শিরোনাম
শনি. জানু ৩, ২০২৬

ভিক্ষা করছেন মুক্তিযোদ্ধা আ. রশিদ

কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন সড়কে ভিক্ষা করছেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আ. রশিদ। সারাদিন অন্যের কাছে হাত পেতে যা পান তাই দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন নিজেকে, অন্ন তুলে দিচ্ছেন বিধবা মেয়ে ও তার সন্তানের মুখে।

স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরও এভাবেই দিন কাটছে বয়সের ভারে ন্যুব্জ যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আ. রশিদের। স্ত্রী পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন আগেই। একমাত্র ছেলে বিয়ে করে হয়ে গেছেন আলাদা। বর্তমানে বিধবা মেয়ে আর সন্তানকে নিয়ে তার সংসার।

ভিক্ষার টাকায় কোনোরকমে তিনজনের খাবার জুটলেও করোনার পরিস্থিতিতে সেটাতেও পড়েছে ভাটা। বাসা ভাড়া বকেয়া পড়েছে ৪ মাসের। যথাযথ সনদ ও প্রমাণ থাকার পরও সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি আ. রশিদ। ফলে সরকারি কোনো সাহায্য সহযোগিতাও মেলেনি।

জানা গেছে, আ. রশিদের বাড়ি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া ইউনিয়নের আমড়াগাছিয়া গ্রামে। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে নববধূকে বাড়িতে রেখে চলে যান খুলনায়। সেখান থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাসনাবাদ চব্বিশ পরগনায় গিয়ে প্রশিক্ষণ নেন। ফিরে এসে খুলনায় মেজর জলিলের নেতৃত্বাধীন ৯নং সেক্টরে যোগ দেন। তার দায়িত্ব ছিল খুলনা ও সুন্দরবন দিয়ে নিরাপদে সংখ্যালঘুদের পশ্চিমবঙ্গে পৌঁছে দেয়া।

একদিন খুলনা থেকে নৌকাযোগে পশ্চিমবঙ্গে যাওয়ার পথে পাক বাহিনীর মুখোমুখি পড়ে যান। গুলিবিদ্ধ হন ডান উঁরুতে। কোনোরকমে সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখায় বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ পিরোজপুর জেলা ও মঠবাড়িয়া উপজেলা কমান্ড তাকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রত্যয়নপত্র দেয়। রয়েছে আতাউল গনি ওসমানী কর্তৃক প্রদত্ত স্বাধীনতার সংগ্রামের সনদ। পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনায় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশিক্ষণ নেয়ার প্রমাণপত্রও রয়েছে। তারপরও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারেননি তিনি।

আ. রশিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বাধীনতার পর পিরোজপুরের বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি। ২১ পর আগে জীবন-জীবিকার তাগিদে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে পিরোজপুর থেকে ঢাকায় চলে আসেন লেখাপড়া না জানা আ. রশিদ।

কেরানীগঞ্জে বাসা ভাড়া নেন। কিছুদিন পর স্ত্রী মারা যান। ছেলে বিয়ে করে অন্যত্র চলে যায়। অনেক কষ্টে দুই মেয়েকে বিয়ে দেন। এরই মধ্যে বড় মেয়ে বিধবা হয়ে তার একমাত্র সন্তানকে নিয়ে আবারও ফিরে আসে বাবার কাছে।

একদিকে বার্ধক্য অন্যদিকে অভাব-অনটন দুটোই তার জন্য পীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শেষে বাধ্য হয়ে সংসার চালাতে ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করেন। বর্তমানে কেরানীগঞ্জের আগানগর কেজিশাহ ডক এলাকায় আহমেদের বাড়ির একটি ঘর ভাড়া নিয়ে বাস করছেন।

আ. রশিদ জানান, ২০১৬ সালে দুর্ঘটনায় পড়ে তার দুটি পায়ের হাড়ে ফাটল দেখা দেয়। প্রাথমিক চিকিৎসা নিলেও পুরোপুরি সুস্থ হতে অপারেশনের কথা বলেছেন ডাক্তার। এতে ৪০ হাজার টাকা লাগবে। কিন্তু অর্থাভাবে তিনি সেটাও করাতে পারছেন না। ভাঙা পা নিয়েই তিনি ভিক্ষা করছেন।

আ. রশিদের সরবরাহ করা বিভিন্ন কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ২০০৪ সালে পিরোজপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা বাছাই কমিটি তাকে সরকারি তালিকা থেকে বাদ পড়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শনাক্ত করে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে সুপারিশ করে। তারপর দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও সরকারি তালিকায় উঠেনি আ. রশিদের নাম।

একাধিকবার তিনি মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলে সরকারি তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করেছেন। কিন্তু অদৃশ্য কারণে তালিকায় তার নাম আসে না।

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মো. বাচ্চু মুঠোফোনে বলেন, আ. রশিদ একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে তিনি গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু দু:খের বিষয় সরকারি তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও আ. রশিদের সরকারি তালিকায় নাম না থাকাটা দু:খজনক। এটা আমাকে পীড়া দেয়। তবে সর্বশেষ মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই তালিকায় তার নাম এসেছে। আমরা সেই তালিকা সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠিয়েছি। করোনার কারণে সেই কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। আশা করছি, চূড়ান্ত তালিকায় নাম তালিকাভুক্ত হবে।

সরকারি তালিকাভুক্ত (গেজেট নং ১০৫৭) মঠবাড়িযার মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান শরীফ বলেন, আ. রশিদ আমার সঙ্গে ভারতের আমলানি ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং অগণিত সংখ্যালঘুর জীবন তিনি বাঁচিয়েছেন। তিনি একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা।

কেরানীগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মো. শাহজাহান বলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা পেটের দায়ে ভিক্ষা করছেন, আমার কাছে এর চেয়ে লজ্জার আর কিছু হতে পারে না।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *