শিরোনাম
শনি. আগ ২২, ২০২৬

কলকাতায় ‘গঙ্গা চুক্তি পর্যালোচনা’ নিয়ে বৈঠক শুরু

কলকাতা ব্যুরো: ইন্ডিয়া গঙ্গা চুক্তির অধীনে প্রতিশ্রুত পানি ঠিকমত দিচ্ছে কি না, তা পরিমাপের নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ৪ মার্চ বাংলাদেশের একটি দল ফারাক্কা ব্যারাজ এলাকা পরিদর্শন করে।

বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ার মধ্যকার ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই চুক্তি পর্যালোচনা করতে দুদেশের যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) ৮৬তম বৈঠক কলকাতায় শুরু হয়। গত সোমবার কলকাতায় পৌঁছনোর পর মঙ্গলবার ফারাক্কায় পরিদর্শন করেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল। সেখানে পানি পরিমাপের পরিমাপের পর কলকাতায় ফিরে এসে বৃহস্পতিবার স্থানীয় এক হোটেলে বৈঠকে বসেন ইন্ডিয়া-বাংলাদেশের যৌথ কমিটির প্রতিনিধিদল।

কলকাতায় আয়োজিত বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের হয়ে অংশ নেন জয়েন্ট রিভার কমিশনের (জেআরসিবি) সদস্য মোহাম্মদ আবুল হোসেন। তার নেতৃত্বে আছেন জেআরসিবি উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মিদরী জাহান, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মোহাম্মদ শামছুজ্জামান, জেআরসিবি সদস্য (কারিগরি কমিটি) মোহাম্মদ আবুল হোসেন, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (সিলেট) অতিরিক্ত মুখ্য প্রকৌশলী মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (কুমিল্লা) অতিরিক্ত মুখ্য প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু তাহের, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (ঢাকা) হাইড্রো ইনফরমেটিক্স এবং ফ্লাড ফোরকাস্টিং বিভাগের সুপারিন্টেনডেন্ট প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া-১ অনুবিভাগের পরিচালক মো. মনোয়ার মোকাররম, কলকাতাস্থ বাংলাদেশ উপ হাইকমিশনের কাউন্সেলর (রাজনৈতিক) তুষিতা চাকমা, দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রথম সচিব (রাজনৈতিক) আফজল মেহদাত আদনানসহ আরো একজন।

বৈঠকে ইন্ডিয়া সরকারের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন যৌথ নদী কমিশনের সদস্য ও জল-শক্তি মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পদস্থ অফিসার শরত চন্দ্র, ফারাক্কা ব্যারেজের জেনেরাল ম্যানেজার আর ডি দেশপান্ডেসহ অন্যান্যরা।

বৃহস্পতিবার বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা পানি কম পাওয়ার কারণে কী কী সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তা নিয়ে আলোচনা করেন। পানি কম পেলে বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে সেচের সমস্যা হয়। জৈববৈচিত্রের সমস্যা হয়। সুন্দরবন অঞ্চলে সমস্যা হয়। সেগুলো আলোচনায় জানানো হয়। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব মোহাম্মদ আবুল হোসেন এদিনও বলেন, পানি বণ্টন নিয়ে সন্তুষ্ট তারা। তবে, এবছর প্রবাহ কম থাকার জন্য কম পানি পাচ্ছে দুই দেশ।

শুক্রবার দ্বিতীয় দফায় দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের টেকনিক্যাল বৈঠক। এই বৈঠকে দুই দেশেরই আরো কয়েকজন প্রতিনিধির যোগ দেওয়ার কথা। বৈঠকে নদীর পানি সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের পাশাপাশি, বন্যা রিপোর্ট, সীমান্ত নদীগুলোকে কেন্দ্র করে দুই দেশের পরিকল্পনা সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক সিদ্ধান্ত সেই সভায় আলোচিত হওয়ার কথা।

বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ (৩৮%) গঙ্গার পানির ওপর নির্ভরশীল। মূলত বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এই পানির যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ার মধ্যে প্রবাহিত গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ওই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তাতে স্বাক্ষর করেছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়া ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চুক্তির মেয়াদ ছিল ৩০ বছরের। আগামী বছর ২০২৬ সালে সেই মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।

৩০ বছরের সামগ্রিক চুক্তি অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে মে মাস নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি সরবরাহের কথা উল্লেখ রয়েছে। ওই চুক্তিতে বলা হয়, নদীতে ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি পানি থাকলে ইন্ডিয়া পাবে ৪০ হাজার কিউসেক পানি, অবশিষ্ট পানি পাবে বাংলাদেশ। নদীতে ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহ থাকলে বাংলাদেশ পাবে ৪০ হাজার কিউসেক পানি, অবশিষ্ট পাবে ভারত। আবার ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম পানি থাকলে তা প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যেই সমান ভাগে ভাগ হবে।

যদিও বাংলাদেশের সাথে গঙ্গা কিংবা তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আপত্তি জানিয়ে আসছেন মমতা ব্যানার্জি। এমনকি গত বছরের জুন মাসে ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে লেখা তিন পাতার চিঠিতে গোটা বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করে মমতা লিখেছিলেন ‘বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ইন্ডিয়া সফরে ইন্ডিয়ান প্রধানমন্ত্রীর সাথে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গঙ্গা ও তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। রাজ্য সরকারের পরামর্শ ও মতামত ছাড়া এ ধরনের একতরফা আলোচনা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য বা কাম্য নয়। এ ধরনের চুক্তির প্রভাবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমি বুঝতে পেরেছি যে ইন্ডিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফারাক্কা চুক্তি (১৯৯৬) পুনঃনবীকরণের প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় রয়েছে, কারণ এই চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হবে। এটি এমন একটি চুক্তি, যা বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ার মধ্যে পানি বণ্টনের নীতিগুলো বর্ণনা করে এবং আপনি জানেন যে রাজ্যের মানুষের জীবন-জীবিকা বজায় রাখার জন্য ফারাক্কা থেকে পাওয়া পানির বিশাল প্রভাব রয়েছে এবং ফারাক্কা ফিডার ক্যানেলের মাধ্যমে যে পানি আসে, তা কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। তা না হলে গঙ্গায় পলি পড়ে কলকাতা বন্দর তার জাহাজ চলাচলের উপযোগী নাব্যতা হারাবে।’

একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ফারাক্কার পানি বণ্টন চুক্তিতে বঞ্চনার অভিযোগ তুলেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। এমনকি, একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রতিবাদে ভারতজুড়ে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *