাগ সাফল্য এ ধরনের সিনেমা থেকে আসছে।’ বদিউল আলম খোকন বাণিজ্যিক ঘরানার ছবি নির্মাণ করে তৈরি করেছেন নিজের আলাদা পরিচিতি। এফডিসির নির্মাতা হিসেবে তার গায়ে তকমা লেগে গিয়েছে বহু আগেই; কিন্তু তিনি সিনেমাকে এফডিসির কিংবা এর বাইরের বিভাজন করতে নারাজ। তবে সবাই একটি বিষয়ে একমত যে, কখনো এককভাবে চলচ্চিত্রের উন্নয়ন সম্ভব নয়। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া বর্তমানে হলে দর্শক ফেরানো সম্ভব না।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *