করোনা পর্বের পর মঙ্গলবার দ্বিতীয় প্রশাসনিক বৈঠকে প্রত্যেক জেলাশাসকদের কার্যত তুলোধনা করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্য সড়ক যোজনা থেকে কন্যাশ্রী কিংবা সরকারি সহায়তা প্রদান বা জল ধরো জল ভরো বেশিরভাগ সরকারি প্রকল্পের সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে না বলেই অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী।
এদিনের প্রশাসনিক বৈঠকে মূলত পশ্চিম ও রাঢ় বঙ্গের ছয় জেলার জেলাশাসকেরা উপস্থিত ছিলেন। বাঁকুড়া, বীরভূম, পুরুলিয়া, দুই বর্ধমান, পূর্ব মেদিনীপুর এই ছয় জেলার জেলাশাসকদের উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘খুব খারাপ কাজ হয়েছে। খুব খারাপ, খুব খারাপ। আপনাদের লজ্জা করা উচিত। সরকার সাধারণ মানুষের জন্য প্রকল্পের সুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে না। এটা একেবারেই অভিপ্রেত নয়।’
এই নিয়ে একাধিক তথ্য তিনি তুলে ধরে প্রত্যেক জেলাশাসককে সতর্ক করে দেন। মুখ্যমন্ত্রী এদিন বলেন, ‘রাজ্য সড়ক যোজনায় সব জেলাই পিছিয়ে রয়েছে। বাঁকুড়ায় লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫০ কিলোমিটার কিন্তু ৩৭ কিলোমিটার হয়েছে। বীরভূমে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৫ কিলোমিটার, এখানে হয়েছে মাত্র ৯ কিলোমিটার। পুরুলিয়ায় ১৫০ কিলোমিটারের মধ্যে হয়েছে মাত্র ২৩ কিলোমিটার। পূর্ব বর্ধমানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৫ কিলোমিটার। এখনও পর্যন্ত হয়েছে ১৬ কিলোমিটার পথ। পশ্চিম বর্ধমানে ৩৫ কিলোমিটারের মধ্যে হয়েছে সাড়ে ৫ কিলোমিটার।’
এই তথ্য প্রকাশ্যে বলে মুখ্যমন্ত্রী জেলাশাসক ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে কার্যত ভত্র্সনার সুরে বলেন, ‘লজ্জা করছে না শুনতে এটা। খুব খারাপ কাজ হয়েছে, খুব খারাপ, খুব খারাপ। এটা খুব খারাপ হয়েছে তা বলতেই হচ্ছে।’ পাশাপাশি, মৃত কৃষকদের সরকারি সহায়তা প্রদানের প্রকল্পের কথা বলতে গিয়ে মমতা বলেন, ‘এই প্রকল্প বাঁকুড়া ও বীরভূম কমপ্লিট হয়ে গিয়েছ। কিন্তু পুরুলিয়ায় ৬৯ জন বাকি, পূর্ব বর্ধমানে ৪০ জন বাকি, পশ্চিম বর্ধমানে ১১ জন বাকি। কেন এই জেলাগুলিতে টাকা নেই নাকি হাতে। টাকা নিয়ে কী করছ।’
একইসঙ্গে কৃষি দফতরের সচিব সুনীল গুপ্তাকে তিনি নির্দেশ দেন সব বকেয়া টাকা ছেড়ে দিতে। জেলাশাসকদের নাম ধরে জানতে চান ফান্ডের অভাব, নাকি অন্য কারণে কাজ হচ্ছে না। এরপর মত্স দফতরের সচিবকে ভত্র্সনার সুরে বলেন, ‘মাছ দিয়েছো নাকি সেটাও হয়নি।’ পরক্ষণেই তিনি নির্দেশ দেন, জল ধরো জল ভরো প্রকল্পে যে সাড়ে তিন লক্ষ পুকুর কাটা হল, তাতে কী হল। কিছুই কাজ করছে না কেউ। করোনার জন্য সবাই কি বাড়িতে গিয়ে ঘুমাচ্ছে। এভাবে কাজ করলে চলবে না।
একইসঙ্গে তিনি সব জেলাশাসকদের কড়া নির্দেশ দেন, গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। তার জন্য অবশ্য সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্যার আশঙ্কায় মাছের চারা ছাড়তে নিষেধ করেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এখন টাকা দিলে বন্যা হয়ে গেলে বলবে সব ভেসে গিয়েছে। কোনও টাকার হিসেব পাওয়া যাবে না। সবার পকেটে টাকা ঢুকবে। তাই মাছের চারা অক্টোবরে ছাড়বে। না হলে জলে চলে যাবে সব টাকা।’
এছাড়াও, তিনি স্পষ্টই বলেন, গত ছ’মাসে কোভিড থাকা সত্ত্বেও কন্যাশ্রী-২ প্রকল্প ঠিক হচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রীর এদিনের রণংদেহী মূর্তি দেখে স্বভাবতই প্রশাসনের শীর্ষকর্তারা সকলেই আতঙ্কিত। ফের আগামীকাল কিছু প্রকল্পের সূচনা করবেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে ফের তোপের মুখে প্রশাসনিক কর্তারা পড়েন কি না এখন সেটাই দেখার। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, করোনা ও আম্ফানের ত্রাণ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে একটা ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তা বিলক্ষণ বুঝেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই কারণেই জেলাশাসকদের এদিন তিনি সতর্ক করে দিলেন।

