শিরোনাম
শুক্র. জানু ৩০, ২০২৬

বাংলাদেশের সাবেক কোচের অসম্পূর্ণ গল্প

সালমা খাতুন, রুমানা আহমেদরা নিশ্চয়ই একবাক্যে স্বীকার করবেন ব্যাপারটি। বাংলাদেশ জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের সাবেক কোচ ডেভিড ক্যাপেল ছিলেন নিখাদ এক ভদ্রলোক, মিষ্টভাষী, নিজের কাজের প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ২০১৬ সালের শেষ থেকে ২০১৮ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সালমা, রুমানা, জাহানারাদের দায়িত্বে থাকার সময় অনেকেই ভাবতে পারতেন না, ইংলিশ ক্রিকেটে এক সময় তাঁকে ইয়ান বোথামের উত্তরসূরি বা ‘দ্বিতীয় বোথাম’ বলা হতো। সেই ক্যাপেল কাল চিরবিদায় নিলেন। মস্তিষ্কের টিউমারে আক্রান্ত হয়ে তাঁর চলে যাওয়াটা যেন অসম্পূর্ণ গল্প। বয়সটা যে ছিল মাত্র ৫৭। ইয়ান বোথামের সঙ্গে তুলনা করা হতো তাঁর।

১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত তিনি ইংল্যান্ডের হয়ে খেলেছেন ১৫ টেস্ট ও ২৩ ওয়ানডে। ৮৭’র জুলাইয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে অভিষিক্ত ক্যাপেলের টেস্ট ক্যারিয়ার দীর্ঘ হওয়ার কথা ছিল। নর্দাম্পটনশায়ারের হয়ে কাউন্টি ক্রিকেটে ১২ হাজার ২০২ রান আর ৫৪৬ উইকেটের মালিক কেন ইংল্যান্ড দলে নিয়মিত হতে পারেননি, সেটি এক রহস্য। তবে ঘরোয়া ক্রিকেট আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চিরকালীন পার্থক্যটা মাথায় রেখেও কথা বলা যায়, ক্যাপেলের সম্ভাবনাটা হয় ইংল্যান্ড ব্যবহার করতে পারেননি, অথবা নিজেকে মেলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছিলেন এই ব্যাটিং-অলরাউন্ডার।

জীবনের প্রথম টেস্টে ক্যাপেল ইয়ান বোথামের সঙ্গেই খেলেছিলেন হেডিংলিতে। পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই টেস্টে ইমরান খান, ওয়াসিম আকরামদের বোলিং তোপে কম্পমান ইংলিশ দলে আলাদা করে চোখে পড়েছিলেন তিনি। প্রথম ইনিংসে ৩০ রানে ৫ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর তাঁর লড়াকু ৫৩ রানের ইনিংস ছিল মনে রাখার মতো। তাঁর ফিফটিতেই ইংল্যান্ড সেদিন মোটামুটি সম্মানজনক একটা সংগ্রহ দাঁড় করাতে পেরেছিল। দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি খেলেছিলেন ২৮ রানের ইনিংস। ম্যাচটা ইংল্যান্ড হেরেছিল ইনিংস ব্যবধানে। অভিষেকে তাঁর সেই নিঃসঙ্গ লড়াইয়ের কথা মনে করেই কিনা বিখ্যাত ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান লিখেছে, ‘ক্যাপেল এমন একজন ক্রিকেটার ছিলেন যিনি দুঃসহ পরাজয়কে সামনে দেখেও লড়াই করে যেতে পারতেন।’

নর্দাম্পটনশায়ারের হয়ে ২৭০টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলা ক্যাপেল জীবনের ৩২টা বছর এই কাউন্টি দলের সঙ্গেই কাটিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ‘ট্র্যাজেডি’ বোধ হয় বোথামের সঙ্গে তুলনা। এই একটি তুলনাই ক্যাপেলের মতো দুর্দান্ত সামর্থ্যের এক ক্রিকেটারের বিকাশ ঘটতে দেয়নি। ১৯৮১ সালে অ্যাশেজ সিরিজে দুর্দান্ত বোথাম ইংলিশ ক্রিকেটে ‘কাল্ট’ তৈরি করেছিলেন আশির দশকে। তার-ই বলি বলা যেতে পারে ক্যাপেলকে। বোথামের মতো ব্যাটে-বলে সমান সামর্থ্যই শেষ অবধি তাঁর কাল হয়।

ব্যাপারটা তাঁর জন্য কেন চাপ হয়েছিল? সেই ব্যাখ্যা তিনি নিজেই দিয়েছিলেন একবার উইজডেন অ্যালমানাকে। ইংলিশ দলে তাঁর যখন অভিষেক হয়, তখন বোথামের মারাত্মক প্রভাব, সেটি তাঁর পারফরম্যান্সের কারণে। কিন্তু ক্যাপেল নিজের একটা ইচ্ছার কথা জানিয়ে চাপ নিয়ে নেন নিজের ওপর, ‘আমি সরল মনে একবার বলেছিলাম বোথামের মতো খেলতে চাই। কিন্তু সেই মন্তব্যটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেটি বোথামকেই অপমান করার মতো।’

যে বোথামের সঙ্গে নিরন্তর তুলনা ক্যাপেলের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, কাল সেই বোথাম টুইট করে সাবেক সতীর্থের ক্রিকেট ক্যারিয়ারকে করেছেন স্মরণ, ‘ডেভিড ক্যাপেলকে নিয়ে ভয়াবহ এ সংবাদে মনটা ভারাক্রান্ত। ক্রিকেটে নিয়ে তাঁর উৎসাহ-উদ্দীপনার কোনো তুলনা হয় না।’

খেলা ছেড়ে কোচিংয়ে এসেছিলেন নর্দাম্পটনশায়ারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ইংল্যান্ডের নারী ক্রিকেট দলের সহকারী কোচ হিসেবে কাজ করার পর এসেছিলেন বাংলাদেশে। থাইল্যান্ডে এশিয়া কাপ দিয়ে শুরু করে শেষ করেন দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে। প্রোটিয়াদের বিপক্ষে ২০১৮ সালের জয়হীন সেই সফরের পর ক্যাপেলের বাংলাদেশ অধ্যায়ও শেষ হয় অসম্পূর্ণ গল্পের মতো। ক্যাপেলের জীবনের গল্পটাও তো তেমনই।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *