বাংলাদেশ, ৩০ ডিসেম্বর: চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি অনেকটাই বেড়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে ঋণের প্রতিশ্রুতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩৩ শতাংশ বেড়ে ১.২১৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একইসঙ্গে ঋণের অর্থছাড়ও ২৬.৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.৯১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
গত অর্থবছরের একই সময়ে (জুলাই-নভেম্বর) ঋণের প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল মাত্র ৫২২.৬ মিলিয়ন ডলার; অর্থ ছাড়ের পরিমাণ ছিল ১.৫৪৩ বিলিয়ন ডলার।
সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) প্রকাশিত ইআরডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশ যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পেয়েছে, তার প্রায় সমপরিমাণ অর্থই ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যয় করতে হয়েছে। এই পাঁচ মাসে বিভিন্ন ঋণের আসল ও সুদ বাবদ বাংলাদেশ মোট ১.৮৯ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, বৈদেশিক ঋণের প্রবাহ বাড়লেও ঋণ প্রাপ্তি ও কিস্তি পরিশোধের মধ্যে ভারসাম্য থাকায় নিট বৈদেশিক অর্থায়নের পরিমাণ খুব একটা বাড়ছে না।
ইআরডি কর্মকর্তারা বলেন, গত অর্থবছরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক অস্থিরতা ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে আস্থার সংকটের কারণে ঋণের প্রতিশ্রুতি অনেক কমে গিয়েছিল। তবে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় এখন প্রতিশ্রুতি ফের বাড়তে শুরু করেছে।
তারা জানান, বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও বাজেট সহায়তার জন্য সরকারের নেওয়া ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপও ক্রমাগত বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী কয়েক মাসের বৈদেশিক ঋণের পরিস্থিতি মূলত নির্ভর করবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। সামনে নির্বাচন, সেটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে অনুষ্ঠিত হবে কি না, সব রাজনৈতিক দল সেই ফলাফল মেনে নেবে কি না—এসব প্রশ্ন এখনো অনিশ্চিত। এই অনিশ্চয়তাই ব্যবসা ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
আন্তর্জাতিক মহল চায় একটি অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হোক, যেখানে সব দল অংশ নেবে এবং ফলাফল মেনে নেবে। এটি এখনো বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও মাসরুর রিয়াজ বলেন, গত অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাস ছিল রাজনৈতিক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ। সরকারের রদবদল ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে উন্নয়ন অংশীদারদের পক্ষ থেকে নতুন প্রতিশ্রুতি ও প্রকল্প অনুমোদনের প্রবণতা কমে গিয়েছিল। এ বছর সেই অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার এখন আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন ব্যয়ের বিষয়ে তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে এসেছে। অর্থাৎ সরকারের রাজস্ব নীতি ও বৈদেশিক সহায়তা ব্যবস্থাপনায় স্পষ্টতা তৈরি হয়েছে।
মাসরুর রিয়াজ বলেন, এখনো অনেক উন্নয়ন অংশীদার নির্বাচনের ফলাফলের দিকে নজর রাখছে। কারণ নির্বাচন শেষে যখন স্থিতিশীল ও নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে, তখন নতুন নীতিনির্ধারক দলের সঙ্গে তারা আলোচনা করে নতুন প্রকল্প অনুমোদন ও প্রতিশ্রুতি বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
ইআরডি কর্মকর্তারা বলেন, বাংলাদেশ বিগত সময়ে অনেক বড় বড় ঋণ নিয়েছে। এর অনেক প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় আসল পরিশোধ শুরু হয়েছে। এ কারণে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এটা আগামীতে আরো বেড়ে যাবে।
ইআরডির তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে বাংলাদেশ ঋণের আসল বাবদ ১.২১৫ বিলিয়ন ডলার ও সুদ বাবদ ৬৭৪.৬ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে। গত বছরের একই সময়ে এই পরিশোধের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১.০৫৫ বিলিয়ন ডলার ও ৬৫৫.১০ মিলিয়ন ডলার।
জুলাই থেকে নভেম্বর সময়কালে সর্বোচ্চ ৫৮১.৭১ মিলিয়ন ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছ থেকে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক থেকে প্রতিশ্রুতি মিলেছে মাত্র ১৮.৪৪ মিলিয়ন ডলারের।
চলতি অর্থবছরের আলোচ্য সময়ে সবেচেয়ে বেশি অর্থছাড় করেছে রাশিয়া। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দেশটি ৫৫২.৮৬ মিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে। এছাড়া বিশ্বব্যাংক ৪২৮.৯৩ মিলিয়ন ডলার, এডিবি ৩৩৫.৩৬ মিলিয়ন ডলার, চীন ১৯৪ মিলিয়ন ডলার, জাপান ৮৮.৮১ মিলিয়ন ডলার ও ভারত ৮৬.৭৭ মিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে।

