শিরোনাম
শনি. জানু ৩, ২০২৬

এক দেশের কূটনীতিক আরেক দেশে কী কী সুযোগ সুবিধা পান, কী বলছে ভিয়েনা কনভেনশন

রাষ্ট্র ব্যবস্থা বহুপ্রাচীন। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে কূটনীতির অংশ হিসেবে এক দেশের কূটনীতিকরা আরেক দেশে অবস্থান করে আসছে। তবে তারা কী ধরণের সুবিধা পাবেন বা তাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হবে সেসব বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে অভিন্ন চুক্তি বা নিয়ম-নীতি ছিল না।

১৯৬১ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণে সই করা হয়েছিল একটি চুক্তি। কূটনীতিকদের আচরণ বিষয়ে ভিয়েনা কনভেনশন অন ডিপলোম্যাটিক রিলেশন হিসেবে পরিচিত এই চুক্তিটি কার্যকর হয় ১৯৬৪ সালের ২৪ এপ্রিল।

জাতিসংঘের এই উদ্যোগের শুরুতে স্বাধীন দেশগুলো ওই চুক্তিতে সই করেছিল। পরে ধাপে ধাপে যেসব দেশ স্বাধীন হতে থাকে তারাও এই চুক্তিতে নিজেদের অন্তর্ভূক্ত করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই চুক্তিতে সই করে ১৯৭৮ সালে।

এই কনভেনশনে মোট ৫৩টি আর্টিকেল বা ধারা রয়েছে। এসব ধারার মাধ্যমে কূটনীতিকদের আচরণ এবং তাদের সম্পর্কে আন্তর্জাতিক আইন মোতাবেক সকল বিষয়াদী উল্লেখ করা হয়েছে। ভিয়েনা কনভেনশনের উদ্দেশ্য ছিল কিছু নিয়ম-নীতি এবং সেগুলো অনুসরণের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উন্নয়ন।

কূটনীতির অংশ হিসেবে এক দেশের কূটনীকিতরা আরেক দেশে অবস্থানকালে তারা কী ধরণের সুবিধা পাবেন বা তাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হবে সেসব বিষয়ে ভিয়েনা কনভেনশনে নিয়ম-নীতি উল্লেখ করা আছে।

ওই চুক্তি অনুযায়ী, কোনো দেশে অন্য কোনো দেশের কুটনীতিক মিশন বা প্রতিনিধিরা অবস্থানকালে তাদের বিভিন্ন ধরণের সুবিধা, নিরাপত্তা, বাসস্থান, আইন প্রয়োগসহ নানা বিষয় নিশ্চিত করে থাক গ্রাহক দেশ। ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, কূটনীতিক এবং গ্রাহক দেশ আচরণ করে থাকে। যার কারণে এই চুক্তি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ভিয়েনা কনভেনশনের উল্লেখযোগ্য নীতি

চুক্তি অনুযায়ী কূটনীতিক সম্পর্ক হবে দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক ঐক্যমতের ভিত্তিতে। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারা বা আর্টিকেল-৯-এ বলা হয়েছে যে, যেকোনো দেশ ওই দেশে নিযুক্ত অন্য দেশের কূটনীতিককে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ বা অগ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা করতে পারে। ওই কূটনীতিক সংশ্লিষ্ট দেশে পৌঁছানোর আগেই তাকে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা যায়। তখন প্রেরক রাষ্ট্রকে (কুটনীতিক ব্যক্তির নিজ রাষ্ট্র) অবশ্যই একটি যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে ওই ব্যক্তিকে প্রত্যাহার করতে হবে। অন্যথায় উক্ত ব্যক্তি (এ কনভেনশনের অধিনস্থ) তার কূটনৈতিক নিরাপত্তা হারাবেন।

একটি দেশের কূটনীতিক মিশনের প্রধানসহ ওই মিশনে কর্মরত যেকোনো ব্যক্তিকে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা যেতে পারে।

এছাড়া একটা দেশে অন্য দেশের মিশন কতটা বড় হবে তাও উল্লেখ করা হয়েছে এই চুক্তিতে। এ চুক্তির ১১ ধারায় বলা হয়েছে যে, আলাদা কোনো চুক্তি না থাকলে কূটনীতিক মিশনের কাজ বিবেচনায় মিশনের আকার যৌক্তিক হতে হবে।

কূটনীতিকদের অফিস কোথায় হবে সেই বিষয়ে চুক্তির ১২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কূটনীতিক মিশন প্রেরণকারী দেশ মিশনের জন্য বরাদ্দকৃত অফিস সীমার বাইরে অন্য কোন জায়গায় কোনো অফিস স্থাপন করতে পারবে না। আর মিশনের অফিস এলাকায় বিদেশি কূটনীতিক মিশন প্রধানের অনুমতি ছাড়া গ্রাহক দেশের সরকারও প্রবেশ করতে পারবে না।

তবে কূটনীতিক মিশনের নিরাপত্তা বিধান করতে হবে গ্রাহক দেশকেই। কূটনীতিক মিশনের প্রাঙ্গন এবং তাদের যানবাহনে তল্লাসি, সেটি ব্যবহার, বাজেয়াপ্ত বা সংযুক্তি কোন কিছুই করা যাবে না।

মিশনের প্রধানকে ওই মিশন এলাকা সম্পর্কিত বিষয়ে সব ধরণের জাতীয়, আঞ্চলিক বা মিউনিসিপালের বকেয়া ও করের বাইরে রাখতে হবে অর্থাৎ তাদের এ সম্পর্কিত কোন কর দিতে হয় না।

কূটনৈতিক মিশনের প্রাঙ্গণ, রাষ্ট্রদূতদের বাড়ি ইত্যাদি অলঙ্ঘনীয়। স্বাগতিক দেশ কখনই মিশন প্রাঙ্গনে তল্লাশি করবে না, মিশনের নথি বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারবে না এবং মিশনকে অনুপ্রবেশ বা ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে।

কূটনৈতিক মিশনের আর্কাইভ ও নথিগুলো অলঙ্ঘনীয়। স্বাগতিক সরকার সরকার এগুলো বাজেয়াপ্ত করতে পারবে না।

স্বাগতিক দেশকে অবশ্যই মিশনের কূটনীতিক এবং তাদের নিজ দেশের মধ্যে অবাধ যোগাযোগের অনুমতি দিতে হবে। মারাত্মক কোন অভিযোগ না থাকলে কূটনীতিক এজেন্টদের ব্যাগও তল্লাসি করা যাবে না। কূটনৈতিক কুরিয়ারকে কখনই গ্রেপ্তার বা আটক করা যাবে না।

কূটনীতি মিশনের দাপ্তরিক কাজে ব্যবহার এবং কূটনীতিক ও তার পরিবারের সদস্যদের গৃহকর্মে ব্যবহৃত যেকোন পণ্য আনা হলে তা সব ধরণের শুল্ক ও করের বাইরে থাকবে।

ভিয়েনা কনভেনশনের আর্টিকেল ২৬ এ বলা হয়েছে যে, কূটনীতিক মিশনের সব সদস্য ওই দেশের সবখানে স্বাধীন ও অবাধে চলাচল করতে পারবে। শুধু জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে সংরক্ষিত এলাকায় তাদের প্রবেশ সীমাবদ্ধ হবে।

চুক্তির ২৭ ধারায় বলা হয়েছে যে, দাপ্তরিক কাজের জন্য মিশনের স্বাধীন যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কুটনৈতিক কুরিয়ার, কোডেড বার্তা পাঠানোসহ যেকোন ধরণের যোগাযোগ করতে পারবে তারা। তবে ওয়্যারলেস ট্রান্সমিটার বসাতে হলে অবশ্যই গ্রাহক দেশের সরকারের অনুমতি লাগবে।

ভিয়েনা কনভেনশনের ২৯ ধারা অনুযায়ী, বিদেশি কূটনীতিকদের আটক বা গ্রেপ্তার করা যাবে না। তারা গ্রাহক দেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার বাইরে থাকবে। এমনকি তারা কোন ঘটনায় সাক্ষ্য দিতে বাধ্য থাকবেন না।

চুক্তির ৪১ নম্বর ধারার এক নং উপধারায় বলা হয়েছে, যেসব ব্যক্তি অন্য কোন দেশে কূটনীতিকের মর্যাদা ও সুবিধা ভোগ করেন তারা ওই দেশের আইন ও নীতি মেনে চলতে বাধ্য থাকবেন। এছাড়া তারা ওই দেশের অভ্যন্তরীণ কোন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না।

কিছুদিন আগে জাপানের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করার পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাকে এই উপধারাটি মেনে চলার কথাই বলা হয়েছিল। এই ধারায় আরো দুটি উপধারা রয়েছে।

আর্টিকেল ৩১-এ উল্লেখ রয়েছে, যেকোনো ধরনের অপরাধমূলক বিচারের আওতা থেকে কূটনীতিকরা মুক্ত থাকবেন। এ কনভেনশন অনুযায়ী কূটনীতিকদের বিচার করা সম্ভব নয়।

তবে ‘কোনো কূটনীতিক যদি অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়েন এবং তিনি যে দেশের নাগরিক তারা যদি তার কূটনৈতিক অব্যাহতি (ইমিউনিটি) প্রত্যাহার করে, তবেই তিনি যে দেশে অপরাধ করেছেন, সে দেশে বিচার করা সম্ভব’।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *