শিরোনাম
শুক্র. জানু ৩০, ২০২৬

নির্বাচনী ‘ক্রাউডফান্ডিং’ কতটা আইনসঙ্গত

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে এক নতুন নির্বাচনী কৌশল সামনে এসেছে। কতিপয় প্রার্থী ও দলের এ কৌশল অনেকটা ‘কইয়ের তেল দিয়ে কই ভাজা’র মতো। তারা ভোটে দাঁড়িয়ে জনসাধারণের কাছ থেকেই টাকা নিয়ে খরচ যোগানের আহ্বান জানানো হচ্ছে। ‘ক্রাউডফান্ডিং’ নামের এই কৌশলে অনেকে সফলও হচ্ছেন।

ক্রাউডফান্ডিং কী
ক্রাউডফান্ডিং বা গণতহবিল হচ্ছে কোনো উদ্যোগ সফল করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জন্য ছোট ছোট অনুদান সংগ্রহ; যা সাধারণ মানুষের কাছে চাওয়া হয়। সাধারণত এই অর্থ ফেরত দেওয়া হয় না। পশ্চিমা বিশ্বে এই কৌশল প্রথম দিকে ব্যবসায় শুরু হয়েছিল। পরে তা রাজনৈতিক কার্যক্রমেও চর্চিত হতে দেখা যায়।

২০১৫ সালে যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে স্বল্প পরিসরে ক্রাউডফান্ডিং দেখা যায়। তবে দুই বছরের মাথায় দেশটিতে আবার নির্বাচন ডাকা হলে আগের তুলনায় অনেক বেড়ে যায় ক্রাউডফান্ডিং। এসময় গ্রিন এমইপির মলি স্কট ও তার দলকে ক্রাউডফান্ডিং করতে দেখা যায়। সাবেক লেবার এমপি পিটার কাইল, মারিয়া ইগল ও রাসেল রিইভ এবং ফিল একার্সলিকেও ক্রাউডফান্ডিংয়ে দেখা যায়।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপের আরও কিছু অঞ্চলে জনসাধারণের কাছ থেকে নির্বাচনী খরচ সংগ্রহের নজির দেখা গেছে বিগত সময়ে।
সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে নির্বাচনেও কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ‘ডোনেট ফর দেশ’ নামে দলটি গণতহবিল সংগ্রহ করে সফল হয়।

বাংলাদেশের নির্বাচনেও যে এটি একেবারেই ছিল না, তা নয়। অতীতে বিভিন্ন নির্বাচনে জনসমাবেশে ভোটার, সমর্থকরা নিজ উদ্যোগে অল্প অল্প করে অর্থ দান করে প্রার্থীদের তহবিল গড়ে দিত। তবে ২০২৫ সালে এসে অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।

ক্রাউডফান্ডিংয়ে এগিয়ে যারা
ক্রাউডফান্ডিং করে সবচেয়ে আলোচিত হয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা। দলটি থেকে নির্বাচনে দাঁড়ানোর আলোচনার শুরুতেই তিনি ঢাকা-৯ আসনের ভোটারদের কাছে অর্থ দানের আহ্বান জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহ্বান জানানোর কয়েক দিনের মধ্যেই অনুদান পেয়ে যান ৪৭ লাখ টাকা। যদিও এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসার পর এখন সেই টাকা ফেরত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অনেকের টাকা আবার ফেরতও দিয়েছেন জারা।

ইনকিলাব মঞ্চের প্রয়াত নেতা শরীফ ওসমান হাদীও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করেছিলেন। এদিকে প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পর জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি দলগতভাবেই ক্রাউড ফান্ডিংয়ের ঘোষণা দিয়েছে। দলটির প্রার্থীরাও পৃথকভাবে সংগ্রহ করছেন গণতহবিল। আমজনতার দলের মো. তারেক রহমানও ঘোষণা দিয়ে তহবিল সংগ্রহ করছেন। একইভাবে গণতহবিল সংগ্রহে বেশ সফল হয়েছেন এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও বরিশাল-৩ আসনের প্রার্থী ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদও।

আইন কী বলছে
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্বাচনী আইনে দান, অনুদান নিতে কোনো বাধা নেই। তবে নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব দাখিলের সময় সব ব্যয়ের উৎস ও ব্যয়ের বিবরণ যথাযথভাবে দাখিল করতে হবে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৪৪কক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রার্থী তার আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঋণ, দান নিতে পারেন। এখানে আত্মীয়স্বজন বলতে পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, ভাই বা বোনকে বোঝানো হয়েছে। তবে আত্মীয়স্বজন ছাড়াও অন্য কোনো ব্যক্তি থেকে ঋণ বা স্বেচ্ছা প্রণোদিত দান নিতে পারবেন। কোনো রাজনৈতিক দল, সংস্থা বা সমিতি থেকেও স্বেচ্ছা প্রণোদিত দান নিতে অসুবিধা নেই। এছাড়া অন্য কোনো উৎস থেকেও নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহ করা যাবে। এক্ষেত্রে পাঁচ হাজার টাকার নিচে স্বেচ্ছা প্রণোদিত দান বা অনুদান হলে উৎস না উল্লেখ করলেও চলবে। অর্থাৎ আইন অনুযায়ী, যে কোনো প্রার্থী বা দল গণতহবিলের মাধ্যমে ভোটের ব্যয় মেটাতে পারবেন।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, আইন অনুযায়ী যে কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে দান, অনুদান নিতে পারবেন প্রার্থীরা। এতে কোনো বাধা নেই। প্রার্থীর আহ্বানে কেউ সাড়া দিয়ে স্বেচ্ছায় অনুদান দিতেই পারে। আইনে কেবল আয়ের উৎসের স্বচ্ছতার কথা বলা আছে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, প্রার্থীকে তার নিজের ব্যয় ব্যতীত নির্বাচনী ব্যয়ের সব হিসাব একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তার এজেন্ট কর্তৃক নির্বাহ করতে হয়। এক্ষেত্রে প্রতিটি আয়ের উৎস ও ব্যয়ের খাত এবং পরিমাণ দেখাতে হয়। এছাড়া হলফনামাতেও নির্বাচনী ব্যয়ের উৎসের উল্লেখ করতে হয়।

গণতহবিলের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলী বলেন, এটি এ দেশে নতুন ধারণা। প্রার্থীর কারও কাছ থেকে দান বা অনুদান নিতে অসুবিধা নেই। তবে নির্বাচনী ব্যয়ের উৎস ও ব্যয়ের হিসাবে স্বচ্ছতা থাকতে হবে।

নির্বাচন কমিশন আইন সংশোধন করে প্রার্থীর ভোটারপ্রতি ব্যয় নির্ধারণ করে দিয়েছে ১০ টাকা। তবে যেখানে ভোটারপ্রতি ব্যয় ১০ টাকা ধরে ২৫ লাখ টাকার কম হয়, সেখানে একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবেন।

ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ভোটের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে জমা দিতে হয়। যদি কোনো প্রার্থী হলফনামায় ঘোষিত উৎস ব্যতীত অন্য কোনো উৎস থেকে ব্যয় বহন করেন, তাহলে ন্যূনতম দুই বছর থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান আছে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোটার গাজীপুর-২ আসনে। আট লাখ ৪ হাজার ৩৩৩ জন ভোটারের এ আসনে মাথাপিছু ১০ টাকা করে ব্যয় হলে ব্যয় করা যাবে ৮০ লাখ ৪৩ হাজার ৩৩০ টাকা। আর সবচেয়ে কম ভোটার ঝালকাঠি-১ আসনে, দুই লাখ ২৮ হাজার ৪৩১ জন। ১০ টাকা হারে ব্যয়সীমা দাঁড়ায় ২২ লাখ ৮৪ হাজার ৩১০ টাকা। তবে এই আসনের প্রার্থী সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবেন।

নির্বাচনে মোট ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন, হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন।

প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন স্বতন্ত্র ও ৫১টি দলের দুই হাজার ১৭ জন প্রার্থী। নির্বাচনে ৪২ হাজার ৭৬৬ কেন্দ্রের ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি কক্ষে ভোটগ্রহণ করা হবে। ভোটে প্রিসাইডিং অফিসার থাকবেন ৪২ হাজার ৭৭৯ জন, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার থাকবেন ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন, আর পোলিং অফিসার থাকবেন ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন। সব মিলিয়ে মোট ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকবেন।

এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নয় লাখ ৪৩ হাজার ৫০ জন সদস্য নিরাপত্তা রক্ষায় মোতায়েন করা হবে।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *