দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর গত তিন মাসে ১ হাজার ১২ কোটি ৪৭ লাখ টাকার চিকিৎসা উপকরণ কেনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপো (সিএমএসডি)। কিন্তু এ বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচের ক্ষেত্রে মানা হয়নি সরকারি ক্রয় বিধিমালা, যেমন পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট-২০০৬ (পিপিএ) এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস-২০০৮ (পিপিআর)। সরকার প্রণীত বিধিমালা অনুসারে আর্থিক এখতিয়ার অনুযায়ী যেসব স্তরে অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন ছিল তাও নেওয়া হয়নি। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিজিপি) ও অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিইএ) কোনো অনুমোদন ছাড়াই ব্যয় করা হয়েছে এ বিপুল পরিমাণ অর্থ।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, হাজার কোটি টাকার কেনাকাটায় দুই একটা চিঠি ছাড়া আর কোনো নথিপত্রও নেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। পণ্যের স্পেসিফিকেশন ছাড়াই দেওয়া হয়েছে কার্যাদেশ। এসব কেনাকাটার বিল পরিশোধ করতে সিএমএসডি থেকে যখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়, তখন ক্রয় প্রক্রিয়া ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বলে অর্থ অনুমোদন দেয়নি মন্ত্রণালয়। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ কেনাকাটার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন দশজন শীর্ষ কর্মকর্তা। এরমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তিনজন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুজন ও সিএমএসডির পাঁচজন কর্মকর্তা রয়েছেন। এসব অনিয়ম খতিয়ে দেখতে গঠন করা হয়েছে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি।
যে টাকার কেনাকাটা হয়েছে : অনুসন্ধানে দেখা যায় চলতি বছরের ৩০ মে পর্যন্ত দাপ্তরিক পত্রে মন্ত্রণালয়কে ৩৫৪ কোটি ৮১ লাখ টাকার উপকরণ কেনার কথা বলা হয়েছে। একইভাবে আরেক অফিস আদেশে আরও ৬৫৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকার উপকরণ কেনার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া মে ও জুন দুই মাসে ৯৪৩ কোটি ৭ লাখ টাকার আরও উপকরণ কেনা প্রয়োজন বলে অর্থ চাওয়া হয় সিএমএসডির পক্ষ থেকে।
গত ৬ এপ্রিল সিএমএসডির সাবেক পরিচালক সদ্য প্রয়াত মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহ ওভারসিস মার্কেটিং করপোরেশন (ওএমসি) নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ১৭টি পিসিআর মেশিন কেনার জন্য কার্যাদেশ দেন। যার প্রতিটির মূল্য প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সে হিসাবে ১৭টি পিসিআর মেশিনের দাম পড়েছে ৪০ কোটি ৮০ লাখ টাকা। একই প্রতিষ্ঠানকে প্রতিটি ২ হাজার ৭শ’ টাকা দরে দুই লাখ করোনা পরীক্ষার কিট কেনার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। যার মোট মূল্য দাঁড়ায় ৫৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। আর এই কেনাকাটার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দরকষাকষি বা পণ্যের স্পেসিফিকেশন করা হয়নি। এছাড়া আরও প্রায় সাড়ে দশ লাখ করোনা পরীক্ষার কিট সরবরাহ করার জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে এন-৯৫ মাস্ক, কেএন-৯৫ মাস্ক, সার্জিক্যাল মাস্ক, পিপিই, সু-কাভার, অক্সিমিটার এবং ইনফ্রারেড থার্মোমিটারসহ ৮টি প্রতিষ্ঠানকে সর্বমোট ১ হাজার ১২ কোটি ৪৭ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ওএমসি নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে সবচেয়ে বেশি টাকার কাজ দেওয়া হয়।
মানা হয়নি পিপিএ-পিপিআর : দেশ রূপান্তরের হাতে আসা দাপ্তরিক কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাতের ক্রয়সংক্রান্ত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান সিএমএসডি গত তিন মাসে ১ হাজার ১২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা চিকিৎসাসামগ্রী কেনে। এ বিপুল অর্থের কেনাকাটায় আইন মানা হয়নি। সরকারি সংস্থার কেনাকাটার নির্দেশনা পিপিএ ও পিপিআর অনুসরণ করা হয়নি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ আর্থিক এখতিয়ার সম্পর্কিত বিধিমালা অনুযায়ী সরকারের রাজস্ব বাজেট থেকে সংস্থার প্রধানের অর্থ খরচের কোনো সুযোগ নেই। নিয়ম অনুযায়ী পরিচালক যেকোনো পদ্ধতিতেই হোক উপকরণ কিনতে হলে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর অনুমোদন প্রয়োজন হবে। আর ক্রয় মূল্য ৫০ কোটি টাকার বেশি হলে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিজিপি) হয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন প্রয়োজন হবে। কিন্তু সিএমএসডির দাপ্তরিক নথিপত্রে হাজার কোটি টাকার কেনাকাটায় এ ধরনের কোনো অনুমতিপত্রের দালিলিক প্রমাণ নেই। নেই কোনো নথিপত্রও। শুধু সংস্থার পরিচালকের চিঠি আর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মালামাল সরবরাহের চিঠি এ বিশাল কেনাকাটার প্রমাণ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ক্রয় বিশেষজ্ঞ ও সরকারের সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ) মহাপরিচালক শোহেলের রহমান চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেকোনো বিশেষ মুহূর্তে সরকারি সংস্থা ইচ্ছে করলে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় যেতে পারে। তবে যে পদ্ধতিতেই ক্রয় করা হোক না কেন বিধিমতে আর্থিক এখতিয়ার আছে এমন প্রতিটি স্তরের অনুমোদন লাগবে। এক্ষেত্রে পাঁচ কোটি টাকা থেকে শুরু করে উপরে যেকোনো পরিমাণের অর্থ খরচ করতে হলে প্রথমে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিইএ) থেকে অনুমোদন নিতে হবে। সিসিইএর অনুমোদনের পর তা সিসিজিপি থেকে অনুমোদন নিতে হবে। পিপিআর-২০০৮-এর ধারা ৬৮ এবং পিপিএ-২০০৬-এর ৬৪ ধারাতে এ বিষয়ে স্পষ্ট বলা আছে। সরকারি সংস্থার কেনাকাটার ক্ষেত্রে এর বাইরে যাওয়ার আইনগত কোনো সুযোগ নেই।
বিল দিচ্ছে না মন্ত্রণালয় : গত তিন মাসে সিএমএসডি থেকে ১ হাজার ১২ কোটি ৪৭ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয় বিভিন্ন ঠিকাদারকে। ওএমসি, জেএমআই, ট্রেড হাউজ, ট্রেড ভিশনসহ মোট আটটি কোম্পানি কার্যাদেশ পেয়ে বেশিরভাগ চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহও করেছে। কিন্তু তারা কেউ বিল পায়নি। এরমধ্যে সিএমএসডি থেকে ৩৪০ কোটি টাকার বিল চাওয়া হলে ‘ক্রয় প্রক্রিয়া ত্রুটিপূর্ণ’ মন্তব্য করে বিলে অনুমোদন দেয়নি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। সিএমএসডির কাছে পাওনা থাকা ঠিকাদারের বিলের চাপে সংস্থাটির পরিচালক সম্প্রতি এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা চেয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি দিয়েছেন। বর্তমানে এ বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শাহাদাত হোসেনের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি কাজ করছে। এ কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে বলে জানা গেছে।
কেনাকাটায় যারা জড়িত : বিধিবহির্ভূতভাবে এসব কেনাকাটার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তিনজন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুজন ও সিএমএসডির পাঁচজনসহ মোট ১০ কর্মকর্তা। তারা হলেনসিএমএসডির সাবেক পরিচালক সদ্য প্রয়াত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহ, ‘চিফ কো-অডিনেটর’ ডা. মো. জিয়াউল হক, ডেস্ক অফিসার-১০ মো. হাবিবুল কিবরিয়া, ফার্মাসিস্ট মাসুম সাজ্জাদ ও ডাক্তার জাকির হোসেন। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর মো. খোরশেদ আলম ও আমিনুল হাসানও এই কেনাকাটায় জড়িত রয়েছেন। তাদের সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আরও তিনজন কর্মকর্তাও নেপথ্যে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা হলেনসাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. হাবিবুর রহমান, মো. সিরাজুল ইসলাম ও মন্ত্রীর একান্ত সচিব মো. ওয়াহিদুর রহমান। স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে সম্প্রতি ব্যাপক সমালোচনা দেখা দিলে সব কর্মকর্তাকে অন্যত্র বদলি করেছে সরকার। উল্লিখিত কর্মকর্তারা ছাড়াও সিএমএসডির হিসাব শাখার জহিরুল হক, সোহেল, সিরাজ, স্টোরের আহসান হাবিব, কালাম, ইসরাফিল, আলামিন ও হাসনাত ক্রয়সংক্রান্ত অনিয়মের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্বচ্ছতা ফেরাতে তিন কমিটি : মাস্ক কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠার পর সংস্থাটির সর্বোচ্চ পদে পরিবর্তন আনে সরকার। এ পদে নতুন করে দায়িত্ব দেওয়া হয় সরকারের অতিরিক্ত সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামানকে। তিনি গত ২২ মে যোগদান করার পর ক্রয় প্রক্রিয়ায় বেশকিছু পরিবর্তন নিয়ে আসেন। এই মুহূর্তে যেকোনো কেনাকাটা বাস্তবায়ন করতে তিনটি কমিটির সুপারিশ প্রয়োজন হয়। এর একটি হলো কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি। যেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে প্রধান করা হয়েছে। দ্বিতীয়, পরামর্শক কমিটিতে রয়েছেনস্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব, সিএমএসডির পরিচালক, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক আহসান কিবরিয়া ছিদ্দিকী, মুগদা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. টিটু মিঞা, কুয়েতমৈত্রী হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটের কনসালট্যান্ট ডা. আশরাফুজ্জামান, সিপিটিইউর পরিচালক আজিজ তাহের খান। তৃতীয়, বাজার যাচাই ও দরকষাকষি কমিটিতে রয়েছেনসিএমএসডির পরিচালক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফার্মেসি অনুষদের ডিন অধ্যাপক শাহরিয়ার নবী, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের প্রতিনিধি, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রতিনিধিসহ সাতজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি।
কর্র্তৃপক্ষের বক্তব্য : সিএমএসডির পরিচালক আবু হেনা মোরশেদ জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে কে কীভাবে ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন তা আমার জানা নেই। তবে আমি যোগদানের পর পিপিআর, পিপিএ মেনে শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে কেনাকাটা করা হচ্ছে। এখানে নতুন করে তিনটি বিশেষজ্ঞ কমিটিও গঠন করা হয়েছে। যেখানে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, গণপূর্ত বিভাগ, সিপিটিইউ, অভিজ্ঞ ডাক্তার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রয়েছেন। সবার অংশগ্রহণে আর্থিক এখতিয়ার অনুযায়ী সরকারের যে পর্যায়ে অনুমোদন প্রয়োজন সব নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। বৈশ্বিক সংকটের এ করোনাকালে প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন মেনে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করে যাবে সিএমএসডি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঠিকাদারদের বিল পরিশোধের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের দিকনির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। যেহেতু এসব ক্রয় প্রক্রিয়াকে মন্ত্রণালয় ত্রুটিপূর্ণ বলেছে, তাই মন্ত্রণালয় থেকে সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত সিএমএসডি কাউকে অর্থছাড় করতে পারবে না।’

