শিরোনাম
বুধ. ফেব্রু ১১, ২০২৬

কোরীয় উপদ্বীপে যা ঘটছে

সম্প্রতি আবারো উত্তেজনা দেখা দিয়েছে উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে। দুই বছর আগে তৈরি আন্তঃলিয়াজোঁ অফিসটি বোমা মেরে ধংস করে দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। তাদের দাবি, দক্ষিণ কোরিয়া উত্তরের সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছে। কোরিয়া পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত জানিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ডয়েচে ভেলে।

এতে জানানো হয়, সম্প্রতি উত্তেজনা ছড়িয়েছে উত্তর কোরিয়া থেকে বেলুনে করে পিয়ং ইয়ং বিরোধী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে। উত্তর কোরিয়ায় গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তথাকথিত এই প্রচারণা চালায় একদল দক্ষিণ কোরীয় অধিকার কর্মী। তারা দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বেলুনে করে লিফলেট পাঠান উত্তরে। সেখানে বিভিন্ন বার্তা, উত্তরের জনগণের জন্য সমবেদনা ও তাদের প্রতি সংহতি এসব বক্তব্য থাকে। উত্তর থেকে পলাতক অনেক অধিকার কর্মীও এ কাজে যুক্ত আছেন।

আন্তঃকোরীয় লিয়াজোঁ অফিসটি গত ১৬ জুন বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেয় কিম জং-উনের উত্তর কোরিয়া। ২০১৭-১৮ জুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও মার্কিন সমর্থিত দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার দ্বন্দ্ব এবং এর ফলে উত্তেজনা ছড়াতে শুরুকরলে এক পর্যায়ে কিম তার প্রতিপক্ষদের সঙ্গে সমঝোতায় রাজি হন। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জাই-ইনের সঙ্গে বৈঠকও করেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৮-এর এপ্রিল মাসে উত্তর কোরিয়ার সীমান্তবর্তী পানমানজম গ্রামে যৌথ নিরাপত্তা এলাকায় দুই কোরীয় নেতা সমঝোতার ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার ফলশ্র“তিতে সে বছর সেপ্টেম্বরে দুই কোরিয়ার সম্পর্ক উন্নয়নে লিয়াজোঁ অফিসটি চালু হয়।

পার্ক সাং-হাক নামের একজন দক্ষিণ কোরীয় অধিকার কর্মী জানান, আমরা গত বছর ১১ বার সীমান্তের ওপারে লিফলেট বিলিয়েছি। ‘ফাইটার্স ফর এ ফ্রি নর্থ কোরিয়া’ নামের সংগঠনের চেয়ারম্যান তিনি। সবশেষ তিনি ও তার কর্মীরা ৩১ মে বেলুনে করে লিফলেট বিতরণ করেন। তাতেই ক্ষেপে যায় পিয়ং ইয়ং। কিম জং-উনের বোন কিম ইয়ো-জং হুমকি দেন। কিম জং-উন বরবারের সরকার বরবারই এই লিফলেট প্রচারের বিপক্ষে ছিল। সবশেষ পানমানজম যৌথ ঘোষণাতেও এই প্রচারণা বন্ধের বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়েছিল। লিফলেট বিতরণের এই সংস্কৃতি অবশ্য নতুন নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকেই এর শুরু। রাষ্ট্রীয়ভাবে সোলের পক্ষ থেকেও নানা সময়ে লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। এমনকি পিয়ং ইয়ংও বেশ কয়েকবার এপার থেকে ওপারে লিফলেট বিলিয়েছে।

উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা বা তৈরির বিপক্ষে বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। তাদের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও বলবৎ বহু বছর ধরে। এ অবস্থা কাটাতে চাইছিল পিয়ং ইয়ং। সম্প্রতি ওয়াশিংটন ও সিউলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় চেষ্টা দৃশ্যমান ছিল। কিন্তু কিম তাতে খুব একটা লাভবান হচ্ছেন না বলে সংক্ষুব্ধ এমন ধারণা রাজনীতি বিশ্লেষকদের। সূত্রের বরাত দিয়ে ডয়েচে ভেলে জানিয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের চাপে পড়ে পিয়ং ইয়ং বড্ড বেশি ছাড় দিয়ে ফেলেছে বলে কিম আক্ষেপ করছেন। এর বদলে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়নি এবং উত্তর কোরিয়া কোনো প্রত্যক্ষ সুফল পায়নি। কয়েক মাস আগে কিম পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার আরও বাড়ানোর ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হচ্ছে। নতুন ‘কৌশলগত অস্ত্র’ তুলে ধরার পাশাপাশি পরমাণু পরীক্ষা আবার শুরু করার প্রচ্ছন্ন হুমকিও দিয়েছেন কিম জং উন।

দেশটির প্রয়াত নেতা কিম জং ইল ক্ষমতায় থাকাকালীন নিজের বোন কিম কিয়ং হি কে এই পদে অভিষিক্ত করেছিলেন। আর জং উনের বোন কিম ইয়ো-জং তার ফুপুর স্থলাভিষিক্ত হয়ে দেশটির ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর বিকল্প সদস্য হলেন। তাঁর ফুফুরও বেশ প্রভাব ছিল পলিটব্যুরোতে। গবেষকরা একে ‘নতুন শীতল যুদ্ধ’ বলছেন। তাদের মতে, পিয়ং ইয়ং লিয়াজোঁ অফিসটি ধংস করে বুঝিয়ে দিল যে, দক্ষিণকে তাদের আর প্রয়োজন নেই। সিউলকে ছাড়াই শীতল যুদ্ধ চলতে পারে। বেইজিং ও মস্কোকে নিয়ে সম্প্রতি ওয়াশিংটনের ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় পিয়ং ইয়ং এদের সঙ্গে পুরানো সম্পর্ক আবারো ঝালাই করে নিয়েছে। চীন ও রাশিয়ার কাছেও বরাবরই ভূ-রাজনৈতিক কারণে উত্তর কোরিয়া গুরত্বপূর্ণ। তাই পিয়ং ইয়ংও গলার জোর আবার বাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে, দক্ষিণ কোরিয়াও চুপ করে বসে থাকবে বলে মনে হচ্ছে না। ধারণা করা হচ্ছে, জবাব দিতে চায় তারাও। সেক্ষেত্রে কোরীয় উপত্যকায় উত্তেজনা প্রশমিত হতে আরো সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আধুনিক কোরিয়ায় জাপান থেকে দখলম্ক্তু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। শীতল যুদ্ধের মার্কিন বনাম সোভিয়েত মেরুকরণের মধ্যেই ১৯৪৮ সালে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায় উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া। সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন ও তাদের কমিউনিস্ট সতীর্থদের সমর্থন পায় উত্তর কোরিয়া। আবার যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা সহযোগীদের সমর্থন পায় দক্ষিণ কোরিয়া। এরপর ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত যুদ্ধ চলে কোরীয় উপকূলে। তখনকার শীতল যুদ্ধ শেষ হলেও এ উপত্যকায় সংঘাত ও উত্তেজনা শেষ হয়নি। আজও চলছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় আজও মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। এএফপি

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *