শিরোনাম
শুক্র. ফেব্রু ২০, ২০২৬

দেশের মানুষকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলার আহ্বান জানালেন ড. ইউনূস

  • যে দোষ করি নাই সেই দোষে শাস্তি পেলাম
  • বিশ্ব মিডিয়ায় ড. ইউনূসের রায় নিয়ে প্রতিবেদন
  • বাংলাদেশের মানবাধিকারের স্বরূপ প্রকাশ পেয়েছে: অ্যামনেস্টি

দেশের মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলার আহ্বান জানিয়েছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শ্রম আদালতের রায় নিয়ে এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, “আমি আমার সাধ্যমতো বাংলাদেশের জনগণের সেবা করে যাব ও সামাজিক ব্যবসার আন্দোলনে কাজ করে যাব। আমার আইনজীবীরা আদালতে দৃঢ়ভাবে যুক্তি দেখিয়েছেন, আমার বিরুদ্ধে এই রায় সব আইনি নজির ও যুক্তির পরিপন্থি।”

একই সাথে দেশের সবাইকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলার আহ্বান জানিয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, “আমি বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিককে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে এক কণ্ঠে কথা বলার আহ্বান জানাই ।“

যে দোষ করি নাই সেই দোষে শাস্তি পেলাম

ঢাকার শ্রম আদালতে ৬ মাসের দণ্ড পাওয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, যে দোষ করি নাই, সেই দোষে শাস্তি পেলাম। এটাকে যদি ন্যায়বিচার বলতে চান, বলেন। এটা আপনার ইচ্ছা। মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ২০২৪ সালের প্রথম দিনে আমরা আদালতে রায় শোনার জন্য এসেছিলাম। কিন্তু এসে মনটা ভরে গেল। আমার অনেক বন্ধু-বান্ধব পেয়ে গেলাম। যাদের সঙ্গে আমার বহুদিন দেখা হয় নাই। তারা আজকে এসেছেন। এই আনন্দের দিনে যে কী রায় হয়েছে এবং কী অবস্থা দাঁড়ায়, এটা দেখার জন্য। আমি খুব খুশি তাদের দেখে।

এদিকে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ‘শায়েস্তা’ করার জন্য শ্রম আইন লঙ্ঘন মামলায় ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তার আইনজীবী আবদুল্লাহ-আল-মামুন।

রায় ঘোষণার পর আদালত থেকে বের হয়ে বিকেল ৪টার দিকে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘এই রায় অন্যায়, এই রায় জনগণের বিরুদ্ধে, এই রায় আইন বিরোধী। আমরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আমরা আপিল করব।’

তিনি দাবি করেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষ কোনো কিছু প্রমাণ করতে পারেনি। আমরা ১০৯টি কন্ট্রাডিকশন দিয়েছি। একটা কন্ট্রাডিকশন দিলেই খুনির আসামিও খালাস পেয়ে যায়। অথচ, ১০৯টা কন্ট্রাডিকশন দিয়েছি, ১০৫টা সাজেশন দিয়েছি, তারপরও এই রায়।’

‘ড. ইউনূসের মামলার জন্য এক মাসে ৯-১০টা তারিখ দিয়েছেন। এই মাসে তিনটা কোর্ট এসেছে। কোনো কোর্টের এজলাস তৈরি করা হয়নি। ১৫ দিনের জন্য আইনজীবীকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। নিজেরা এজলাস তৈরি করে, তড়িঘড়ি করে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত আদালত পরিচালনা করার ইতিহাস তৈরি করে আজকের এই রায় ঘোষণা করা হয়েছে,’ যোগ করেন তিনি।

বিশ্ব মিডিয়ায় ড. ইউনূসের রায় নিয়ে প্রতিবেদন

শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ চার জনকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয়ার সংবাদ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতসহ অন্যান্য দেশের আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলো। সংবাদ প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক আল-জাজিরা, চীনের সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, এবিসি, গালফ নিউজ, ফ্রান্স২৪, দ্য গার্ডিয়ান, ব্লুমবার্গ, এএফপি, বিবিসি, ইয়াহু নিউজ, রয়টার্স, হিন্দুস্তান টাইমস, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতো প্রভাবশালী গণমাধ্যম।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, প্রফেসর ইউনূসকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে বাংলাদেশের আদালত। তবে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন। ৮৩ বছরের ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা। লাখ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যতা থেকে বের করে আনার জন্য তিনি ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। তাকে বিশ্বজুড়ে ক্ষুদ্রঋণের অগ্রদূত বলে বর্ণনা করে বার্তা সংস্থাটি। কারাদণ্ড পাওয়ার পর ইউনূসের বক্তব্য তুলে ধরেছে মার্কিন গণমাধ্যম এবিসি নিউজ। গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, প্রফেসর ইউনূস একজন অর্থনীতিবিদ। তিনিসহ তার কোম্পানির তিন কর্মকর্তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত। রায়ের পর ইউনূস বলেন, আমার বিরুদ্ধে এই রায় সব আইনি নজির ও যুক্তির পরিপন্থি। আমি বাংলাদেশের জনগণকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং আমাদের প্রতিটি নাগরিকের জন্য গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে এক কণ্ঠে কথা বলার আহ্বান জানাই। ভারতীয় গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস শিরোনাম করেছে, ‘বাংলাদেশের আদালতের রায়ে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস কারাগারের মুখোমুখি’। খবরে লেখা হয়েছে, শ্রম আইন লঙ্ঘনের অপরাধে নোবেলজয়ী প্রফেসর ইউনূসকে দোষী সাব্যস্ত করেছে বাংলাদেশের আদালত।

ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শান্তিতে নোবেল বিজয়ী বাংলাদেশি মুহাম্মদ ইউনূস ছয় মাসের কারাদণ্ডের মুখোমুখি হয়েছেন। গত সোমবার শ্রম আইনের একটি মামলার রায়ে তাকে কারাদণ্ড দেয়া হয়। যদিও তার সমর্থকরা এই মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ করেছেন। প্রতিবেদনে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করার কৃতিত্ব দেয়া হয় ৮৩ বছর বয়সী ইউনূসকে। তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইউনূসের বিরুদ্ধে দরিদ্রদের ‘রক্ত চোষার’ যে অভিযোগ এনেছেন তাও উল্লেখ করা হয় ওই রিপোর্টে। রায়ের আগে প্রধান প্রসিকিউটর খুরশিদ আলম খান এএফপিকে বলেন, আমরা প্রমাণ করেছি যে, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং অন্যরা শ্রম আইনের বাধ্যতামূলক প্রয়োজনীয়তা লঙ্ঘন করেছেন।

একই দৃষ্টিকোণ থেকে রিপোর্ট করে আল-জাজিরাও। কাতারভিত্তিক গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে এক মাসের মধ্যে আপিলের শর্তে জামিন মঞ্জুর করা হয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্টে ইউনূস সমর্থকদের এই রায়কে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ দাবি করার বিষয়টিকে তুলে ধরা হয়েছে। খবরে বলা হয়, শ্রম আদালতের বিচারক শেখ মেরিনা সুলতানা গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান হিসেবে আইন লঙ্ঘনের দায়ে ইউনূসকে ছয় মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেন।

সিবিএস জানিয়েছে, ইউনূস এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ৮৩ বছর বয়সী এই অর্থনীতিবিদ সাংবাদিকদের বলেন, আমরা যে অপরাধ করিনি তার জন্য শাস্তি দেয়া হচ্ছে। এটাই আমার ভাগ্য, জাতির ভাগ্য। আমরা এই রায় মেনে নিয়েছি, কিন্তু এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবো।

চীনের সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট লিখেছে, প্রফেসর ইউনূস দরিদ্রদের মধ্যেও যারা দরিদ্র তাদের ব্যাংকার হিসেবে পরিচিত। এই গরিব মানুষেরাও যাতে তাদের খামার বা ব্যবসা বড় করতে বিনিয়োগ করতে পারে এবং নিজেদের উপার্জন বাড়াতে পারে, তার জন্যই কাজ করেছেন ইউনূস। কিন্তু তার জনপ্রিয়তার কারণে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শত্রু হয়ে উঠেছেন।

এর আগে প্রফেসর ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পর থেকেই উদ্বেগ জানিয়ে আসছিল বিশ্ব নেতারা। গত আগস্টে এক খোলা চিঠিতে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি-মুনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১৬০ নাগরিক ইউনূসের বিরুদ্ধে ‘অব্যাহত বিচারিক হয়রানির’ নিন্দা জানান। চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে শতাধিক নোবেল বিজয়ী ছিলেন। ইউনূসের বিরুদ্ধে ‘বিচারিক হয়রানি’ বন্ধের আহ্বান জানায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও। ইউনূসের সাজা ঘোষণার পর মানবাধিকার সংস্থাটি বলেছে, তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের মানবাধিকারের স্বরূপ প্রকাশ পেয়েছে: অ্যামনেস্টি

শান্তিতে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দোষী সাব্যস্ত করার মধ্যমে বাংলাদেশের মানবাধিকারের স্বরূপ প্রকাশ পেয়েছে বলে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আদালতের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছে।

সোমবার ড. ইউনূস ও তার তিন সহকর্মীকে শ্রম আইনে দোষী সাব্যস্ত করে আদলত ৬ মাসের কারাদণ্ড ঘোষণার পর এক্স অ্যাকাউন্টে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয় এ মন্তব্য করেছে।

অ্যামনেস্টি বলেছে, ৮৩ বছর বয়সি ড. ইউনূস ও তার তিন সহকর্মীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ২০০৬ সালের শ্রম আইনের অধীনে দোষী সাব্যস্ত করে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ড. ইউনূসকে দোষী সাব্যস্ত করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানবাধিকারের চিত্র ফুটে উঠেছে, যেখানে কর্তৃপক্ষ স্বাধীনতাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। সমালোচনাকে পিষে মেরেছে। বাংলাদেশে যেখানে শ্রম অধিকার সংক্রান্ত অন্য মামলাগুলো আদালতে চলে অত্যন্ত শম্বুকগতিতে, সেখানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলা শেষ করা হয়েছে একেবারেই অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে।

অ্যামনেস্টি আরও লিখেছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থের জন্য শ্রম আইনের লঙ্ঘন এবং বিচারব্যবস্থার অপব্যবহার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনেরই লঙ্ঘন।  অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মনে করে, দেওয়ানি ও প্রশাসনিক বিষয়ের অধীনস্থ অভিযোগে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার সহকর্মীদের বিরুদ্ধে যেভাবে ফৌজদারি প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়েছে, তাতে এর মধ্য দিয়ে শ্রম আইন ও বিচারব্যবস্থাকে নগ্নভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে। সেই সঙ্গে এর মাধ্যমে তার কাজ ও ভিন্নমতেরও একরকম রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছে।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *