অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থায় স্বতন্ত্র উন্নয়নের জন্যই ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পেছনে যুক্তরাজ্যের অন্যতম লক্ষ্য ছিল। আর সেটা তারা করতে চেয়েছিল ইইউর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে যুক্ত থেকে। অর্থাৎ এ-কূলও চাই আবার ও-কূলেও অধিকার থাকবে। কিন্তু যুক্তরাজ্য এখন দুই কূলই হারাতে বসেছে।
চলতি বছরের শেষ নাগাদ অর্থাৎ টানজিশন পিরিয়ড শেষ হওয়ার আগেই ব্রিটিশ সরকার ব্রেক্সিট চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আশা করেছিল। কিন্তু এখন সেই চুক্তি হওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছে বরিস জনসন প্রশাসন। ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে এমনটাই জানানো হয়েছে।
জনসনের আত্মবিশ্বাস ছিল যে চলতি মাসের শেষের দিকে ব্রেক্সিট চুক্তির বিষয়ে একটি রূপরেখা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু এখন ব্রিটিশ মন্ত্রীরা ট্রানিজিশন পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) শর্তের অধীন ইইউর সঙ্গে বাণিজ্য করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছে টেলিগ্রাফ।
গত সোমবার (২০ জুলাই) যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিটবিষয়ক প্রধান আলোচনাকারী ডেভিড ফ্রস্ট ও ইইউর প্রতিনিধি মিশেল বার্নিয়ে চুক্তি নিয়ে সর্বশেষ দফার আলোচনা শুরু করেন। কিন্তু উভয় পক্ষই তথাকথিত লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের নিশ্চয়তা প্রদান, চুক্তির সুশাসন ও ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিসের ভূমিকা নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হয়েছে।
এর ফলে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ঘোষণা ছাড়াই গতকাল শুক্রবার আলোচনা শেষ হয়েছে। চলতি মাসে দুই পক্ষের আর কোনো আলোচনায় বসার কথা নেই। অর্থাৎ বরিস জনসন যে জুলাইয়ের সময়সীমা দিয়েছিলেন, তার মধ্যে ব্রেক্সিট চুক্তি আর হলো না।
এদিকে সংকটকালীন সময় জোটবদ্ধতা কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, ব্রিটেন হয়তো এখন তা বুঝতে পারছে। করোনা ভাইরাসই তা তাদের হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে দিচ্ছে। মহামারির এ সময়ে যুক্তরাজ্য ও ইইউ বাজারগুলোর মধ্যে পার্থক্য অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় প্রকট হয়ে উঠেছে। আর এ পার্থক্য কেবল ব্রিটেনের অসহায়ত্বই ফুটিয়ে তুলেছে।
ইউরোপের তুলনামূলক দুর্বল অর্থনীতিগুলোকে করোনা মহামারির নেতিবাচক প্রভাব থেকে উদ্ধারের লক্ষ্যে ঐতিহাসিক সহায়তা চুক্তিতে সম্মত হয়েছেন ইইউ নেতারা। অন্যদিকে ব্রিটেনকে একটি চূড়ান্ত ব্রেক্সিট চুক্তিতে পৌঁছতে এখনো হিমশিম খেতে হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের এই কাটা ঘায়ের যন্ত্রণা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। বিনিয়োগকারীরা প্রায় সব ক্ষেত্রেই ইউরোপীয় ঐক্যকে পুরস্কৃত করছেন, আর ব্রিটেনের নাছোড়বান্দা সমস্যাগুলো দেখে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
এ বিষয়ে একটা তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইইউ অঞ্চলের অভিন্ন মুদ্রা ইউরোর মান বর্তমানে ২০১৯ সালের শুরুর দিকের পর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। শেয়ারবাজারেও ইইউর শীর্ষ সূচকগুলো বেশ ভালো অবস্থানেই রয়েছে। জার্মানির ডিএএক্স চলতি বছর প্রায় পুরোটা সময়জুড়েই ইতিবাচক থেকেছে। এছাড়া করোনার প্রভাবে মার্চের মাঝামাঝি সময়ে নিচে নেমে গেলেও তার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার বাজার মূলধন যোগ হয়েছে স্টক্স ইউরোপ ৬০০ সূচকে।
এদিকে ব্যাংক অব আমেরিকার সর্বশেষ ফান্ড ম্যানেজার সার্ভে বলছে, বিনিয়োগকারীরা ইউরোজোনের মূলধনি সম্পত্তিতে তাদের লগ্নি ৯ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়িয়েছেন, যা যেকোনো অঞ্চলের জন্যই সবচেয়ে বড় প্রবৃদ্ধি।
ওদিকে যুক্তরাজ্যের বাজার এখন বিনিয়োগকারীদের কাছে অনেকটাই অজনপ্রিয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। চলতি বছর মান কমেছে ব্রিটেনের মুদ্রা পাউন্ডের। এ সময়ে ১৭ শতাংশ পতন হয়েছে এফটিএসই-১০০ সূচকে। ব্যাংক অব আমেরিকার জরিপে যুক্তরাজ্য সবচেয়ে অজনপ্রিয় বিনিয়োগ বাজার হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
আর স্কটিব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাউন্ড হলো বর্তমানে সেই দুটি শীর্ষ মুদ্রার একটি, যার শর্ট সেলারদের সংখ্যা লং সেলারদের চেয়ে অনেক বেশি। অর্থাৎ পাউন্ডের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
মানি ম্যানেজাররা বলছেন, যুক্তরাজ্য এখন বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক জায়গা হয়ে উঠছে। কারণ চলতি বছরের শেষ নাগাদ ব্রিটেন ইইউর সঙ্গে একটি কার্যকর ব্রেক্সিট চুক্তি সম্পন্ন করতে সক্ষম হবে—এ সম্ভাবনা ফিকে হয়ে এসেছে। কোনো ধরনের চুক্তি ছাড়াই ট্রানজিশন পিরিয়ড শেষ হলে বিনিয়োগকারীদের কাছে আরো আকর্ষণ হারাবে যুক্তরাজ্য। ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে হতাশা তো রয়েছেই, পাউন্ডের অস্থিতিশীলতাও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যাংক অব আমেরিকার বিনিয়োগ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা ডিভিশন মেরিল লিঞ্চের জুনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিটেনের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা পাউন্ডকে একটি উদীয়মান দেশের মুদ্রার কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি পাউন্ডের মানের অস্থিতিশীলতা বোঝাতে মুদ্রাটিকে তুলনা করেছে চাঙ্গা বাজারে ‘পাগলা ঘোড়া’ ও মন্দা বাজারে ‘অতল খাদ’-এর সঙ্গে। অর্থাৎ পাউন্ডের মান যখন বাড়ে, তখন লাগামহীনভাবেই বাড়ে। আর যখন কমে, তখন এতই নিয়ন্ত্রণহীন পতন হয় যে বিনিয়োগকারীদের মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।
একদিকে ইইউ নেতারা করোনার প্রভাব থেকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল সদস্য অর্থনীতিগুলোকে বাঁচাতে ৯০ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা শেষে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। ২৭ দেশের জোটে মহামারীর প্রভাব মোকাবেলায় অনুদান ও ঋণ হিসেবে ৭৫ হাজার কোটি ইউরো মঞ্জুরের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে তাদের মধ্যে।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ইইউ থেকে বের হয়ে যেতে গণভোটের চার বছর পর কী পেল? চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট। আর বঞ্চিত হলো মহামারী মোকাবেলায় জোটবদ্ধ উদ্ধার প্রচেষ্টার সুফল থেকে। দ্য টেলিগ্রাফ ও ব্লুমবার্গ।

