সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী বিদ্যাপীঠ এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে রেখে তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় চললেও নীরব আওয়ামী সেক্যুলার নারীবাদীরা। কারণে অকারণে যাদেরকে নারী অধিকারের শ্লোগানে সরব হয়ে উঠতে দেখা যায় তাদের দেখা মিলছে না গত ৩ দিনে। নারী অধিকারের পক্ষে তাদের কোন বিবৃতিও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ২০১৮ সালের শেষ প্রান্তে একটি টকশো’তে প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন এক নারীর প্রশ্নের জবাবে শুধু বলেছিলেন আপনি অসভ্য। এতেই নারীদের ইজ্জত গেল বলে শুরু হয়েছিল হৈ চৈ। তাঁর বিরুদ্ধে ঠুকে দেয়া হয়েছিল সারা দেশে অনেক গুলো মামলা। জেলেও যেতে হয়েছে তাঁকে। এমনকি আদালতের মধ্যে তাঁকে জুতা মারার চেষ্টা করা হয়েছে তখন। অথচ, ছাত্রলীগ গণধর্ষণ করেছে এক তরুণীকে। তাও আবার ওই তরুণীর স্বামীকে বেঁধে রেখে। তারপরও কথিত চেতনাধারী নারীবাদীদের দেখা মিলছে না।
ছাত্রলীগের জন্য ধর্ষণ যেন দলীয় সংস্কৃতি
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ধর্ষণে সেঞ্চুরি পালন করে আলোচিত হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের এক নেতা। মানিক নামে ওই নেতাকে ধর্ষণে সেঞ্চুরির শাস্তির বদলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরী দেয় পুরস্কৃত করা হয়েছিল তৎকালীন সরকার থেকে। মানিকের পথ ধরেই ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা ধর্ষণকে নিজেদের জন্য জায়েজ কর্ম মনে করেই চালিয়ে যাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে খবরের কাগজের অনলাইন ভার্সনে চোখ রাখলেও পাওয়া যায় ছাত্রলীগের নেতা কর্তৃক ধর্ষণের নিয়মিত খবর।
চলতি মাসের ৭ তারিখের খবর। জাতীয় দৈনিক মানবজমিনের শিরোনাম-‘রংপুর ছাত্রলীগের সভাপতির বিরুদ্ধে শিক্ষিকাকে ধর্ষণের অভিযোগ’। এ খবরটিতে বলা হয়, রংপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান সিদ্দিকী রনির বিরুদ্ধে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষিকাকে ধর্ষণের অভিযোগে রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের হয়েছে। মামলায় অভিযোগ করা হয় বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এবং ভুয়া বিয়ের নাটক সাজিয়ে তাঁকে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়েছে। এর আগে রংপুর কারমাইকেল কলেজ শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি সাইদুজ্জামান সিরাজের বিরুদ্ধে একই কলেজের এক ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছিল। ধর্ষিতা ছাত্রী নিজেই লিখিত অভিযোগটি দায়ের করেছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে। তখনো বিষয়টি বেশ আলোচিত হয়েছিল।
গত ২ আগস্ট সময় টেলিভিশনের অনলাইনের একটি খবর। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে ভোলা ভেদুরিয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে গত ২ আগস্ট মামলা করেন এক তরুণী। তরুণী নিজেই থানায় হাজির হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় অভিযুক্ত আসামী ভেদুরিয়া ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সভাপতি মামুন হালদার।
২৫ জুলাই, অপর একটি জাতীয় দৈনিকের একটি খবর। এ খবরটিতে বলা হয়, পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মো: তরিকুল ইসলাম ওরফে তারেক হাসান এক বিধবা নারীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করেছেন। ধর্ষণের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করেন ওই নারী।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে একটি জাতীয় দৈনিকের অনলাইনের খবরে বলা হয়, দুই সন্তানের জননীকে ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার হন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগ সাংগঠনিক সম্পাদক আকিব।
১২ ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকের অনলাইনের খবর, বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বনী আমীনের বিরুদ্ধে কলেজ ছাত্রীকে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা।
সব ধর্ষণের খবর পত্রিকায় আসে না। লোক লজ্জার ভয়ে অনেকেই ধর্ষিত হওয়ার পর বিষয়টি চেপে যেতে চান। এরপরও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করেই হরহামেশাই ছাত্রলীগ কর্তৃক ধর্ষণের খবর উঠে আসে পত্রিকার পাতায়।
ধর্ষণ দিয়ে শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে নূতন সরকারের যাত্রা
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট দেয়ায় নোয়াখালী সুবর্ণচরে এক নারীকে গণধর্ষণ করা হয়েছিল। স্থানীয় আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ মিলে ওই নারীর স্বামী- সন্তানের সামনেই তাঁকে ধর্ষণ করার ঘটনাও বেশ আলোচিত হয় তখন। বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় উঠে আসে এ ধর্ষণের ঘটনা। ২০১৯ সালের ৩ জানুয়ারি বিবিসি বাংলার অনলাইনে-‘ধানের শীষে ভোট দেয়ায় গণধর্ষণ’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রচারিত হয়। এ সংবাদে উল্লেখ করা হয়, ৩০ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১২টায় ৯জন মিলে স্বামী ও সন্তানকে মুখ বেধে ঘরে আটকে রেখে ওই নারীকে বাইরে নিয়ে গণধর্ষণ করেছে। ধানের শীষে ভোট দেয়ার কারণে আওয়ামী লীগ গণধর্ষণের মাধ্যমে নতুন বছরের নতুন সরকারের যাত্রা শুরু করেছিল ২০১৯ সালে।
এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের ঘটনায় উত্তাল সিলেট
শুক্রবার ছুটির দিনে এমসি কলেজ ক্যাম্পাস এলাকায় ঘুরতে এসেছিলেন তরুণ দম্পতি। তখন তারা ছাত্রলীগের দ্বারা আক্রান্ত হন। স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণ করে ছাত্র লীগের ৫ নেতা। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে শাহজালালের পুণ্যভূমি খ্যাত সিলেটের মানুষ ফুঁসে উঠে।
সর্বস্তরের মানুষের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ উঠে। সিলেটের মেয়র আরিফুল হক সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলরদের নিয়ে পদযাত্রা করেছেন ধর্ষকদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবীতে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকেও ধর্ষকদের গ্রেফতার এবং বিচারের দাবীতে মিটিং-মিছিল অব্যাহত রয়েছে।
এমসি কলেজের ঘটনায় গ্রেফতার-৪
সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনায় করা মামলার আসামী অর্জুন লস্করকে হবিগঞ্জের মাধবপুর থেকে গ্রেফতার করেছে সিলেট জেলা ডিবি পুলিশ। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) ভোর ৫টার দিকে সীমান্ত এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের ঘটনায় দায়ের করা মামলার ৪ নম্বর আসামি অর্জুন লস্কর।
সুনামগঞ্জের ছাতক থেকে সকালে মামলার প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ছাত্রলীগ নেতা মাহবুবুর রহমান রনি ও রবিউল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত রাতে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থেকে রনিকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। ওদিকে নবীগঞ্জের ইনাতগঞ্জের নিজগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্লাহ।
গণধর্ষণের ঘটনায় নয়জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা ‘ছাত্রলীগের নেতাকর্মী’ হিসেবে পরিচিত।
নাম উল্লেখ করা ছয় আসামি হলেন সাইফুর রহমান (২৮), তারেকুল ইসলাম (২৮), শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি (২৫), অর্জুন লস্কর (২৫), রবিউল ইসলাম (২৫) ও মাহফুজুর রহমান ওরফে মাসুম (২৫)। তাদের মধ্যে তারেক ও রবিউল বহিরাগত। বাকিরা এমসি কলেজের সাবেক ছাত্র। নাম উল্লেখ করা ছয়জনের সঙ্গে তিনজন সহযোগী ছিলেন উল্লেখ করে তাদের অজ্ঞাত বলা হয়েছে।
শাহপরান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ছয়জনের নাম উল্লেখসহ নয়জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের শিকার তরুণীর (২০) স্বামী বাদী হয়ে মামলা করেছেন।
মামলার এজাহারে সাইফুর রহমানের বাড়ি সিলেটের বালাগঞ্জে ও বর্তমান ঠিকানা এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়কের বাংলো উল্লেখ করা হয়েছে। শাহ মাহবুবুর রহমানের বাড়ি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বাগুনিপাড়া ও বর্তমান ঠিকানা ছাত্রাবাসের ৭ নম্বর ব্লকের ২০৫ নম্বর কক্ষ, মাহফুজুর রহমানের বাড়ি কানাইঘাটের গাছবাড়ি গ্রামে, রবিউলের বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় জগদল গ্রামে, অর্জুনের বাড়ি জকিগঞ্জের আটগ্রাম এবং তারেকের বাড়ি সুনামগঞ্জ শহরের নিসর্গ আবাসিক এলাকায় (হাসন নগর)।
কলেজ সূত্র জানায়, সাইফুর, রনি ও মাহফুজুর ইংরেজি বিভাগের স্নাতক শ্রেণির অনিয়মিত শিক্ষার্থী। অর্জুন সাবেক শিক্ষার্থী। রবিউল বহিরাগত। ছয়জনই ছাত্রলীগের কর্মী ও টিলাগড়-কেন্দ্রিক একটি পক্ষে সক্রিয়।
২০১২ সাল থেকে কলেজ ছাত্রাবাসের ২০৫ নম্বর কক্ষ ছাত্রলীগের দখলে ছিলো। পর্যায়ক্রমে এ কক্ষের দখল নেয় সাইফুর। এই কক্ষেই স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটায় সাইফুর ও তার সহযোগীরা।
এদিকে এমসি কলেজ কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। গঠিত তদন্ত কমিটি রোববার থেকেই কাজ শুরু করেছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণ করবে বলে জানা গেছে।
সিলেটের জনগণ বলছেন যে, সম্প্রতি ডাকসু ভিপি নুরের বিরুদ্ধে মামলার প্রেক্ষিতে ছাত্রলীগের এসকল ধর্ষণকারীর প্রশ্রয়দাতা হিসাবে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বকেও মামলায় জড়িত করা উচিত। উৎসঃ আমার দেশ

