শিরোনাম
শনি. জানু ৩১, ২০২৬

এবার তালা কেলেঙ্কারি: ১৫০ টাকার তালা ৫৫৫০

সোনায় মোড়ানো কোনো তালা নয়, তবু একটি তালার দাম পড়েছে পাঁচ হাজার ৫৫০ টাকা। রুপার প্রলেপ দেওয়া বালতি নয়, তার পরও একটি প্লাস্টিকের বালতি কিনতে লেগেছে এক হাজার ৮৯০ টাকা আর সাধারণ ফুঁ দেওয়া যে বাঁশি, সেটা ৪১৫ টাকায় কেনা। এমন পিলে চমকানো ‘সাগরচুরি’ হয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের কেনাকাটায়। টাকার অঙ্ক দেখে যে কারোরই মনে হতে পারে, রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের কর্তারা তালা, বালতি কিংবা বাঁশি নয়, কিনেছেন ‘আকাশের চাঁদ’। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের বিভিন্ন স্টেশনের মালপত্র কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩৩ গুণ পর্যন্ত বেশি দামে কেনা হয়েছে। এ বছরের শুরুর দিকে পরিবহন অডিট অধিদপ্তর রেলওয়ের বিভিন্ন মাল কেনাকাটাসহ অন্যান্য বিষয়ে নিরীক্ষা করে। এই নিরীক্ষা প্রতিবেদনের কপি এসেছে কালের কণ্ঠ’র হাতে। প্রতিবেদনটি ঘেঁটে মিলেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য। এরই মধ্যে পরিবহন অডিট অধিদপ্তর থেকে রেল মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমাও দেওয়া হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে বেশি দামে মালপত্র কেনা হয়েছে। এতে তছরুপ হয়েছে সরকারের ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সরবরাহ করা মালপত্রের মধ্যে রয়েছে ভিজিটিং চেয়ার, মাইল স্টিলের চেয়ার, স্টিলের আলমারি, ফাইল কেবিনেট, সেক্রেটারি টেবিল, কাঠের চেয়ার, রিভলবিং চেয়ার, ক্রোকারিজ মাল, সোফা সেট, প্রতিবন্ধী হুইলচেয়ার ইত্যাদি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন স্টেশনে লেভেলক্রসিং গেটে ব্যবহারের জন্য তালা, বালতি, ঝাণ্ডা ও বাঁশি কেনা হয়েছে। এর মধ্যে তালা কেনা হয়েছে প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে সর্বোচ্চ ৩৩ গুণ বেশি দামে। এখানে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২৬ লাখ ৭৩ হাজার ৮৫০ টাকা। ১৫০ টাকা দামের তালা পাঁচ হাজার ৫৫০ টাকায়, প্রতিটি ৩০০ টাকা দামের বালতি এক হাজার ৮৯০ টাকায়, ৫০ টাকা দামের বাঁশি ৪১৫ টাকায় এবং ১৬০ টাকার ঝাণ্ডা এক হাজার ৪৪০ টাকায় কেনা হয়েছে।

১৬ গুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে পেডাল ডাস্টবিন। পেডাল ডাস্টবিনের গায়ে প্রতিটির দাম লেখা আছে ৬০০ টাকা। ৩০ শতাংশ ভ্যাটসহ তা হবে ৭৮০ টাকা। অথচ কেনা হয়েছে প্রতিটি সর্বনিম্ন আট হাজার ৯৯৫ টাকা দরে। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৪৫ লাখ ৬০ হাজার ৭৫০ টাকা।

ভিআইপি পর্দা কেনা হয়েছে ১১ গুণ বেশি দামে। এক হাজার ২০০ টাকা দামের পর্দা কেনা হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার টাকায়। বিভিন্ন রেলওয়ে স্টেশনের ওয়েটিং রুমে ব্যবহারের জন্য এসব পর্দা কেনা হয়। যাচাইকালে অডিট কমিটি জানতে পারে, ভিআইপি পর্দা কেনা হলেও তা রেজিস্টারে হিসাব রাখা হয়নি । বাজার যাচাইও করা হয়নি। কাল্পনিকভাবে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। ভিআইপি পর্দা কিনে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৪৪ লাখ ৪১ হাজার ৩৩০ টাকা।

এদিকে ১১ গুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে লাগেজ ফিতাসহ ৭৫ হাজার ওয়াগন কার্ড (ওপিটি কার্ড-২১৬)। গত বছরের ২০ জানুয়ারি ৫০ হাজার কার্ড কেনা হয়েছে ৪৯.৩৮ টাকা দরে। পরে একই বছরের ১৭ জুন ২৫ হাজার কার্ড কেনা হয়েছে ১৯.৯৯ টাকা দরে। আলাদাভাবে একই দ্রব্য কেনার দরেও রয়েছে বিস্তর ফারাক। অডিট কমিটি বাজার যাচাই করে জানতে পারে, ওই কার্ডের প্রকৃত দাম ৩.৪০ টাকা। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২৬ লাখ ৩৭ হাজার ২৫০ টাকা।

প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে তিন গুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে ভিজিটিং চেয়ার। ৩০ শতাংশ ভ্যাটসহ ওই চেয়ারের প্রতিটির প্রকৃত বাজারদর ছয় হাজার ৮২৫ টাকা, কিন্তু পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল ২০টি ভিজিটিং চেয়ারের প্রতিটি কিনেছে ১৬ হাজার ৮৭০ টাকা দরে। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে দুই লাখ ৯০০ টাকা। ২০১৯ সালের ১৭ জুন দ্বিগুণ দামে কেনা হয় ২২০টি লাগেজ ট্রলি, যার প্রতিটির বাজারদর তিন হাজার ৩০০ টাকা, কিন্তু কেনা হয়েছে প্রতিটি ১০ হাজার ২৯৮ টাকা দরে। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৬০ টাকা।

৫০০টি উন্নত মানের পাপোশ কেনা হয়েছে চার গুণ বেশি দামে। প্রতিটি পাপোশের প্রকৃত বাজারদর ৩০০ টাকা হলেও কেনা হয়েছে এক হাজার ৪৭৬ টাকা দরে। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে পাঁচ লাখ ৪৩ হাজার টাকা।

তোশিবা ব্র্যান্ডের একটি ফটোকপিয়ারের বাজারদর ভ্যাটসহ এক লাখ ১১ হাজার ২৮০ টাকা হলেও তা কেনা হয়েছে চার লাখ ৬৩ হাজার ২০ টাকায়। চার গুণ উচ্চমূল্যে ফটোকপিয়ারটি কেনার কারণে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তিন লাখ ৫১ হাজার ৭৪০ টাকা।

৩২ সেট তিন সিটের গদিযুক্ত স্টিল ফ্রেমের চেয়ার কেনা হয়েছে ওই অর্থবছরে। এসব চেয়ার বাজারদরের চেয়ে চার গুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে। এতে ক্ষতি হয়েছে ১৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১৬ টাকা। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে তিন সিটের চেয়ার কেনা হলেও সরবরাহ করা হয়েছে দুই সিটের চেয়ার।

বাজারদরের চেয়ে দ্বিগুণ দামে কেনা হয়েছে ৬২০টি লেদার ক্যাশ ব্যাগ।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *