ড. সেলিম জাহান। ইউএনডিপির মানব উন্নয়ন রিপোর্ট দপ্তরের সাবেক পরিচালক এবং মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের মুখ্য রচয়িতা। ১৯৯২ সালে ইউএনডিপিতে যোগদানের আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। আইএলও, ইউএনডিপি, ইউনেসকো ও বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেছেন। অতিথি অধ্যাপকের দায়িত্ব পালন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটিতে। সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির পাশাপাশি বিশ্বায়নের অভিঘাত ও মানব সম্পর্কের গতিবিধি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহরাব হাসান।
সোহরাব হাসান: সম্প্রতি আপনি এক সেমিনারে বলেছেন, মানুষে মানুষে সম্পর্ক এখন ব্যবসায়িক হয়ে গেছে। আপনার এই উপলব্ধি হলো কেন?
সেলিম জাহান: মানুষে মানুষে সম্পর্কের দুটি দিক আছে—আত্মিক ও আর্থিক। আমার মনে হয়েছে, অধুনা বাংলাদেশে আর্থিক বিষয়টিই প্রবল হয়ে উঠেছে, আত্মিক সম্পর্কটা পেছনে পড়ে গেছে। মনে হয় অর্থ, স্বার্থ ও বিত্তই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। এ জন্যই আমি ব্যবসায়িক বা স্বার্থের সম্পর্কের কথা বলেছি। ষাট ও সত্তরের দশকে আমরা যখন বড় হয়েছি, তখন অর্থকে সব সময় সম্পর্কের মাপকাঠি ধরা হতো না, কিন্তু এখন সব ক্ষেত্রেই অর্থ ও স্বার্থ দাপট দেখাচ্ছে। এটি একটি বিরাট সামাজিক বিচ্যুতি, কিন্তু মানুষের মধ্যে এ নিয়ে অস্বস্তি দেখছি না; যেন সবাই স্বাভাবিকভাবেই এটা মেনে নিচ্ছে।
সোহরাব হাসান: এটি কি আগ্রাসী পুঁজিবাদী অর্থনীতির ফল?
সেলিম জাহান: সেটি অস্বাভাবিক নয়। পুঁজিবাদ যখন সম্পদ পুঞ্জীভূত করে, তখন আর্থিক স্বার্থই অগ্রাধিকার পায়। আবার সামাজিক দর্শন বা চিন্তাভাবনার পরিবর্তনের কারণেও হতে পারে। সবাই এখন অর্থবিত্ত ও চাকচিক্যের পেছনে ছুটছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার প্রতিযোগিতা। এটি নিঃসন্দেহে পুঁজিবাদের ফল।
সোহরাব হাসান: কিন্তু অর্থনীতির এই সম্পর্ক কীভাবে মানবিক করা যায়?
সেলিম জাহান: রাষ্ট্রের পরিচালকেরা সব সময় আর্থিক প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু প্রবৃদ্ধি আর উন্নয়ন সমার্থক নয়। দেখতে হবে, যে প্রবৃদ্ধি ঘটছে, তা সমতা আনছে, না বৈষম্য বাড়াচ্ছে। প্রবৃদ্ধি বৃহত্তর জনগণের জীবনযাত্রার মান বাড়াচ্ছে, না কমাচ্ছে। প্রবৃদ্ধি পরিবেশকে নষ্ট করছে, না রক্ষা করছে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ব্যক্তিমানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। এর অর্থ হলো, সমাজের প্রত্যেক মানুষকে সক্ষম করে তোলা। সবাইকে নিয়ে এগিয়ে চলা। সিদ্ধান্তের সুযোগ থাকা। সেই অর্থেই উন্নয়ন মানুষের স্বাধীনতাকে বর্ধিত করে। তবে দেখতে হবে একজনের স্বাধীনতা কি অন্যের কাজে লাগছে, না ক্ষতি করছে। সমাজে ভিন্নমত, ভিন্নচিন্তা থাকবে। প্রশ্ন হলো, সেই মতভেদ আমরা কীভাবে মীমাংসা করছি—আলোচনা না জবরদস্তির মাধ্যমে? অতীতে দেখেছি, প্রাকৃতিক বা মানবিক বিপর্যয়ে রাষ্ট্রের আগে সমাজই এগিয়ে আসত। বিপন্ন মানুষকে সাহায্য করত। এটাই যৌথতা। এখন সেই যৌথতা অনেকটা ভেঙে পড়ছে। মানুষ অনেক বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। এর পেছনে শুধু পুঁজিবাদ নয়, বিশ্বায়ন ও নগরায়ণেরও প্রভাব আছে।
সোহরাব হাসান: আপনি যে মানবিক সমাজের কথা বলেছেন, সেটি করতে রাষ্ট্রকেও তো এগিয়ে আসতে হবে।
সেলিম জাহান: রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে—এই যে উন্নয়ন হচ্ছে, তার সুফল সবার কাছে পৌঁছেছে কি না। রাষ্ট্রের একটি সমাজচিন্তা থাকতে হবে—যেখানে কাউকে পেছনে ফেলে নয়, সবাইকে নিয়ে এগোতে হবে। সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে এখন যে নারী ও শিশু ধর্ষণ ব্যাপক রূপ নিয়েছে, তার কারণ সামাজিক অবক্ষয়। ভাবা যায়, তিন বছরের শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। অনেকে বলেন, এর পেছনে মাদক কাজ করছে। কিন্তু এই মাদকের পেছনেও আছে অর্থ। মাদকের পেছনে যে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা, সেটি বন্ধ না করে শুধু এর বাহককে ধরলে অপরাধ কমবে না। আরেকটি হলো, এখানে যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিচারের ক্ষেত্রে কে কোন দলের, সেই পার্থক্য করা যাবে না। রাষ্ট্র যদি এ কাজগুলো করতে পারে, তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
সোহরাব হাসান: উন্নয়নের ঊর্ধ্বসূচকের সঙ্গে মানবিক সূচকের নিম্নগতিকে কীভাবে দেখছেন?
সেলিম জাহান: সমাজের সর্বত্র ক্ষমতা, অর্থ ও অস্ত্রের যে দানবীয় রূপ দেখছি, তাতে মানবিকতা আশা করা যায় না। একদা বাঙালি সহনশীল জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল। তাদের মধ্যে বিতর্ক ছিল, আলোচনা ছিল, কিন্তু অসহিষ্ণুতা ছিল না। আগে অন্য ধর্মের প্রতি, অন্য মতের প্রতি মানুষ সহনশীল ছিল, এখন সেটি আস্তে আস্তে লোপ পাচ্ছে। আমি পরিহাস করে একটি কথা বলি, ঢাকা শহরে কিছুই আর ঢাকা নেই। সবকিছু খোলা-জবরদস্তি, জুলুম, অনাচার ইত্যাদি। বাসে-পথে মানুষের অসহায়ত্ব দেখেছি। কোনো প্রতিকার নেই।
সোহরাব হাসান: রাষ্ট্র যখন অধিক মাত্রায় কর্তৃত্বপরায়ণ হয়, তখন কি সেটি সম্ভব?
সেলিম জাহান: একটি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি এটা হতে পারে না যে তারা শুধু ক্ষমতাবান ও বিত্তশালীদের কথা শুনবে—সমাজে যারা প্রান্তিক, দুর্বল, তাদের মতকে উপেক্ষা করবে। সত্যি কথা বলতে কি, শুধু রাষ্ট্র নয়, রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও ব্যক্তিজীবন সর্বত্রই ভিন্নমতের প্রতি একধরনের অসহিষ্ণুতা আছে। এ কারণেই আমি মানবিকতার উন্নয়নের ওপর জোর দিই। যৌথতাকে গুরুত্ব দিই।
সোহরাব হাসান: দীর্ঘদিন আপনি মানবসম্পদ নিয়ে কাজ করেছেন। বাংলাদেশে উন্নয়নের গতিবিধিকে কীভাবে দেখছেন?
সেলিম জাহান: আমি কিছুটা বিভ্রান্ত। সীমিত অর্থে যে উন্নয়ন, সেটি এখানে হয়েছে। প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, মানুষের গড় আয়ু, গড় আয় বেড়েছে। শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, কিন্তু মানবিকতার উন্নয়ন ঘটেনি। সমাজে অস্থিরতা বেড়েছে। কত দ্রুত বিত্তবান হওয়া যায়, সেই প্রতিযোগিতা বড় হয়ে উঠেছে। অসহিষ্ণুতা ও অসহনশীলতা বেড়েছে। কেউ আলোচনা বা তর্কের ধার ধারে না। অন্যের মতামতকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে থামিয়ে দিতে চায়। সে বলপ্রয়োগ পেশিশক্তিই হোক বা কণ্ঠরোধই হোক, তার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান করতে চায়।
সোহরাব হাসান: গণতন্ত্র না থাকার কারণেই কি এসব হচ্ছে না?
সেলিম জাহান: আমি গণতন্ত্রকে বিস্তৃতভাবে দেখি। নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের একটি উপাদান। গণতন্ত্রের আসল কাজ হচ্ছে অংশগ্রহণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। গণতন্ত্রের কথা হচ্ছে ভিন্নমত ও সংগঠিত হওয়ার অধিকার। এগুলো সংকুচিত হলে গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার মধ্যে একটি আঁতাত তৈরি হয়েছে এবং অতি ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠী তার সুফল পাচ্ছে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষিত হচ্ছে।
সোহরাব হাসান: বিশ্বব্যাপী আমরা কর্তৃত্ববাদের উত্থান লক্ষ করছি। এটি কি মানবিকতাকে আরও খর্ব করছে না?
সেলিম জাহান: শুধু কর্তৃত্ববাদ নয়, চরম ডানপন্থার উত্থান ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বলা যায়, উগ্র শ্বেতাঙ্গবাদ। ব্রিটেনে ‘ব্রিটিশবাদ’ ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চলতে চায়। ভারতে হিন্দুত্ববাদের উত্থান ঘটেছে। এই চরম ডানপন্থা মানুষের অধিকার ও সৃজনশীলতাকে খর্ব করে। তবে আমি মনে করি, এটি স্থায়ী হবে না। মানুষ দীর্ঘ সময়ের জন্য এই অবস্থা মানবে না। ষাট ও সত্তরের দশকে উদারবাদ ও গণতন্ত্রের জাগরণ ঘটেছিল। আবার উদারবাদ ফিরে আসবে।
সোহরাব হাসান: এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? এখানে তো সেই অর্থে ডানপন্থার উত্থান ঘটেনি। কিন্তু রাষ্ট্রে কর্তৃত্ববাদ জেঁকে বসেছে।
সেলিম জাহান: অনেকেই রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী ভূমিকার কথা বলেন। আমি দূরে থাকি, সে জন্য হয়তো এর পুরোটা বুঝতে পারি না।
সোহরাব হাসান: কিন্তু প্রতিবাদ তো নেই। এর কারণ ভয় না প্রলোভন?
সেলিম জাহান: আমি মনে করি, দুটোই। বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বাংলাদেশের জনগণ সব সময় বুদ্ধিজীবীদের দিকে তাকিয়ে থাকত। তাঁদের পরামর্শ মানত। এমনকি রাজনীতিকেরাও। এখন মনে হচ্ছে সেই অবস্থা নেই। মানুষ বুদ্ধিজীবীদের ওপর আস্থা অনেকটা হারিয়ে ফেলছে। বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ প্রলোভনের কাছে পরাজিত হয়েছেন। তারপরও আমি আশা হারাতে চাই না। আমাদের অনেক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি আছেন, যাঁরা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, অনাচারের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন।
সোহরাব হাসান: বাংলাদেশে যে হারে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, সেই হারে কর্মসংস্থান বাড়ছে না।
সেলিম জাহান: এটি কেবল বাংলাদেশে ঘটছে তা নয়, পৃথিবীর আরও অনেক দেশে এ ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি কমছে। কিন্তু এই খাতে এখনো ৬৫ শতাংশ মানুষ নিয়োজিত। শিল্পে স্বয়ংক্রিয়তা ও আধুনিক প্রযুক্তির কারণে জনবলের চাহিদা কমতে পারে। আমরা যাকে বলি কর্মশূন্য প্রবৃদ্ধি। কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে শ্রমঘন খাত, যেমন পোশাকশিল্প, পরিবহন ও সেবা খাতে বেশি বিনিয়োগ করতে হবে।
সোহরাব হাসান: এই মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা?
সেলিম জাহান: সমাজ জীবনের অসহিষ্ণুতা, মানুষে মানুষে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া বড় সমস্যা। অর্থনীতির ভাঙন হয়তো অন্যের সহায়তায় রোধ করা যায়, কিন্তু সমাজের ভাঙন রোধ করা কঠিন। দ্বিতীয় সমস্যা হলো দুর্নীতি। দুর্নীতি সমাজে আগেও কমবেশি ছিল, এখন রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে।
সোহরাব হাসান: নতুন প্রজন্ম সম্পর্কে আপনি কি আশাবাদী?
সেলিম জাহান: আমি অবশ্যই আশাবাদী। স্বাধীনতার পর কটি প্রজন্ম চলে গেছে, কিন্তু আজকের প্রজন্ম—যারা কিশোর আলো পড়ে, বিজ্ঞান চিন্তা পড়ে, নতুন নতুন উদ্যোগে নিজেদের শামিল করছে। একটা সময় ছিল, দেশ থেকে মেধাবীরা বিদেশে যেত। ফিরত না। এখন বিদেশে পড়াশোনা শেষে অনেকে দেশে ফিরে আসছে। এর একটি কারণ, পশ্চিমা দেশগুলোতে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। ওখানে সুযোগ কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে দেশে সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশে বহু সৃজনশীল কাজ হচ্ছে। সমাজের মধ্যে এগুলো ছড়িয়ে দিতে পারলে বাংলাদেশ বদলাবে।
সোহরাব হাসান: দেশে শিক্ষার বর্তমান হাল কী? টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাঙ্কিং(মানক্রমে) দেখা যায় বিশ্বের সেরা এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই।
সেলিম জাহান: আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন কোথায় সংস্কার জরুরি, আমি বলব শিক্ষা, শিক্ষা এবং শিক্ষা। সত্যি বলতে কি, আমাদের শিক্ষার অবস্থা খুবই শোচনীয়। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু তারা কী শিক্ষা পাচ্ছে, সেসব নিয়ে আমরা ভাবছি না। পৃথিবীর কোনো শহরে এত বিশ্ববিদ্যালয় আছে আমি শুনিনি। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের মানের বিষয়টিও এসে যায়। শিক্ষা এমন একটি বিষয়, যেখানে আপস চলে না। যাঁরা পাস করে বেরোচ্ছেন, তাঁরা সনদপ্রাপ্ত হলেও শিক্ষাপ্রাপ্ত নন। এ ছাড়া শিক্ষাঙ্গনে দুর্নীতি ঢুকে গেছে।
সোহরাব হাসান: আপনি যখন মানবিক শিক্ষার কথা বলছেন, তখন একটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করব। বছর দুই আগে স্কুলের পাঠ্যবই অদলবদল করা হয়েছে। মন্ত্রী যুক্তি দেখিয়েছেন, যাঁরা পাঠ্যবই পরিবর্তন চেয়েছেন, তাঁরা অনেক বেশি শক্তিশালী, সে কারণে সরকার তাঁদের দাবি মেনে নিয়েছে।
সেলিম জাহান: পাঠ্যবই পরিবর্তনের কোনো যুক্তি খুঁজে পাই না। এটি খুবই নেতিবাচক কাজ হয়েছে। যাঁদের লেখা বাদ দেওয়া হয়েছে, তাঁরা সবাই বাম চিন্তার লোক, তা-ও নন। তাঁরা সবাই হিন্দুধর্মাবলম্বী, তা–ও নন। এর মধ্যে কবি গোলাম মোস্তফার প্রার্থনা কবিতাও আছে। ভ্রমণ কাহিনি আছে। মনে রাখতে হবে, পাঠ্যবই হলো একটি জাতির মানস গঠনের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। কোনো সংগঠন দাবি করলেই সেটি অদল বদল করা যায় না। এখন অন্য সংগঠন যদি বলে, অমুক লেখা বাদ দিতে হবে। তাহলে কী পরিস্থিতি হবে? পাঠ্যসূচি তৈরি করা হয় দেশের সেরা লেখক-বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শে। পাঠ্যসূচিতে কী থাকবে, কী থাকবে না, তা ঠিক করবেন শিক্ষাবিদেরা।
সোহরাব হাসান: শিক্ষার মানের এই অবনতির কারণ কী? প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদের কী করতে হবে?
সেলিম জাহান: একটি কারণ পাঠ্যবইয়ের মধ্যে আটকে থাকা। আমাদের সময়ে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই পাঠ্যবইয়ের বাইরেই বেশি শিখেছে। এখন পরীক্ষায় ভালো করাই মূল লক্ষ্য, জ্ঞান বৃদ্ধি নয়। তারপরও বলব, আমাদের সময়ে প্রথম দিকে থাকা ১০ জনের চেয়ে এখন প্রথম দিকে থাকা ১০ জনের মান অনেক ভালো। এসব ছেলেমেয়ে যখন বিদেশে যায়, তারা সমানতালে প্রতিযোগিতা করে থাকে। আজ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্ক ফোরামের সভাপতি বাংলাদেশের একটি মেয়ে। এই প্রথম। কিন্তু শিক্ষার গড় মান অনেক নিচুতে। এটাই উদ্বেগের বিষয়।
সোহরাব হাসান: আপনাকে ধন্যবাদ।
সেলিম জাহান: আপনাকেও ধন্যবাদ।

